বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জাপানিদের কাছে ফুজি সান কেবল একটি ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি বা পর্বত নয়, জাপানের ইতিহাসজুড়ে সমস্ত জাপানি জনগণের জন্য সাহসের উৎস ও অন্যতম জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতীকও বহন করে। তাই তো জাপানের শিল্পকলা ও স্থিরচিত্রে প্রায়ই ঘুমন্ত এই আগ্নেয়গিরিকে দেখা যায়। এমনকি গ্রীষ্মকালের হানাবির (আতশবাজি উৎসব) রাতে নিকষ কালো আকাশে ঝলমলে আতশবাজি দিয়েও ফুজি সানের আকৃতি বানাতে দেখেছি। ইতিহাস বলে ১৭০৭-০৮ সালের দিকে শেষবারের মতো এখানে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে।

default-image

পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই আছে, যা দেখে আমাদের মনে বিস্ময় জাগে। আমার কাছে মাউন্ট ফুজি এমনই এক অপার বিস্ময়ের নাম। ছোটবেলায় মাউন্ট ফুজির ছবি দেখলেও চোখের সামনে দেখেছি চার বছর আগে, যেদিন প্রথম জাপানে এসেছিলাম। উড়োজাহাজে বসে নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার ঠিক আগমুহূর্তে সাদা তুষারে আবৃত একটি পর্বত দেখে সেদিন বুঝতে বাকি ছিল না যে এটিই মাউন্ট ফুজি। এরপর হঠাৎ একদিন বুঝতে পারি, আকাশ পরিষ্কার থাকলে আমি যে শহরে থাকি, সেখান থেকে মাউন্ট ফুজিকে দেখা যায়। তার পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ট্রেন থেকে মাউন্ট ফুজির অপার সৌন্দর্য দেখে দিন শুরু হতো। এমনও দিন গেছে, ট্রেনের সিটে না বসে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে শুভ্র তুষারের টুপি পরিহিত ওই মহিমান্বিত সৌন্দর্য উপভোগ করতাম। কী অপরূপ সে দৃশ্য!
কিন্তু কেন যেন এত দূর (১২৬ কিলোমিটার) থেকে এভাবে শহুরে দালানের ফাঁক দিয়ে একঝলকের দেখায় আমার সাধ মিটত না। শুধু আমি নই, আমার মতো আরও তিন ফুজিপ্রেমীরও (সুমন ভাই, অর্থী আপু আর সোহাগ) একই অবস্থা ছিল। তাই তো মাউন্ট ফুজিকে খুব কাছ থেকে নয়নভরে উপভোগ করতে ২০১৮ সালের নভেম্বরে চারজন চলে যাই লেক কাওয়াগুচিতে।

মাউন্ট ফুজির চারপাশে পাঁচটি লেকের অন্যতম কাওয়াগুচি। কালচে নীল জলে টইটম্বুর শান্ত সরোবরে শুভ্র-ধবল বরফাচ্ছাদিত মাউন্ট ফুজির প্রতিচ্ছবি যেন সরোবরের সৌন্দর্যকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিল। আমরা সেদিন ফুজি সানকে এক অন্য রূপে দেখেছিলাম। পরের বছর আমরা মাউন্ট ফুজিকে আবার দেখতে গিয়েছিলাম ফুজি শিবাসাকুরা উৎসবে। কিন্তু আমাদের কপাল খারাপ, সেদিন ফুজি সান মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। বেশ মন খারাপ হয়েছিল আমাদের।

default-image

জাপানের এ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয় করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি জাপানে আসার পর থেকেই। সেই স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যে দেশি-বিদেশি সব বন্ধুকেই মাউন্ট ফুজি আরোহণের নিমন্ত্রণ জানাতাম। যেহেতু সামিট পয়েন্ট সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩.৭৮ কিলোমিটার ওপরে, তাই অনেকেই ওখানে ওঠার সাহস সঞ্চয় করতে পারত না। আর আমি নিজেও একা যেতে সাহস পেতাম না। কারণ, আমার পর্বতারোহণের কোনো পূর্ব–অভিজ্ঞতা নেই। হঠাৎ একদিন সুমন ভাই আর অর্থী আপু (শিক্ষার্থী দম্পতি নামেও বেশ পরিচিত) আমার ডাকে সাড়া দেন, সঙ্গে যুক্ত হন মুস্তাফিজুর সুমন ভাই। আমাদের চারজনের লক্ষ্য ছিল দুটি। মাউন্ট ফুজির চূড়ায় উঠে সূর্যোদয় দেখব আর জাপানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে উঠে লাল-সবুজের পতাকা ওড়াব। যেই কথা সেই কাজ। খুব দ্রুতই আমাদের মাউন্ট ফুজি আরোহণের জন্য সব ধরনের বুকিং শেষ করে কাঙ্ক্ষিত দিনের অপেক্ষা করতে থাকলাম। আর এর মধ্যে আমরা পর্বোতারোহণের প্রস্তুতিও সেরে নিলাম। সবচেয়ে বড় যে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, তা হলো মানসিক। আর এই মানসিক দৃঢ়তাই আমাদের মাউন্ট ফুজি সামিট করতে সাহস জুগিয়েছিল।

default-image

অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষে চলে এল বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন। আমি অবশ্য আগের রাত থেকেই বেশ উতলা ছিলাম। ঘড়ির কাঁটা যেন ঘুরেও ঘুরছিল না, সকালের সূর্য যেন উঠেও উঠছিল না। উত্তর গোলার্ধে দীর্ঘতম রাত ২১ ডিসেম্বর হলেও এই রাত আমার কাছে অনন্ত মনে হয়েছিল।

চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে খুব ভোরে আমরা রওনা হয়ে যাই টোকিওতে অবস্থিত শিনজুকু পোস্ট অফিসের উদ্দেশে। কারণ, সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে সেখানে ট্যুর কোম্পানির অফিস থেকে ট্যুরের যাবতীয় কাগজপত্র ও টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। আমরা সবকিছু বুঝে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর একজন গাইড আমাদেরসহ আরও যাত্রীদের নিয়ে বাসের উদ্দেশে হাঁটতে থাকেন। আমাদের বাসে উঠিয়ে তিনি জাপানি ভাষায় বেশ কিছু নির্দেশনা দিতে লাগলেন। আমি জাপানি ভাষায় পারদর্শী না হওয়ায় মুস্তাফিজ ভাই বাংলায় বুঝিয়ে দিলেন। যাবতীয় নির্দেশনা দেওয়া শেষ হলে বাস আমাদের নিয়ে টোকিও নগরীর ব্যস্ত কোলাহল পাশ কাটিয়ে পাহাড়-পর্বতের বুক চিরে ছুটে যেতে লাগল মাউন্ট ফুজির পঞ্চম স্টেশনের উদ্দেশে। চলবে...

লেখক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, চিবা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন