default-image

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) রাতে আশপাশের লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ভয় আর বিস্ময় কাজ করছিল মনে। কী হলো? কোথাও আগুন লাগল না তো? জানালা দিয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। প্রবল শীতের রাত। এই ঠান্ডায় রাস্তাঘাটে লম্বা সময় ধরে হইহল্লা করা সম্ভব নয়! একটু পরে বুঝলাম, আওয়াজটা আসছে প্রতিবেশীদের বাসা থেকে। এমনিতে এ দেশে কারও বাসার আওয়াজ অন্য বাসায় যায় না। শিশু সন্তানটি মেঝের ওপর দিয়ে একটা দৌড় দিলেও প্রবল শঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়, কখন না আবার নিচের ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন!

একটু পরে ফেসবুকে ঘটনার কারণ উদ্ধার করলাম। নিউইয়র্কে দীর্ঘদিন বসবাসকারী অনেক বাঙালিই স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। তারপর একজনকে ফোন করতেই বললেন, সে খুব ব্যস্ত। কথা বলার সময় নেই। আসলে পুরো আমেরিকাবাসীই মহাব্যস্ত। সুনসান রাস্তাঘাট। দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতা-বিক্রেতার সবার নজর টিভি সেটের দিকে। এনএফএল অর্থাৎ আমেরিকান ন্যাশনাল ফুটবল লিগ তথা সুপার বোলের ফাইনাল ছিল সেদিন। খেলায় নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টস ২৮-২৪ পয়েন্টে পরাস্ত করে সিয়াটল সিহকসকে। আগস্টে মৌসুম শুরু হয়ে প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির প্রথম রোববার ফাইনাল খেলা হয়ে থাকে। এবারের ভেন্যু ছিল অ্যারিজোনা। ওখানকার আবহাওয়া এখন চমৎকার। তবে চ্যাম্পিয়ন দলের আবহাওয়া ভাগ্য খুব খারাপ। বোস্টনভিত্তিক দল প্যাট্রিয়টসরা তাদের বিজয় উদ্‌যাপনের আয়োজন পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে খারাপ আবহাওয়ার জন্য। তুষার ঝড় বা ব্লিজার্ড এবার সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে বোস্টনে। টানা প্রবল তুষার ঝড়, উঁচু তুষারের আস্তরণ, বন্যাসহ ভয়াবহ অবস্থা গেছে এ কদিন ওই অঞ্চলে। তবে তাদের এই দুর্বিষহ ভোগান্তিকে কড়ায়গন্ডায় ধুয়ে-মুছে দিয়েছে প্যাট্রিয়টসের শিরোপা অর্জনের আনন্দ।

default-image

এটা বলার জন্য কোনো পরিসংখ্যান বা জরিপের প্রয়োজন নেই যে মার্কিন মুলুকে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো আমেরিকান ফুটবল। বাস্কেটবল বা বেসবলের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা থাকলেও একটি বিষয়ে তারা পিছিয়ে আছে। আমেরিকান ফুটবল ছেলে-বুড়োবুড়ি পুরো পরিবারের বিনোদনের মাধ্যম। একটি পরিবারের সবাই মিলে খেলাটি উপভোগ করেন। যে কারণে আমেরিকান ফুটবলের ফাইনাল দেখার জন্য যে পরিমাণ দর্শক টিভি সেটের সামনে বসে থাকে, সেই সংখ্যক দর্শক আর কোনো খেলা বা কোনো অনুষ্ঠানেই থাকে না। এই দর্শকসংখ্যা বিশ্বকাপ ফুটবল বা অলিম্পিক গেমস কিংবা ইউরোপিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের দর্শকের কাছাকাছি বা বেশিই হয়ে থাকে।
বিশ্বকাপ ফুটবলে সারা বিশ্ব মাতলেও আমেরিকাবাসীদের কিন্তু এ নিয়ে তেমন কোনো হেলদোল নেই। এমনকি নিজের দেশের খেলা থাকলেও অনেকেই সেটা জানে না বা জানলেও সেভাবে মাথা ঘামায় না। কিন্তু আমেরিকান ফুটবলের কথা আলাদা। এখানকার প্রতিটি মানুষের সব সেরা বিনোদন এটি। এমনিতে দেশটি বারো জাতের দেশ। এক নিউইয়র্ক শহরে ঘুরলেই বোঝা যায়, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ বা জাতির মানুষ নেই যে এই শহরে বাস করে না। তাদের ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস...কিন্তু একটা জায়গায় সবাই এক...সেটা হলো আমেরিকান ফুটবল।
এই একটা ক্ষেত্রে আমেরিকানরা সবার থেকে আলাদা। এটা তাদের জন্য বড় একটা গর্বের কারণও হতে পারে। তারা আন্তর্জাতিক কোনো টুর্নামেন্ট নিয়ে মাতামাতি করে না। তারা নিজের দেশের ঘরোয়া লিগ নিয়েই মাতোয়ারা। এমনকি তার উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছে সারা বিশ্বে। এনএফএলের ম্যাচের নিয়মিত দর্শক আমেরিকার মতো তার প্রতিবেশী দুই বিশাল দেশ কানাডা ও মেক্সিকো। আমরা যেটাকে ফুটবল বলি, সেটা বেশির ভাগ আমেরিকানদের কাছে ইউরোপিয়ান সকার বলে পরিচিত। তারা এটাকে মনে করে মেয়েদের ফুটবল। যে কারণে এ দেশে পুরুষের চেয়ে নারী ফুটবল লিগ বেশি জনপ্রিয়। আর আমেরিকান ফুটবলকে তারা মনে করে প্রকৃত পুরুষের খেলা। ব্যাপারটা বেশ মজার!
এ দেশে আসার পরে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় খুব অবাক হয়েছিলাম। আমরা যে এলাকায় থাকি সেখানে প্রচুর স্প্যানিশভাষী লাতিন আমেরিকান লোকজন বাস করে। তাদের ব্যাপক আগ্রহ ফুটবল নিয়ে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলা থাকলে বার-রেস্টুরেন্ট, মুভি থিয়েটারে তারা দল বেঁধে খেলা দেখে। আর মেক্সিকো বা কলম্বিয়ার ম্যাচ থাকলে তো কথাই নেই, হাজার হাজার মানুষ গায়ে পতাকা জড়িয়ে নেমে আসে ঘর থেকে। এই দুই দেশের মানুষের অধিক বাস এই এলাকায়। ইকুয়েডর কিংবা চিলির ম্যাচ থাকলেও টের পাওয়া গেছে প্রবলভাবে। ব্যতিক্রম কেবল আমেরিকা বা ইউএসএ দল। কোথায়, কবে খেলতে গেল, কার সঙ্গে খেলছে, এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এমনই দুর্ভাগা এ দেশের সকার খেলোয়াড়দের। ইউরোপ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা যেখানেই যান, সকার খেলোয়াড়দের নিয়ে এতটা অবহেলা কোথাও পাবেন না। বরং প্রবল উন্মাদনার চিত্রটাই আমরা পাই।

default-image

মাঠে ফুটবল মানে গ্যালারিভরা দর্শক, মাঠে তুমুল উত্তেজনা, ধারাভাষ্যকারদের শ্বাসরুদ্ধকর ধারা বর্ণনা—সবই ঠিক আছে। কিন্তু ফুটবলটা ঠিক যেন আমাদের চিরচেনা চেহারায় নয়। আমেরিকান ফুটবলকে অনেকে আবার আমেরিকান রাগবিও বলে। খেলার নিয়মকানুন বেশ জটিল। প্রত্যেক দলে ১১ জনই থাকে এখানে। বিভিন্ন অ্যাডভান্টেজের সুবাদে পয়েন্ট পাওয়া যায়। ৩২টি পেশাদার দল আছে এনএফএল-এ। এর মধ্যে নিউইয়র্ক সিটির দুটি বড় দল আছে আর সিটির বাইরেও একটা দল আছে। প্রতিটি দল হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলে অন্য দলের বিপক্ষে।
আমেরিকান অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করে এই লিগ। টিভি কভারেজের ধারে কাছেও কেউ নেই লিগের ম্যাচগুলোর কাছে। এমনকি মার্কিন মুলুকের বাইরে পৃথিবীর আরও ২৬০ দেশে সম্প্রচার হয় এর খেলা। একটি দেশের ঘরোয়া খেলা প্রচারের জন্য এতটা প্রচারণা ভাবা যায়! ফাইনালে সুপার বোল পার্টির জন্য হীরকখচিত আংটি তৈরি করা হয়। আমেরিকান ফুটবলের স্মারক হিসেবে সংগ্রহে রাখার জন্য মানুষ হুড়োহুড়ি করে সেই আংটি কেনার জন্য। টাকা থাকলে কি না করা যায়! আহা!

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন