default-image

মায়ের বাসা থেকে বুটের হালুয়া আর চালের রুটি আসছে। ভাবছি, শবে বরাত গেল কি? মায়ের স্পেশাল আইটেম শবে বরাতের!

মনে পড়ে গেল আর একদিনের কথা। খুব ভোরবেলা হোস্টেলে মা-বাবা দুজনই হাজির। কারণ, শবে বরাতের পর পরীক্ষা বলে বাসায় যাওয়া মিস হয়েছে! হাতে বয়ামভর্তি বুটের হালুয়া!

হোস্টেলে যাওয়ার দরুন নতুন পাখা গজানোর শাস্তি (ভালোবাসা পড়তে হবে) হিসেবে আমার হোস্টেলে থেকে যাওয়া আর মা-বাবার শাস্তি মেয়েকে হোস্টেলে যেতে দেওয়া! আসলে প্রথম বড় কোনো পরীক্ষার প্রিপারেশন চলছিল।

ময়মনসিংহের গরম মিষ্টি খাওয়া হয়নি কখনো, সেই সময়ে (মাঝরাত) ক্যাম্পাসের বাইরে কখনো যাওয়া হয়নি বলে!

এখানে মালাইকারি পাওয়া যায়, খেতে খেতে মনে পড়ে গেল কৃষ্ণা কেবিন! কোনো কিছুর নাম মনে না থাকা আমার মনে পড়ে গেল নামটা! বান্ধবীদের অত্যুৎসাহে তাদের সঙ্গে গিয়ে প্রথম জানলাম, এখানে মাত্র একটা মিষ্টির অর্ডার দেওয়া যায়! মিষ্টিটা খেতেও ভীষণ মজা! এত দিন পরও উৎসাহের সঙ্গেই খাই!

মুক্তাগাছার মণ্ডার এত নাম শুনেছি, খেতে তত ভালো লাগেনি।
নানাবাড়ি, মাগুরার ছানার গোল্লা অমৃত! কাঁচাগোল্লা বলে লোকালি, জিবে পানি চলে আসে ভাবতেই!

টাঙ্গাইলের চমচম অতুলনীয়! সেদিকের বালিশ মিষ্টি। কত মণ যে মা-বাবা বিলিয়েছেন, আমাদের তখন এসএসসি, এইচএসসি বা মেডিকেলে ভর্তি উপলক্ষে, মনে হয় তাঁরাও জানেন না।

কুমিল্লার রসমালাই, না বললেই নয়!
যশোরের ছানার মিষ্টি, যদি কেউ খেয়ে না থাকেন, জীবনে একবার অন্তত খাবেন!
ছানার ঢাকার মিষ্টিও খুবই মজার—মিষ্টি কম!
আলাদিনের কালো আর সাদা চমচম—আমি শিওর, সবাই খেয়েছেন!
বাগাটের দই! আসলে ওদিকের সব জায়গার দই!  জানি, জানি বলবেন, বগুড়ার দই! দুটোর দুরকম স্বাদ! বাগাটের দই না হলে ওদিকের কোনো অনুষ্ঠান (বিয়ে) পূরণ হয় না! খেয়ে দেখবেন!

বিজ্ঞাপন
default-image

হাজারো রকমের জিলাপি খাওয়ার পর মনে হয়, মৌচাকের মতো কেউ বানায় না! আশা করি দোকানটা আজও আছে! অবশ্য গরম জিলাপির মজাই আলাদা! বিদেশে বসে ভীষণ মিস করি।

নেপালে সকাল সকাল এক পিস করে জিলাপি বিক্রি হয়, নাশতার জন্য! ইশ, যদি দেশেও সে ব্যবস্থা থাকত! নামাজের পর মিলাদের জিলাপি? মণকে মণ আসত, যেদিন আমাদের বাসার মিলাদ হতো। গরম-গরম মুচমুচে রসে ভরা জিলাপি!

এখানে এসে শুনেছি ছানার জিলাপি! দেশে কখনো দেখিনি! আমার ছেলের খুব পছন্দ!
ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের বিরিয়ানি তো জীবনের বিরিয়ানির বিশাল অংশ পূর্ণ! সেটা আসলে কোনো বিরিয়ানিই নয়! আরও ছিল নতুন একটা চিকেন বিরিয়ানির প্লেস, সেখানকার চিংড়ি ভর্তা মুখে লেগে আছে! খন্দকারের বিরিয়ানি ছাড়াও সেখানকার শিক্ষার্থীদের জীবন চালানো অসম্ভব! পাঁচতারার খিচুড়ির নামও শুনেছি খুব, তবে হোস্টেলে আমার কাজের খালার খিচুড়ি, আলুর চপ আর মাংসের ঝোল যাঁরা খেয়েছেন, তাঁদের মুখে লেগে আছে বলেই আমার বিশ্বাস। ওনাকে আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন। ক্ষুধার্ত মেয়েগুলো পেটপুরে খেতে পারত তাঁর কারণেই।

বিরিয়ানি বলতে ফখরুদ্দিন, পুরান ঢাকার কাচ্চি আর দুলাল মামার বাসার ঔরসের বিরিয়ানি (গত ২০ বছরে হয়নি)—আর কোনোটাই ভালো লাগে না! অবশ্য আমার পাকিস্তানি বান্ধবীর স্পাইসি বিফ বিরিয়ানি পেলে মজা করে খাই! প্রতি রোববার বাঁধা ছিল ওর হাতের বিফ বিরিয়ানি। যদি কখনো ঠেকায় পড়ে ভেজিটেবল বিরিয়ানি খেতেই হয়, আমার ভারতীয় বান্ধবীর হাতে ছাড়া নয়!

ময়মনসিংহ মার্কেটের পেঁয়াজু আরা আলুর টিকিয়া! কাবাবেরও ছোট একটা টং ছিল। স্পেশাল দিনে তা না খেলেই নয়!

শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ পারে মালাই চা! গাঙিনার পারে মুকুলের চা! নামেই বিখ্যাত, ওদিকে যাঁরা গেছেন, জানেন।

মোমো (চিকেন, খাশি, ডাম্পলিং) অবশ্যই নেপালের! ওদের চিকেন রোস্টও খুবই মজার! নিউইয়র্কে এক দোকানেই শুধু সেই মোমোর স্বাদ পাই! আমি নিউইয়র্কে গেলে মিস করি না। আর যদি ট্রানজিটেও সময় পাই, চলে যাই সে দোকানে। লাগোয়া বাঙালি দোকানের বিরিয়ানিরও তুলনা নেই।

default-image

দেশি থাই স্যুপ শুধু দেশেই পাওয়া যায়! এই থাই স্যুপ কিন্তু আসলে থাই স্যুপ নয়! থাই খাবার আমি থাইল্যান্ডে খাইনি স্যানিটারির ভয়ে, কিন্তু বন্ধুর বয়েল্ড ফিশটা ভালো লেগেছে! অন্য কোথাও সে দেশি থাই স্যুপ বা খাবার পাবেন না।

একই কথা চলে দেশি চাইনিজের বেলায়! দুনিয়ার এত চাইনিজে দোকানে খেলাম, তারা নাকি অথেনটিক চাইনিজ! আমাদের দেশে চাইনিজ বলে যে কি বেঁচে? তার চেহারাও আসল চাইনিজ দোকানে দেখি না। তবে যা-ই বেচুক, তার তুলনা হয় না! কোনো চাইনিজ দোকানে এখানে সে রকম ফ্রাইড রাইস, ভেজিটেবল বা চিকেন ফ্রাই বিক্রি করে না! দেশি চাইনিজ খাওয়া জিবে অন্য কোনো অথেনটিক চাইনিজ রোচে না! প্রতিটি চায়না টাউন ঘুরে আমি আমার প্রিয় চাইনিজ ফুডের দেখা পাইনি।

ইন্ডিয়ায় চাইনিজ বলে যা বিক্রি হয়, তা-ও ভিন্ন! মুখে তুলতে পারিনি। তবে ইন্দো-চাইনিজ বলে এখানে আমাদের ভীষণ প্রিয় খাবারের দোকান ছিল, যাতে আমরা প্রতি সপ্তাহে ঢুঁ দিয়ে আসতাম! গ্লোবাল ডিপ্রেশনে, সে দোকান হারিয়ে গিয়ে আমাদের কষ্টে ফেলে গেছে!

ভেতো বাঙালির আরেক পছন্দ থাই খাবার এখানে, বাচ্চাদের ভাতপ্রেমের জন্যই যেকোনো স্টেটে গেলে যাওয়া হয় এসব দোকানে! আবারও বলি, দেশি থাই বলে যা খাই, তার ছিটেফোঁটাও এসব অথেনটিক দোকানে পাওয়া যায় না!

মালয়েশিয়ার ছিটরুটি আর মাংস চেখে দেখতেই হবে! একদম দেশি স্টাইল, যারা কখনো ছিটরুটি খেয়েছেন, তাঁরাই এর মাহাত্ম্য বুঝবেন। মালয়েশিয়ার আরেক বিখ্যাত খাবার ম্যাংগো উইথ সুইট রাইস! বন্ধুর আগ্রহে খেয়ে একদম ছোটবেলায় চলে গেলাম!

দুধভাতের সঙ্গে, আম, কাঁঠাল, কলা, গুড়, মিষ্টি না হলে আমাদের রাতের খাওয়া শেষ হতো না! ওহ কী স্বাদ! বন্ধুকে অনেক ধন্যবাদ বিদেশ বিভুঁইয়ে আমার ছেলেবেলা উপহার দেওয়ার জন্য।

বিজ্ঞাপন
default-image

সকালেও ছোটবেলায় আমাদের ফলাহার ছিল আম, কাঁঠাল, কলা, দুধ, মুড়ি, খই! আরও এক স্পেশাল ছিল যবের ছাতু! সিরিয়াল, ওটমিল খেতে গেলে মনে হয়, আমরা কত স্পেশাল ছিলাম! এখন আর হয় বলে মনে হয় না! দাদি ছাতু রেখে দিতেন তাঁর বড় ছেলের জন্য। আর বানাতেন পিঠা! আমাদের ঘরে বিশাল বিশাল হাঁড়ি ভরে হতো পিঠা, সেখান থেকে সব চাচর ঘরে যেত থালা ভরে ভরে! চিতই হোক, তেলেভাজা হোক, ছই পিঠা যা-ই হোক!

রোস্ট বলতেই দেশি বিয়েবাড়ির রোস্ট আর আমার এক মামির বাসার রোস্ট! আমার মায়ের হাতের রোস্টও অতুলনীয়! এখানে মায়ের দাওয়াতে কেউ এলে তাঁরা তাঁদের বাসার জন্য বাটি ভরে নিয়ে যান। আমার মা-বাবা খাওয়াতে ভীষণ ভালোবাসেন। খুশি মনে সবার জন্য এক্সট্রা রান্না করা তাঁদের দেখেই শেখা।

গরুর মাংস, ভুনা, কষা—এক মামির বাসার মতো কখনো পাই না! এখানে এক রেস্টুরেন্টে ভালো বানায় ইদানীং! গেলেই সেটা অর্ডার করতে হয়! গরুর মাংসের রান্নার গন্ধে আমার ছেলের জিবে পানি আসতে দেখে আমার মন ভালো হয়ে যায়! রান্না করটা সার্থক মনে হয়।

ইন্ডিয়ানদের হাজারো রকম মসলার খাবার আমার পছন্দ কোনকালেই হয় না! না পেরে খাই।

কোথাও গেলে যদি নেপালি কোনো দোকান দেখি, ঢুঁ মারতেই হয় সেখানে। ওই ভাত, মাংস, সবজি আর মোমো!

কাবাব বেস্ট মেডিটেরিনিয়ান/গ্রিক—ওদের সালাদও! মিডিলইস্টার্ন কাবাব, এই বেঁচেই যে কেউ বড়লোক হয়ে যেতে পারে!

আমেরিকান স্টেক/বার্গার! কিন্তু না বললেই নয়, দেশি বার্গার ও খেতে মজার। শুধু আল্লা মালুম তাতে কী দেয়! ব্রাজিলিয়ান স্টেকও, যাঁরা স্টেক পছন্দ করেন, চেখে দেখবেন।

নাশতায় হোস্টেলের পুরি, আলুর চপ না বললেই নয়! কলেজের বা হসপিটালের ক্যানটিনের আদা-চা বা দুধ-চা, পরোটা ডিম বা পুরি-শিঙাড়া না হলে সারা দিন মনে হতো দিনটাই মিছে। আর ছিল ক্যাম্পাসে এক মামার বানানো ঝালমুড়ি আর ফুচকা! প্রতিদিন খেতেই হতো। একা নয়, বন্ধুবান্ধবসহ!

আমি তো ভাই বেগুন, রান্না করতে হবে, টাইমটা আসলে পাস করতে চাচ্ছি! লাঞ্চ আর ডিনারটা কোথায় করা যায়, প্ল্যান করছি! আপনিও যদি ভোজনরসিক হন, তবে আজই চেখে দেখুন হাতের কাছে যা পান।
*লেখক: চিকিৎসক

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন