default-image

টরন্টোর সর্বস্তরের সুধী সমাজ নাগরিক সমাবেশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান গণিতজ্ঞ ও সাহিত্যিক মীজান রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়েছেন ৮ ফেব্রুয়ারি। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা, তাঁর পছন্দের গান ও কবিতা পাঠের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করেন টরন্টোপ্রবাসী বাংলাদেশিরা।

ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর স্কারবোরো ক্যাম্পাসের লেকচার হলে আয়োজিত এই স্মরণসভার শুরুতেই সঞ্চালক শেখর গোমেজ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটি কোনো শোকসভা নয়, একজন কৃতী মানুষের জীবন উদযাপন। তা সত্ত্বেও কৃতী এই মানুষটির সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতির কথা মনে করে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে এবং গান গাইতে গিয়ে ভেতর থেকে উথলে ওঠা বেদনায় কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে ওঠে অনেকেরই। জীবন উদযাপনের আয়োজনেও তৈরি হয়ে যায় শোকের আবহ। এমনিতর পরিবেশেই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় টরন্টোবাসীরা স্মরণ করে বাংলাভাষী কৃতী এই মানুষটিকে।
মীজান রহমানের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র নায়ক এর প্রদর্শনী দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু হয়। প্রযোজনা সংস্থা সুপ্রিয়তি ইনোভেশন ও দেশি টেলিভিশনের কর্ণধার খান মঞ্জুরে খোদা এবং নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক আকতার হোসেন যৗথভাবে এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন। মঞ্জুরে খোদা প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন।
প্রায় ৫৫ মিনিটের এই প্রামাণ্যচিত্রটির প্রদর্শনী শেষ হতেই একদিকে পুরো অডিটোরিয়ামে আলো জ্বলে ওঠে। অন্যদিকে সমবেত কণ্ঠে শিল্পীরা গেয়ে ওঠেন ‘আলো আমার আলো ওগো আলো ভুবন ভরা’ গানটি। আলোর গান দিয়েই মূলত মীজান রহমানের জীবন উদযাপন পর্বের শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য দেন উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক আকবর হোসেন।
মীজান রহমানের জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তব্য দেন সাবেক ছাত্রনেতা নাসির-উদ-দোজা, নাট্যকার-লেখক আকতার হোসেন, লেখক-গবেষক সুব্রত কুমার দাস, শিক্ষক টিটো খন্দকার, নতুন দেশ ডটকমের প্রধান সম্পাদক শওগাত আলী, অশোক বড়ুয়া ও মীজান রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্রী লিজা। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে পরিবেশিত হয় মীজান রহমানের পছন্দের কিছু গান ও কবিতা আবৃত্তি। এতে অংশ নেন কণ্ঠশিল্পী শাহজাহান কামাল, ইলোরা আমিন, ফারহানা শান্তা, হাসমত আরা চৌধুরী, সুব্রত পুরু, মুক্তি প্রসাদ, স্নিগ্ধা চৌধুরী, প্রতিমা রানী সরকার, ভ্যালেন্টিনা অধিকারী, সুনীতি ধর, রিনি সাখাওয়াত ও মীজান রহমানের নাতনি মনীষা। তবলায় সহযোগিতা করেন সজীব চৌধুরী।

default-image


আকবর হোসেন তাঁর সূচনা বক্তব্যে মীজান রহমানকে ধর্মান্ধতা ও সব ধরনের কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে একটি আলোর মশাল হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁর এই প্রস্থান শুধু বাঙালিদের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক গণিতচর্চার ক্ষেত্রেও অপূরণীয় ক্ষতি।
নাসির-উদ-দোজা মীজান রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের বা দলীয় রাজনীতির সমর্থক ছিলেন না। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের একটাই পথ, সেটি হচ্ছে বিপ্লব। তিনি মনে করতেন, কেবল বিপ্লবের মাধ্যমেই বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলায় পরিণত করা সম্ভব।
আকতার হোসেন বলেন, মীজান রহমান গণিতের গবেষক হলেও তিনি বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। তাঁর লেখালেখিতে গ্রামবাংলার চিরায়ত দৃশ্যপট অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। সাহিত্যচর্চায় তিনি মানুষ আর মানবতাবোধকে সবার ওপরে তুলে ধরেছেন।
টিটো খোন্দকার তাঁর বক্তব্যে মীজান রহমানের গণিত গবেষণা ও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের সাফল্যের বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশি একজন গণিতজ্ঞের লেখা বই পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণিতের ক্লাসে অবশ্য পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। এটি কেবল মীজান রহমানের সাফল্যের নির্দেশকই নয়, এটি বাংলাদেশেরই গৌরবগাথা। তিনি বলেন, মীজান রহমান নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ ছিলেন। আর সে কারণেই আধুনিক বাংলা বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তার নাম সন্নিবেশিত হয়নি। অথচ বাংলাদেশকে তিনি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানচর্চার অঙ্গনে সম্মানের আসনে বসিয়েছেন।
সুব্রত কুমার দাস মীজান রহমানের মানব ধর্মচেতনার বিবরণ তুলে ধরে বলেন, মীজান রহমান মনেপ্রাণে একজন মানুষ ছিলেন, ছিলেন অত্যন্ত উঁচু মাপের মানুষ। জাত-ধর্ম-বর্ণভেদে মানুষকে বিভাজিত করার ঘোরতোর বিরোধী মীজানের মৗল ধর্মই ছিল মানুষের প্রতি প্রেম।
অশোক বড়ুয়া তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীদের সংগঠিত করা এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে মীজান রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেন।
শওগাত আলী মীজান রহমানের ব্যক্তিজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, ৮০ পেরিয়েও মীজান রহমান ছিলেন একজন ঝকঝকে তরুণ। পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়ের পণ্ডিত অধ্যাপক হলেও মানুষের সঙ্গে মেলামেশায় তার কোনো ছাপ পড়ত না। বরং যেকোনো বয়সের, যেকোনো পেশার মানুষকেই তিনি আপন করে নিতে পারতেন। মানুষকে ভালোবাসতে পারা, মানুষকে সম্মান জানাতে পারার মতো বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি।
সবশেষে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গেয়ে মীজান রহমানের প্রতি সম্মান জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও বিপুলসংখ্যক সুধী এই স্মরণ সমাবেশে যোগ দেন।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন