default-image

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা খণ্ড খণ্ড আলোর মিছিলগুলো সমবেত হয়েছিলেন ক্যানবেরাতে। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ঝড়ে ম্যানুকা ওভালের বুক জুড়ে জেগে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভালবাসার চর। ম্যানুকা ওভালের দর্শক ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫৫০। গত বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বিশাল এ ক্রিকেট উৎসব দেখতে এখানে এসেছিলেন ১০ হাজারেরও বেশি দর্শক। এর প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি দর্শকই ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচকে সামনে রেখে ক্যানবেরামুখী বাংলাদেশিদের লাল–সবুজের এমন ঢল এর আগে কখনো দেখা যায়নি। সিডনিতে অনুষ্ঠিত অফিশিয়াল প্রস্তুতি ম্যাচের (ওয়ার্ম আপ ম্যাচ) হার দমাতে পারেনি এখানকার বাংলাদেশিদের মনোবলকে। নিজের দেশ থেকে আসা প্রিয় খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে সাহস, উৎসাহ ও প্রেরণা জোগাতে তাদের এই শোভাযাত্রা।
তবে, সিডনিবাসী বাঙালিদের আয়োজন ছিল বর্ণাঢ্য ও মনোমুগ্ধকর। এ উপলক্ষে সিডনিপ্রবাসী বাঙালিরা ১৮ ফেব্রুয়ারি রোজল্যান্ড সাবারবের অ্যাকুয়াটিক সেন্টারের সামনে থেকে ক্যানবেরার উদ্দেশে রওনা দেয়। ‘টাইগার কার র‍্যালি ফর দি টাইগার’ নামে ৬০–৬৫টির বেশি গাড়ির এই বহরটি ছোট–বড় আকারের বাংলাদেশি পতাকা, ব্যানার দিয়ে সুসজ্জিত ছিল। দর্শকেরা সেজেছিল লাল–সবুজের জার্সি, মুখে ফ্ল্যাগ অলংকরণ, বিভিন্ন মাস্ক ও মাথায় ব্যান্ড বেঁধে। অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, বাংলাদেশি গ্রোসারি শপ এবং ব্যক্তিগতভাবেও এই শোভাযাত্রা নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিল র‍্যালির আয়োজকেরা। সিডনি থেকে ক্যানবেরা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার চেনা রাস্তা, পরিচিত মানুষজনের আনাগোনা। এ ছাড়াও সিডনি থেকে ১০টি বাস বোঝাই করে বাঙালি এসেছেন। মেল্বুরন, ব্রিসবেনসহ পার্থ থেকেও উচ্ছল ক্রিকেটপ্রেমী ১০ হাজার বাঙালিদের আনন্দময় হর্ষধ্বনি, বিভিন্ন বাদ্য বাজিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনার প্রত্যয়ে উল্লাসে মেতে উঠেছিল ২৯০ কিলোমিটার দূরত্বের পুরো রাস্তা। দুপর একটার দিকেই গ্যালারি হয়ে ওঠে লাল–সবুজের বাংলাদেশ। খেলা শুরুর আগে ম্যানুকা ওভালের বাইরে কনসার্টের আয়োজন করা হয়।

দিন-ক্ষণ সময় পেরিয়ে এখন শুধুই অপেক্ষার পালা! আর মাত্র কিছুক্ষণ সময়ের ব্যবধানেই শুরু হতে যাচ্ছে...বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ আসর। প্রিয় বাংলাদেশ তাদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে আফগানিস্তানের। ক্যানবেরার মানুকা ওভাল স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। প্রবাসী মানুষগুলোর দেশপ্রেমে পুরো গ্যালারি কেঁপে উঠেছিল। টসে জিতে ইনিংসের শুরুতে বাংলাদেশ দল শুভ সূচনা করলেও তামিম ও আনামুলের আকস্মিক বিদায়ে গা-কাঁপুনি জ্বর এসেছিল ঠিকই কিন্তু উত্তাপ ছিল না। সেদিন ক্যানবেরার তাপমাত্রা ছিল ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাবেক দুই অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসান জুটির ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে চার–ছক্কার সঙ্গে সঙ্গে গ্যালারিতে নেমে আসে বাঁধভাঙার তীব্র উল্লাস। ব্যাটিং বিপর্যয় কাটিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে প্রথম বিশ্বসেরা সম্মান এনে দিয়েছেন সাকিব। বাংলাদেশ দলের বিজয়ের আভাসে উত্তেজনার পারদে তাপমাত্রা তখন উচ্চপর্যায়ে। মুশফিকুর রহিম শেষ মুহূর্তে তাঁর সেরাটুকু দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম অর্ধশতক করার গৌরব অর্জন করেন। কাজের ব্যস্ততা আজ ক্রিকেটপাগল বাঙালি কাউকেই আটকাতে পারেনি। বিশ্বকাপ উত্তেজনায় উন্মাদ জনগণ। প্রিয় বাংলাদেশ খেলবে, এ উত্তাপের পরিমাণ কোনো থার্মোমিটারে মাপা যায় না, কেবলই অনুভব করা যায়।

default-image

আফগান শিবিরে প্রথম আঘাত আনেন অধিনায়ক মাশরাফি। দলীয় ২ রানে প্রথম উইকেট হারালেও দ্বিতীয় ওভারে রুবেল আরেকটি উইকেট নিলে স্কোর দাঁড়ায় ২ রানে ২ উইকেট। দলীয় ৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে আফগান বাহিনীর টালমাটাল হয়ে বেসামাল অবস্থা। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে শিকারি দল বাংলাদেশ আফগানিস্তানকে ১৫০ রানের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শুভ সূচনা করল।
আমি, আমার স্বামী, মেয়ে অথৈ ও ছেলে দীপ্র গতকালকেই এসেছি ক্যানবেরাতে। প্রায় দুই মাস আগেই বিশ্বস্ত সূত্রে জেনেছিলাম, ফাইভ স্টার হোটেল হায়াতে থাকবে প্রিয় বাংলাদেশ দল। সেই থেকে আমার নির্ঘুম রাত্রি যাপন। অবশেষে মধ্য জানুয়ারিতে বুকিং। খেলা শুরুর আগের দিন বাচ্চাদের স্কুল, আমাদের দুইজনের অফিস থেকে দুই দিনের ছুটি নিয়ে এসেছি আমরা। ক্যানবেরা হোটেল হায়াতে আছি, টাইগারদের সঙ্গে বাংলাদেশের হয়ে, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে।
হায়াত হোটেলের লিফট, রেস্তোরাঁ কিংবা লবিতে বার বার দেখা হয়ে যাচ্ছে শত্রুর সঙ্গে, পরম শত্রু আফগানিস্তানের সঙ্গে। বিশ্বকাপে এবারই প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছে আফগানিস্তান। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে ২৫টি ম্যাচ খেলেছে। বিশ্বকাপে ৮ জয়ের বিপরীতে তাদের হার ১৭টি।
খেলা শুরুর আগের দিন হোটেলের লবিতে কথা বলছিলাম বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ববি আহমদ ও সাবেক খেলোয়াড় খালেদ মাহমুদ সুজনের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, আমরা চেষ্টা করব ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ে সমন্বয় ঘটিয়ে কীভাবে সেরাটা দে​ওয়া যায় দেশকে।

default-image

ওভালের চারটি স্ট্যান্ডের একটি ছিল ‘বাংলাদেশ গ্যালারি’। সেখানে শুধুই লাল–সবুজের হাতছানি। কিন্তু বাংলাদেশ সমর্থকেরা শুধু সেই গ্যালারিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো স্টেডিয়ামে উপচে পড়েছিল। সিডনির ক্যালিভ্যালি থেকে সঞ্জু, হাবিব ও শিল্পী, কোগরা থেকে পরিবারসহ এসেছিলেন কবির উদ্দিন, শহিদুল আলম, রকডেল থেকে সাব্বির ও মজনু। সিডনির বাঙালিপাড়া লাকেম্বা থেকে ৩০/৩৫ জনের একটি দল এসেছে। অ্যাডিলেইড থেকে মনি-স্বপন দম্পতি, সিহাব-পিংকিসহ আরও অনেকেই। সবার মাথায় লাল–সবুজের ব্যান্ড, গায়ে জার্সি, মুখে প্রিয় পতাকার অলংকরণ। কেউ কেউ বাংলায় লেখা বিভিন্ন ব্যানার, বড় পুতুল–বাঘ, পতাকা নিয়ে গ্যালারি থেকে গ্যালারি ঘুরেছেন। কিছুক্ষণ পর পর বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বলে চিৎকার, উল্লাস করেছেন। এখানকার সবকিছুতেই কঠোর নিয়মের ভিত্তিতে চলে। কিন্তু বাংলাদেশের খেলা, টাইগার গর্জে উঠবে আপন স্বকীয়তায়, মাতবে বাঙালি। তাইতো নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই ঘণ্টার পার্কিংয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি রেখে অনেকেই জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এখানে কাজে গেলে পয়সা অর্থাৎ বেশির ভাগ জবের ক্ষেত্রে এখানকার বেতন হয় প্রতি ঘণ্টায়। জবে গেলে বেতন, তা না হলে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো অবস্থা হয়। আজ এসব কিছুর ঊর্ধ্বে স্বদেশপ্রেম।
প্রিয় দল নিরাশ করেনি প্রবাসী বাঙালি ও দেশবাসীকে। এদিন সবাই উজ্জীবিত ছিল। সাকিব-মুশফিকের ১১৪ রানের যৌথ পারফরম্যান্সেই ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়েরা এক চক্কর দিয়েছেন। সঙ্গে থেকে ক্রমাগত প্রেরণা, উৎসাহ দেওয়ার জন্য নিজেরা হাত তালি দিয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
হারি–জিতি কোনো ব্যাপার নয়। উই আর অলওয়েজ সাপোর্ট ইয়ু। অল দ্যা বেস্ট টাইগার্স, জাস্ট ব্রিং দ্যা ওয়ার্ল্ডকাপ হোইয়াটেভার। জাস্ট ডু প্লে!
(প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবি তুলেছেন: কবির উদ্দিন সরকার৷)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন