বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত শুনতে একেবারেই নারাজ নীলা। বাড়িতে ঢুকতেই নীলার চিৎকার আর শত শত অভিযোগ শুনতে শুনতে সৌরভের জীবনটাই চিরতার মতো তিতকুটে হয়ে গিয়েছিল। এত বদমেজাজি আর দজ্জাল কী করে হয় এক নারী? অথচ বিয়ের আগে মেয়েটা কত শান্ত, স্নিগ্ধ, কোমল স্বভাবের ছিল। কত মিষ্টি সুরে কথা বলত! নীলার কথার জাদুতেই মোহাবিষ্ট হয়ে সৌরভ ওকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিল।

ভেবেছিল, একটা জনম কাটিয়ে দেবে নীলার অপূর্ব কণ্ঠের মিষ্টি কথার ঝাঁপি বুকে নিয়ে। কিন্তু বিয়ের দুই বছর না যেতেই সেই কোকিলকণ্ঠী এখন কর্কশকণ্ঠী কাকে পরিণত হয়েছে। শুধু কা কা করে। থামার নাম নেই!

সারা দিন অফিস করে এসে বাসায় কোনোদিন দুদণ্ড শান্তি মেলেনি সৌরভের। ছুটির দিন তো কথাই নেই। সকালে ঘুম ভাঙে নীলার হইচই আর চিৎকারে। সংসারের ঘানি টানতে টানতে নাকি তার জীবন অতিষ্ঠ! আর সেই অতিষ্ঠ জীবনের যত ক্ষোভ, সব স্বামীর ওপর ঝেড়ে ভীষণ শান্তি পায় সে। মাস ছয়েক আগে সামান্য পানির বিল দেওয়া নিয়ে সে কী লঙ্কাকাণ্ড! অন্যদিন চুপ থাকলেও সেদিন মুখে যা আসে, তা–ই শুনিয়ে দিল সৌরভ! সে কি চাকরি করে? তার কী এমন কাজ? বাসায় একটু রান্নাবান্না আর বাসা পরিষ্কার করবে, তাতেই যত তিক্ততা। অফিসে পুরুষকে কত শ্রম দিতে হয়, সে হিসাব আছে নীলার? সেদিন নীলা কেমন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। টপটপ করে চোখ বেয়ে গাঢ় অভিমানের নোনা জল গড়িয়ে পড়ছিল গাল বেয়ে। একটু পরই তল্পিতল্পাসহ মাতৃগৃহে গমন। যাওয়ার বেলা একবার দাঁড়িয়েছিল গেটের সামনে কিছুক্ষণ। ভেবেছিল সৌরভ বুঝি বাধা দেবে, কিন্তু এ যাত্রায় সৌরভ নিশ্চুপ! নীলা আর আসেনি। গেল ছয়টা মাস নীলা আর একটিবারের জন্যও সংসারে ফিরে আসেনি।

default-image

সেদিনের কথা মনে পড়লেই সৌরভের ভেতরটা কেমন দুমড়েমুচড়ে যায়। অতটা রূঢ় না হলেও পারত। খুব বেশি আঘাত না পেলে ওভাবে কেউ নিজের সংসার ছেড়ে যায় না। নীলা চলে যাওয়ার পর থেকে পুরো বাড়িটা কেমন প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। অফিস শেষ করে বাসায় পৌঁছার পর আর কেউ চিৎকার–চেঁচামেচি করে না। নেই কোনো প্রাত্যহিক অভিযোগের সুবিশাল তালিকা। বাড়ি ফিরেই সৌরভ হাত–মুখ ধুয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়ে। এখন আর কেউ সন্ধ্যার চা–নাশতা নিয়ে খোলা বারান্দায় অপেক্ষায় করে না। রাতে খাবার সাজিয়ে ডাকাডাকি করে না। পুরো বাড়িটাই যেন নিশ্চুপ মৃত্যুপুরী। একটা মানুষের অনুপস্থিতিতে যে সবকিছু এভাবে থমকে যাবে, সেটা সৌরভ কোনোদিন কল্পনাও করেনি। মনে মনে কত দোয়া করেছে, কবে নীলার উৎপাত থেকে রেহাই পাবে! নীলা ঘর ছেড়ে চলে যাবে, সৌরভের জীবনে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু নীলা চলে যাওয়ার পর কেবল দুদিন একটু শান্তি শান্তি লেগেছিল, এরপর সবকিছুই এক করুণ ইতিহাস!

নীলাকে মনে পড়ে। ভীষণ মনে পড়ে। কিন্তু সৌরভের আত্মাভিমান দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দুজনের মধ্যে। নীলা চলে যাওয়ার পর আর একটিবারের জন্যও যোগাযোগ করেনি সৌরভের সঙ্গে। সৌরভও নিজের জেদ নিয়ে বসে থেকেছে দিনের পর দিন। ভেতরে ভেতরে অনুশোচনার দহনে পুড়েছে ঠিকই, তবু নীলার কাছে গিয়ে মুখোমুখি বলা হয়নি, নীলা ছাড়া সৌরভ কতটা অচল।

default-image

এই ছয় মাস প্রতিদিন সৌরভ নীলাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত একা একজন নারী এত কাজ সামাল দিলে তাঁর মনমেজাজ কীভাবে ভালো থাকবে? সৌরভ তো কোনোদিন নীলাকে ঘরের কাজে একটুও সহযোগিতা করেনি! সারা দিন পর অফিস থেকে এসে কেবল বিশ্রাম নিয়েছে। টিভি কিংবা মুঠোফোনে ডুবে থেকেছে। নীলাকে সামান্য সময়ও তো কখনো দেওয়া হয়নি! একসঙ্গে চা–পর্বের সময়ও হাতে থাকত মুঠোফোন। নীলার শখ–আহ্লাদের কথাও কখনো শোনা হয়নি মনোযোগ দিয়ে। ছুটির দিনে নিজের বিশ্রামের বাহানায় মেয়েটাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতেও যায়নি। এমন একঘেয়ে জীবন কয়জনের ভালো লাগে? দিনের পর দিন এই অসহ্য জীবনের বোঝা বইতে না পেরেই হয়তো মেয়েরা বদলে যায়। সুকণ্ঠী থেকে কর্কশকণ্ঠীতে পরিণত হয়। বিয়ের পর প্রেমিক স্বামীটির পূর্বের সব প্রেম বিলীন হয়ে যায়। আর এসব মেনে নিতে পারে না বলেই সারাক্ষণ চিৎকার করে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে মেয়েরা।

গন্তব্যে এসে বাস থেমেছে। নীলার কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে পৌঁছে গেছে, সৌরভের অবচেতন মন তা খেয়ালই করেনি। দুদিন আগে নীলাকে দেখেছে সৌরভ। মায়ের সঙ্গে রিকশায় কোথাও যাচ্ছে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে নিকোটিনের ধোঁয়ায় যখন সমস্ত যন্ত্রণা ভোলার চেষ্টায় ব্যস্ত সৌরভ, ঠিক তখনই রিকশাটা পাশ কেটে চলে গেল। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল সৌরভ নীলার দিকে। কেমন মলিন একটা মুখ! নীলাও ঠিক একইভাবে সৌরভকে দেখছিল, যতক্ষণ রিকশাটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে না যায়। সৌরভ চাইলে রিকশা থামানোর জন্য নীলাকে অনুরোধ করতে পারত। কিন্তু নীলা কেন রিকশা থামাল না, সে জন্য সৌরভও নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। বাড়িতে এসে সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। বারবার নীলার মুখটা মনে পড়ছিল। ইগোটাকে গলা টিপে হত্যা করতে ইচ্ছা করছিল। একবার যদি সবকিছু ভুলে নীলার সামনে গিয়ে দাঁড়াত, কী এমন হতো? বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যথা নিয়ে দুটো দিন একপ্রকার দেবদাসের জীবন পার করছে সৌরভ।

ক্লান্ত, অবসন্ন দেহটাকে কোনো রকমে টেনে নিয়ে দুয়ারের সামনে দাঁড়াল সৌরভ। ভেতরে ঢোকার ইচ্ছাটা মরে গেছে আজকাল। সেই তো প্রাণহীন মরুভূমি। এই সাঁঝবেলায় নীলা ছিল এক রূপকথার রানি। দেরিতে হলেও সৌরভ এখন বোঝে। নীলার কাছে সময়টা সব সময়ই ছিল প্রতীক্ষার। প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার প্রতীক্ষা। একটু আদরমাখা ভালোবাসার স্পর্শ পাওয়ার বাহানায় মেয়েটা কতই না অপেক্ষা করেছে, কিন্তু সৌরভের উপেক্ষা বরাবরই আহত করেছে নীলাকে।

বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। সৌরভ দরজার তালা খুলতে গিয়ে লক্ষ করল, দরজায় কোনো তালা নেই। দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখল, ভেতর থেকে লাগানো। কাঁপা কাঁপা হাতে কলিংবেল টিপতেই ভেতর থেকে দরজাটা খুলে দিল নীলা। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সৌরভ! যার শোকে পাথর হয়ে গেছে, সে এখন সামনে? স্বপ্ন দেখছে না তো?

default-image

স্বপ্নঘোরে বেশিক্ষণ সময় ব্যয় করতে হয়নি। সেই চিরচেনা নীলার চিৎকার! ‘এত দেরি হলো কেন? বাসাটা জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছ, এই বাসায় কোনো মানুষ থাকা সম্ভব নয়, ফ্রিজে সব পচা–বাসি খাবার রেখে দিয়েছ...’ আরও কত অভিযোগ! আজ সৌরভের কাছে নীলার কণ্ঠটা কর্কশ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, পুরো বাসাটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নীলা মানেই ক্লান্ত সাঁঝবেলায় একটুখানি সুখের পরশ! সৌরভ কিছু না বলেই নীলাকে জড়িয়ে ধরল! চোখ দিয়ে মনের অজান্তেই গড়িয়ে পড়ল জল। নীলাও কেমন নিশ্চুপ হয়ে গেল। নীরব অশ্রুতে ভিজিয়ে দিল সৌরভের শার্ট। দীর্ঘ ছয় মাসের চাপা অভিমান যেন দুজনকে চোখের জলের স্রোতে ভাসিয়ে নিল। খুব কাছাকাছি থেকে একে অপরকে বুঝতে না পারার বোঝাটা অনেক ভারী। ভেতরের অনুভূতির অব্যক্ত ভাষা উপলব্ধি করতে না পারলেই সম্পর্কে তিক্ততা বিরাজ করে। সৌরভ এত দিনে বুঝতে পেরেছে নীলার ভেতরের চাওয়াটা। সারা দিনের শেষে প্রিয় মানুষটি বাড়ি ফিরে কাছে টেনে নেবে ভালোবাসার ছোঁয়ায়। সারা দিনের না বলা কথারা পাখা মেলবে মুক্ত আকাশে। নীলাও বুঝেছে, যখন–তখন চিৎকার করে অশান্তি করাটাও সমীচীন নয়। দুজনই দুজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে পরবর্তী অভিমানে যেন কেটে না যায় আরও ছয়টি মাস, সেই প্রতিজ্ঞাও করল।

* লেখক: শাহীন আক্তার স্বাতী, কানাগাওয়া কেন, জাপান

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন