default-image

ইস্তাম্বুলের বাংলাদেশ কনস্যুলেট যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যে গণহত্যা দিবস পালন করেছে। এ উপলক্ষে গতকাল ২৫ মার্চ স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় মিশনের আলোচনা কক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

ইস্তাম্বুলে নিযুক্ত বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম আলোচনার শুরুতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও নির্যাতিত মা-বোনদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কালানুক্রমিক ঘটনাবলি বর্ণনা করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর আপসহীন নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পেয়েছি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত বিভীষিকাময় গণহত্যার ওপর আলোকপাত করে ড. ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করে। সেই রাত থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নয় মাসব্যাপী তাণ্ডবে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ এবং দুই লাখ নারীর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। প্রায় এক কোটি মানুষ শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী তাদের পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ, যেমন—অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক, লেখক, ছাত্র, সাংস্কৃতিক কর্মীকে হত্যা করে। এ জন্য ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালিত হয়।

বাংলাদেশে গণহত্যা দিবস পালনের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য তুলে ধরে কনসাল জেনারেল বলেন, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মাহুতির প্রতি জাতির শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের সাক্ষ্য হিসেবে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ মহান জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেই বছর থেকেই এ দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হচ্ছে। এ দিবসটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে প্রবাসীসহ উপস্থিত সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষ করে গণহত্যা–সম্পর্কিত কনভেনশন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে।

বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা বিষয়ে তথ্য প্রচার ও ব্যাপক জনমত গঠনের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, জাতিসংঘ কর্তৃক বর্ণিত গণহত্যার প্রকৃতি–সংক্রান্ত প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নারকীয় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ মিলে যায়। এ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণহত্যা–সংক্রান্ত সকল তথ্য-উপাত্ত, দালিলিক প্রমাণাদি, গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য বা আখ্যান, স্থিরচিত্র, চলচ্চিত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করতে হবে। বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রসহ বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রকে গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়ে অনুরোধ জানাতে হবে। তিনি গণহত্যার বিচারের তাৎপর্য ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি আরেকটি গণহত্যা নিরোধে সাহায্য করে। গণহত্যার অস্বীকার বা বিচারহীনতা শুধু গণহত্যার শিকারদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগকে অস্বীকার ও তাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে অসম্মান করে না—সে রকম অপরাধ পুনরায় ঘটাতেও প্রকারান্তরে উৎসাহিত বা প্ররোচিত করে। গণহত্যা নিরোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, গণহত্যা শুধু বাংলাদেশিদের ক্ষতি সাধন করেনি, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে মানবজাতির বিরাট ক্ষতি সাধন করেছে। গণহত্যা থেকে মানবতা রক্ষা ও মানবজাতিকে মুক্ত করার জন্য অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে তিনি আন্তরিকভাবে অনুরোধ জানান।

আলোচনা শেষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ এবং নির্যাতিত মা-বোনদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। এ ছাড়া শুরুতে গণহত্যার ওপর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রচারের পর দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণী পাঠ করা হয়।

অনুষ্ঠানে কনসাল বিদোষ চন্দ্র বর্মণ, মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইস্তাম্বুলপ্রবাসী বাংলাদেশিরা উপস্থিত ছিলেন। বিজ্ঞপ্তি

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন