বিজ্ঞাপন
default-image

যাহোক, মেয়ের বাবা যখন রাত সাড়ে নয়টায় অফিস থেকে ফিরে কোট–টাই খুলতে খুলতে মেয়ের মায়ের কাছে সারা দিনের বেতনবহির্ভূত আয়-রোজগারের টাকা জমা রাখত, তখন অর্থগ্রহীতা মা প্যাঁচ লাগিয়ে দিত—‘ওগো শুনেছ, তোমার মেয়ে তো বড় হয়ে কৃষক হতে চায়। যদি পারো মেয়ের জন্য এখন থেকেই গ্রামের কৃষক ছেলে দ্যাখো। আর পারলে কালকেই অফিস থেকে দুটো অস্ট্রেলিয়ান গাই গরু নিয়ে বাসায় এসো।’

তাই বাধ্য হয়েই মেয়েরা মানবসেবায় অবদান রাখার জন্য বেছে নিত ডাক্তারি পেশাটাকে। সেই ৩০ বছর আর তখন তাদের ১৬ বছর যোগ করলে আজকে তারা ৪৬ বছর বয়সী। অর্থাৎ এখন তাদের পুরোপুরি ডাক্তার, কৃষক কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবের ঘটনায় আরও প্যাঁচ আছে।

কৈশোরের সেই ‘কৃষক’, ‘ডাক্তার’ আর ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে আমি একটু গবেষণা করেছি। গবেষণার ফলাফল ভয়াবহ। তবে বলে রাখা ভালো এটা নিতান্তই আমার পর্যবেক্ষণ। কমপক্ষে তিনজন স্বপ্নপিয়াসু কিশোর কৃষক এখন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাদের নেশা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় অ্যাপার্টমেন্ট আর জমি কেনা। বাড়ি বা জমি বেচাকেনা কোনো সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে দেশের মানুষ বা অন্যের ভাগের টাকা চুরি করে। যেই ভিক্ষুক বৃষ্টির মধ্যে রাজপথে ঘুমিয়ে থাকে, সেই ভিক্ষুকের টাকা। তারা ভিক্ষুকের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। যে প্রবাসী আরবের মরুভূমিতে দিনরাত পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে, তার টাকা। যারা দেশে অ্যাপার্টমেন্ট আর জমি কিনতে কিনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তারা এখন বিশ্ববাজারে প্রবেশ করছে। এগুলোর মধ্যে আছে কানাডার টরোন্টো, লন্ডন, নিউইয়র্ক, মালয়েশিয়া, দুবাইয়ের মতো শহর।
পক্ষান্তরে, ২৫ কি ৩০ বছর আগে সরকারি চাকরি করা আয়বহির্ভূত আয়কারীদের সন্তানেরাও এখন পরিপূর্ণ মধ্যবয়স্ক মানুষ। তাদের অনেকেরই স্বামী, স্ত্রী-সন্তান আছে।

অনেকেই দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। তারাও সমাজের কষ্টার্জিত বা হালাল আয় করা মানুষের সঙ্গে বা কাছে মিলেমিশে থাকে। অনেকের হয়তো এখন আর আয়বহির্ভূত আয় করতে হয় না, যেটা তাদের বাবার দ্বারা হয়েছিল। অনেকের আবার অবৈধ উপায়ে অর্জিত বাড়ি-গাড়ি বা ব্যবসা-বাণিজ্যের আয় থেকে সেই অর্থের উৎস এখনো প্রবাহ হচ্ছে। আমি তাদের বলি ভূত, যা অনেকে বিশ্বাস করে না। অনেকে না দেখা জিনিস বিশ্বাস করে না।

আসল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। যারা ডাক্তার হতে চাইত, তাদের বেশির ভাগই এখন দু-তিন সন্তানের মা। তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের বিসিএস পরীক্ষায় উপকারিতা নিয়ে তালিম দিচ্ছেন। সময় পেলে বাবারাও বকাঝকা করেন ভালোমতো পড়াশোনা করার জন্য।

default-image

আমেরিকার ছাওয়াল-পাওয়ালদের সঙ্গে বাংলাদেশের পোলাপানদের তুলনা করলে হবে না। তারপরও বলি,মানুষের জীবনে স্বপ্ন একটা ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ ঘাটের মরা। একমাত্র সাহসীরাই স্বপ্ন দেখতে পারে। সেই সাহস আসে পাশের মানুষের কাছ থেকে কিংবা সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র বা অবকাঠামো থেকে। সাহস সঞ্চার হয় পরিবেশ থেকে। একটা বৃক্ষ সব সময়ই সূর্যালোকের দিকে বেড়ে ও। বৃক্ষের যেদিকটা অন্ধকার বা অবরুদ্ধ,সেদিকে ডালপালা মেলে না। যে পরিবেশ মানুষকে সাহসী হতে শেখায় না,সেখানে জীবনের স্পন্দনও নিবু নিবু।

অনেক আগে ঢাকা কোর্ট হাউসের পাশেই খুপরির মতো একটা অফিসে গিয়েছিলাম কাগজ নোটারি করতে। কুঁজো হয়ে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার কাগজে সিল মারেন। দিনের বেলাতেও ঘরটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। মোমবাতির টিপটিপ আলো আর বৃদ্ধ ভদ্রলোকের জীবনকে দেখেছিলাম একই সরলরেখায়। ওই বৃদ্ধের জীবন বলতে ছিল নোটারির কাগজে নীল কালির সিল মারা। আজ এত বছর পর মনে হয়, আহারে! তাঁকে যদি একবার সমুদ্রদর্শনে নিয়ে যাওয়া যেত। কিংবা ঘোড়ার পিঠে করে উঁচু কোনো পাহাড়ে। ওই মানুষটার জীবন ছিল স্বপ্ন দেখার ভয়ে তটস্থ। সেই ভয় তাঁকে সূর্যালোক থেকে মোমের আলোকেই আলোকিত করেছিল। আহা কি জীবন! জীবনভর বাড়ির পাশে একটা খরস্রোতা নদীর কুল কুল ধ্বনিই শুনে গেলাম। কোনো দিন যাওয়া হলো না, দেখা হলো না।

পশ্চিমা বিশ্বের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন থাকে স্বপনেরই মতো উদার। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যা কিছু ভালো লাগে, তারা তাই হতে চায়। পিতা-মাতা কেউ এসে তাদের স্বপ্নের ভাগীদার বা তাবিদার হয় না। শৈশব থেকেও শুরু করে স্বপ্ন জাল বুননের। গত দুই দশকে আমি অনেক বাচ্চার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। বিষয় বড় হয়ে তারা কী হতে চায়। তাদের উত্তর ছিল রীতিমতো অবাক করার মতো। বেশির ভাগই শিক্ষক হতে চায়, কারণ বাড়ির বাইরে শিক্ষক-শিক্ষিকারাই তাদের জীবনের প্রথম হিরো। কেউ পুলিশ, কেউ ফায়ারফাইটার, কেউ বড় হয়ে যেতে চায় পৃথিবী ছেড়ে চাঁদে কিংবা মঙ্গল গ্রহে, কেউ হতে চায় তিমি মাছের প্রশিক্ষক। অনেকে আবার ময়লা টানার গাড়ি বা ট্রেনের ড্রাইভার। কারণ, ওই গাড়িগুলো আকারে বড়।

আমার ছেলের বয়স ১২। তার এক বন্ধুর বাবার ছোট প্রাইভেট প্লেন আছে। সে এই বয়সেই প্লেন চালাতে পারে। সে বাবার কাছ থেকে শিখেছে, যদিও বয়সের কারণে লাইসেন্স পেতে আরও কিছু বছর অপেক্ষা করতে হবে।

default-image

ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। বন্ধুর ছেলে যে স্কুলে যায়, সেখানে গুগল, ফেসবুকের মতো আইটি হর্তাকর্তাদের ছেলেমেয়েরাও যায়। সেই হাইস্কুলের কিছু ছাত্রছাত্রী আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে একটা রকেট উৎক্ষেপণ করে। এটা নাসা বা কোনো ইউনিভার্সিটির প্রকল্প বা প্রজেক্ট না। একটা দেশের হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রী মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণ করেছে। বিষয়টা আমলে নিতেও একটু ঢোঁক গিলতে হচ্ছে। এটা একটা অতীব জরুরি এবং স্বপ্নপিয়াসু মানুষের খতিয়ে দেখারও বিষয়।

আহা! আমার দেশে এমন কেন হয় না
কোথাও থেকে উড়ে আসবে একটা সুন্দর ময়না
ডানা মেলে বলবে হেসে, এই তো আমি তোমার দেশে
স্বপ্নডানায় উড়ব সবাই, নতুন আলোয়, নতুন বেশে

*লেখক: জামাল সৈয়দ, মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন