default-image

অনেক দিন পর জিনার সঙ্গে দেখা। জিনা মানে আমার সাবেক ল্যাবমেট হান্দুং-এর এক্স গার্লফ্রেন্ড। আমার পরিচিত কোরীয় মেয়েদের মধ্যে একমাত্র জিনাই টুকটাক ইংরেজি বলতে পারত। বেচারি ইংরেজি শেখার জন্য নিউজিল্যান্ড ছিল এক বছর। একসঙ্গে আড্ডা মেরে অনেক সময় কাটিয়েছি। আমার ল্যাবটা তখন ছিল তারুণ্যে ভরপুর। সবাই আন্ডার গ্রেডের স্টুডেন্ট ছিল। আমিই একমাত্র রিসার্চ স্টুডেন্ট। কোনো রিসার্চ স্টুডেন্টই আমার ল্যাবে আসে না বা এলেও থাকে না। আমার ল্যাবের কাজ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বেসড। নতুন করে কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজ শেখার দুঃসাহস কেউ দেখায় না। যারাও বা এসেছিল মাঝপথে সবাই চলে গেছে।

যা হোক, এটা অন্য প্রসঙ্গ। আরেকদিন করা যাবে। ওদের সঙ্গে আমি একাকার হয়ে উঠেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি আবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই ফিরে গেছি। ওদের ভাঙা ভাঙা ইংরেজি কথা বলা আমি খুবেই উপভোগ করতাম। আসলে বয়স আর ভাষার ব্যবধান কোনো দূরত্বই তৈরি করতে পারে না। মনটাই সেখানে আসল।

ল্যাবে আমার সবচেয়ে কাছের যে ছেলেটা ছিল ওর নাম সকচুন। সে একদমই ইংরেজি জানত না। কিন্তু সেই আমাকে সবচেয়ে বেশি টেককেয়ার করত। সকচুন একদিন এসে বলল, তার খুবেই মন খারাপ। অনেক কষ্ট করে ইশারা-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করল তার ব্রেকআপ হয়ে গেছে। তাই ওর ভীষণ মন খারাপ। দেখলাম আসলেই ওকে অনেকটাই আপসেট দেখাচ্ছে। আমি মনে মনে বললাম, ব্রেকআপ তো তোদের দেশে মুড়ি-মুড়কির মতো, এত আপসেট হওয়ার কী আছে।

বেচারার আসলেই মন খারাপ। মেডিটেশনের বই পড়ছে। সকচুনকে কিছুটা সময় দিলাম। ওর মাথায় কিছুটা সহানুভূতির হাত রাখলাম আর এতে করেই সে আমার অনেকটাই আপন হয়ে উঠল। আসলে মানুষের জীবনে এমন কতগুলো মুহূর্ত আসে, তখন অল্প একটু সান্ত্বনা দিলেই অনেক আপন হয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থ মানুষের পাশে হাঁটার লোক কম।

মিঞ্জি নামের মেয়েটা ছিল অত্যন্ত রাফ অ্যান্ড টাফ। অনেকটা স্ট্রেট ফরোয়ার্ড। কোরীয় মেয়েরা অ্যালকোহলিক হলেও খুব কমসংখ্যক মেয়েদেরই সিগারেটের নেশা রয়েছে। কিন্তু মিঞ্জির মারাত্মক সিগারেটের আসক্তি ছিল। মিঞ্জির কাজ ছিল প্রতিদিন আমাকে দুটি করে কোরীয় ওয়ার্ড শেখানো। বিনিময়ে আমি ওকে ইংরেজি শেখাতাম। একদিন দেখলাম মিঞ্জির রিলেশনশিপের এক হাজার দিন পূর্তি উপলক্ষে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে। আমি ওকে যথারীতি উইশ করে বিখ্যাত কয়েকটা লাইন লিখে দিলাম—Love is not about how many days, months, or years you’ve been together. Love is about how much you love each other every day.

মিঞ্জি একদিন এসে বলল, জামান, ব্রেকআপ করে দিয়ে এসেছি। তুমিই ঠিক। আসলেই ভালোবাসাবিহীন রিলেশনশিপ অযথা টেনে লম্বা করার কোনো মানে হয় না।

সেদিনই মিঞ্জির ফেসবুকে দেখলাম নতুন একটা ছেলের সঙ্গে ছবি। আগের মেমোরি সব টাইম লাইন থেকে মুছে দিয়েছে। আসলে এটা ওদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা এবং এভাবেই ওদের তৈরি করেছে। আমাদের দেশে ব্রেকআপ হওয়া ছেলেমেয়েদের আমরা মেনে নিতে এখনো অভ্যস্ত নই। ব্রেকআপ যেন একটা মহাপাপ। চরিত্রহীন বলতেও বাধা নেই। একটা ব্রেকআপ বা ডিভোর্সের পর আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি কার কতটুকু দোষ ছিল এটা খোঁজার কাজে। সম্প্রতি তাহসান–মিথিলার ডিভোর্সের পর সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখলাম রি রি পড়ে গেছে। ভালোবাসা না থাকলেও জোর করেই দর্শকের দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে থাকতে হবে। কী অদ্ভুত আমাদের চিন্তা-ভাবনা।

যা হোক, ওই যে জিনার কথা বলছিলাম। লেখার মাঝে দাঁড় করিয়ে এসেছি। ওর কথা বলি। ল্যাবের পাশের টেন্টে বশে আছি। হঠাৎ দেখলাম গাড়ি থেকে মাথা বের করে কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। কাছে যেতেই দেখি জিনা। অনেকটা মুখ লুকিয়েই বলল, জামান ডোন্ট লুক অ্যাট মি।

আমি বললাম, কিন্তু কেন?

পরে জিনা আমাকে যেটা বোঝানোর চেষ্টা করল যার মানে হচ্ছে, সে আজ মেকআপ না নিয়েই বের হয়েছে। তার ধারণা তাকে খুবেই পচা দেখাচ্ছে।

আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, মেকআপ ছাড়াই তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। আর তোমারা মেয়েরা জানই না কীভাবে তোমাদের সুন্দর দেখায়।

তখন সে অনেকটা খুশি। প্রসঙ্গক্রমে একটু বলে রাখি, আমার ধারণা পৃথিবীতে যত পরিমাণ কসমেটিকস উৎপাদন হয়, তার অর্ধেকেই কোরীয় মেয়েরা ব্যবহার করেন। সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে কোরীয় নারীদের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। তারা প্রচুর পরিমাণে স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার এবং বয়স বিশের কোঠায় যাওয়ার পর পরই তারা এন্টি এজিং ক্রিম ও সিরাম ব্যবহার করতে থাকেন। ফলাফল? তারুণ্য ও নিখুঁত ত্বক।

যা হোক, জিনার সঙ্গে অনেক পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করলাম। জিনা ও হান্দুং প্রকৃতপক্ষেই একে অপরকে প্রচণ্ডভাবে ভালোবাসত। কিন্তু ওদের সমস্যা ছিল অন্যখানে। হান্দুং-এর পছন্দ ছিল নির্জনতা। সে চাইত জিনার হাত ধরে কোনো এক নির্জন জায়গায় বসে চাঁদের আলো দেখবে। কিন্তু জিনার পছন্দ ছিল ঠিক উল্টো। সে সব সময় চাইত হান্দুংকে নিয়ে পার্টিতে-মার্কেটে ঘুরে বেড়াতে। আর এই নিয়ে সারাক্ষণেই খুনসুটি লেগেই থাকত। সারাক্ষণেই ওরা দুজনের একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ অভিযোগ করেই যেত।

একদিন ওদের দুজনকে ডেকে আমার কম্পিউটারের ইউটিউবে জর্জ মাইকেলের বিখ্যাত ‘কেয়ারলেস হুইস্পার’ গানটি শোনালাম এবং অর্থটা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আরও বললাম, ভালোবাসা হচ্ছে একটি অনুভূতির নাম। যেটা হৃদয় দিয়েই হৃদয়য়ের কথা বুঝতে হয়। কখনো মুখে বলার প্রয়োজনই হয় না। আর তখনেই ভালোবাসা স্থায়ী হয়। ব্রেকআপ হওয়ার পর ওরা আর কেউ নতুন করে কোনো রিলেশনশিপে জড়ায়নি। জিনা বলল, সে এখনো হান্দুংকেই ভালোবাসে। জিনার ধারণা অন্য কোনো হ্যান্ডসাম পুরুষকে সে কখনোই হান্দুং-এর মতো করে ভালোবাসতে পারবে না।

আমি জিনাকে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, প্রকৃত ভালোবাসা কখনো হারায় না। কোনো না কোনোভাবে থেকেই যায়।

জিনাকে বিদায় দেওয়ার পর কেমন যেন একটা বিষণ্নতায় ডুবে ছিলাম অনেকক্ষণ। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর সবাই ল্যাব ছেড়ে চাকরির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছে। ল্যাবে আবার নতুন স্টুডেন্ট এসেছে। আমারও ব্যস্ততা বেড়েছে কিন্তু আগের মতো সম্পর্ক হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝে ওরা মেসেজ পাঠায়—মিস ইউ ব্রো...’। আমিও উত্তর দিই ‘মিস ইউ টু...।’
...

মো. কামরুজ্জামান মিলন: পিএইচডি গবেষক. গিয়াংসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া।
ইমেইল: <milonbrri@gmail.com>

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0