বেড়ানো

গ্রীষ্মের ছুটিতে সল্ট লেক সিটিতে ভ্রমণ

বিজ্ঞাপন
default-image

ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করবে। তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। —ইবনে বতুতা।

তাই রীতিমতো বাধ্য হয়ে এই গল্প লিখতে বসা। তিন দিনের একটি লম্বা নীরস ছুটির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এখানে ছুটির দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের বেশি কাজ থাকে। এক সপ্তাহের রান্নাবান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, লন্ড্রি, বাজার করা, মাঝে মাঝে গবেষণা কাজের প্যারা বেশি থাকলে কাউকে কাউকে ল্যাবেও যেতে হয় ছুটির দিনগুলোতে।

শুক্রবার বিকেলে একটি কল এল অর্পার কাছ থেকে—‘আপু আমরা দুই দিনের সল্টলেক সিটি ট্যুরে যাচ্ছি। আপনি যাবেন?’ মনে তখন বাংলাদেশের লাড্ডু ফুটেছে। নিজ পরিমণ্ডল থেকে বাইরের পৃথিবী দেখতে কার না ভালো লাগে। আমি বললাম, অবশ্যই যাব।

ব্যাস, এভাবেই হলো আমাদের দুই দিনের সামার ট্যুর প্ল্যান। রাতের মধ্যেই আমরা সবাই গুগল মামাতে ঘাঁটাঘাঁটি করে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দুই দিনের মধ্যে ঘোরা যাবে এমন অনেকগুলো জায়গা বের করে ফেললাম। ঠিক হলো শনিবার সকাল ৯টায় আমরা সাতজন সল্টলেক সিটির উদ্দেশে রওনা হব।

default-image

যেহেতু আমাদের ট্যুরটা ছিল রোজার সময়, তাই আমরা এক দিনের ইফতারি সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সবকিছু গুছিয়ে, ঘুমিয়ে গেলাম।

সেই ছোটবেলা থেকে ভ্রমণকাহিনি পড়া ছিল নেশার মতন এবং এখনো সেই নেশাটা রয়ে গেছে। এই বয়সেও অ্যাডভেঞ্চার নামক নেশাকর বস্তু মস্তিষ্কের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ায়।

default-image

শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় আমরা সবাই একসঙ্গে গাড়িতে করে রওনা দিলাম। ড্রাইভিং সিটে ছিলেন পর্যায়ক্রমে তামিম ভাই ও ইমদাদ ভাই। একদিকে প্লে লিস্টে সবার অনুরোধে সবার পছন্দের গান চলছিল, আরেক দিকে চলছিল আড্ডা। পাহাড় আর গাছের লুকোচুরি দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চলছিলাম।

পথিমধ্যে একটা লোকেশন আমাদের পছন্দ হয়ে গেলে, সিদ্ধান্ত নিলাম সেখানে যাব। Willard Bay State Park, এই বিচে বোটিং, সুইমিং, ফিশিং, ওয়াটার স্কি, ক্যাম্পিং করা যায়। অসাধারণ একটা বিচ। এখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে, অসাধারণ কিছু দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে, আবারও রওনা দিলাম। বিকেলের মধ্যেই আমরা আমাদের ভাড়া নেওয়া এয়ারবিএনবির বাসায় চলে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে, ইফতারি সঙ্গে নিয়ে আবারও ঘুরতে বের হলাম আমরা।

default-image

এবার আমরা গেলাম Antelop Island state Park-এ। এটা বন্য প্রাণী দেখার উৎকৃষ্ট জায়গা। ডায়ার, ববক্যাটস, কোয়েটস, পাখি ও জলপাখির বিভিন্ন জাতির পাখির হোম বলা হয় এটাকে। কিন্তু সবচেয়ে বিখ্যাত হলো এন্টেলোপ আইল্যান্ডের আমেরিকান বাইসন। এটার নামকরণ হয় ১৮৯৩ সালে। এখন এখানে প্রায় ৬০০ প্রাণী আছে। এখানে একটি marina, সৈকতে পিকনিক ও ক্যাম্পিং স্পট আছে। সৈকতের ভবনগুলোর পাশে অবস্থিত ব্রিজার বে বিচ এলাকায় পানি পাওয়া যায়। অন্য সীমিত পণ্য ও পরিষেবা সরবরাহের জন্য একটি রেস্টুরেন্ট ও শাওয়ার নেওয়ারও সুবিধা আছে।

এখানে বিনোদনমূলক সুযোগ প্রচুর। তার মধ্যে হোয়াইট বালি সৈকত sunbathers এবং picnickers beckon অন্যতম। হাইকিং, বাইকিং ও ঘোড়ায় চলাচল করা যায় বলে দ্বীপগুলো মানুষকে আকৃষ্ট করে। একটি মরিনা sailboats, powerboats ও kayakersও আছে। ক্যাম্পাররা সুন্দর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখতে এখানে আসেন। অনেক লোক গ্রেট সল্ট লেকের নোনা পানিতে সাঁতার কাটতে পারেন। যা সমুদ্রের তুলনায় বেশ লবণাক্ত। কারণ এটি খুব নরম, জল অতিরিক্ত উষ্ণ ও মানুষ তার পৃষ্ঠতলের ওপর ভাসে।

আবারও কিছু সুন্দর মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করে আমরা রওনা দিলাম ইউনিভার্সিটি অব ইউটাহ-এর দিকে। ওখানে তামিম ভাইয়ার এক পরিচিত বাংলাদেশির সঙ্গে ক্যাম্পাসের ভেতরে ইফতারি করলাম অর্পার রান্না করা সুস্বাদু খিচুড়ি, কারিশমা আপু ও রুমা আপুর রান্না করা মজাদার ছোলা দিয়ে। সঙ্গে ছিল আরও অনেক কিছু। ইফতারি শেষ করে আমরা দেখতে গেলাম টেম্পল স্কোয়ার ও ক্যাপিটাল বিল্ডিং।

default-image

প্রায় এক শতাব্দী ধরে ক্যাপিটাল বিল্ডিংটি ইউটাহ-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থান। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ইউটাহ স্টেট ক্যাপিটাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ঐতিহাসিক সংরক্ষণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি ছিল। টেম্পল স্কোয়ারের মন্দিরের চত্বরটি মূলত একক বর্গাকার ব্লকের। যেখানে মন্দিরটি দাঁড়িয়ে আছে। এখন এটি ৩৫ একর এলাকা নিয়ে অবস্থিত। যার মধ্যে রয়েছে মূল ব্লক। আর এর মধ্যে মন্দির, আবাস, সমাবেশ হল এবং দর্শক কেন্দ্রগুলো অবস্থিত। পূর্বের শহর ব্লক-কয়েকটি ঐতিহাসিক বাসস্থান, জোসেফ স্মিথ মেমোরিয়াল বিল্ডিং, রিলিফ সোসাইটি বিল্ডিং ও চার্চ অফিস বিল্ডিংয়ের স্থান। উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে যেখানে চার্চ ইতিহাস ও শিল্পের মিউজিয়াম, পারিবারিক ইতিহাস গ্রন্থাগার ও সম্মেলন কেন্দ্র অবস্থিত।

সল্ট লেক টেম্পল ও কনফারেন্স সেন্টার—দুটিই ২০ মাইল দূরে অবস্থিত লিটল কটনউড ক্যানিয়ন থেকে প্রাপ্ত কোয়ার্টজ মোনোজোনাইট (যা গ্রানাইটের মতো মনে হয়) তৈরি। মূলত ক্যোয়ারজ মঞ্জোজাইট ব্লকের প্রত্যেকটির জন্য চার দিন করে সময় লেগেছিল। এটি এখনো পর্যন্ত নির্মিত বৃহত্তম থিয়েটার স্টাইল অডিটোরিয়াম বলে বিশ্বাস করা হয়। প্রতি বছর আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ মিলিয়ন আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটক আসেন এখানে।

default-image

আমাদের প্রথম দিনের ঘোরাঘুরি এখানেই শেষ হয়েছিল। পরদিন সকালে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বিয়ার লেকের উদ্দেশে। পথিমধ্যে ঘুরলাম লোগান ক্যানন (পর্বতমালা) ও রিচমন্ড। সঙ্গে অসাধারণ কিছু সিনিক ভিউ। বিয়ার লেককে তার তীব্র ফিরোজা-নীল জলের জন্য প্রায়ই রাকিবাসের ক্যারিবিয়ান বলা হয়। প্রথমেই আপনি ভাববেন এর রং কী বিস্ময়কর ও আশ্চর্য। যা এই লেকটাকে এত নীল করে তোলে? এর কারণ লেকে অবস্থিত চুনাপাথরের প্রতিফলন।

default-image

বিয়ার লেকের সৌন্দর্য পুরোটা উপভোগ করে আমরা রওনা দিলাম ইউটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। ক্যাম্পাসটি পুরোটাই পাহাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাম্পাসের ভেতরে দাঁড়িয়েই আপনি মনোরম পাহাড়ি দৃশ্য দেখতে পাবেন। কবিরা এখানে এসে ২-৪টা কবিতা নিমেষেই লিখে ফেলতে পারবেন।

কিছুক্ষণ ক্যাম্পাসটি ঘুরে আমরা আমাদের শেষ গন্তব্য বয়েসির উদ্দেশে রওনা দিলাম। পথিমধ্যে টুইন ফলসে এসে আমরা সবাই ইফতারিটা সেরে নিলাম। ইফতারির পরে এক কাপ কফি না হলে ঠিক জমে না। তাই কফি নিয়ে ট্যুরের ভালো লাগা নিয়ে কথা বলতে বলতে বাড়ি পৌঁছে গেলাম। শেষ হলো আমাদের ছোট্ট দুই দিনের সামার ট্যুর।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন