default-image

পাপে-পুণ্যে এ পৃথিবী, এই প্রাণ তারচে অধিকে।
আমি আছি, তুমি নেই, এইভাবে দুজন দুদিকে
অপসৃত; তাই তো নশ্বর নারী কবির বিশ্বাসে,
ভালোবেসে যাকে ছুঁই, সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে…।
নির্মলেন্দু গুণ-এর কবিতার এই অংশটি পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম ভালোবেসে যে যাকে ছুঁয়ে দেয়, আসলে সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে। যাক তবে। কেউ চলে চলে যেতে চাইলে তাকে যেতে দেওয়া উচিত। তাকে আটকানোর চেষ্টা করাটা বোকামি। কারণ, যতবার সে চেষ্টাই করুন না কেন, যে যাওয়ার সে যাবেই। তাকে বৃথা অনুনয় করে নিজেকে ছোট করা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো লাভ নেই। কেউ কেউ চলে যাওয়া মানুষটাকে আগলে থাকতে চায় বলেই ‘থেকে যাও থেকে যাও’ বলে অনুনয় করে। অথচ সে থাকেই না বরং উল্টো কিছু মানসিক কষ্ট দিয়ে যায়।

একটা তুমুল প্রেমের শুরুর পর একদিন হঠাৎ কেন সে সম্পর্কে নীরবতা চলে আসে কিংবা একদিন মানুষটি কেন এত দিনের লালিত প্রেম ছেড়ে চলে যায়!

তার সহজ উত্তর হলো, একদিন যে স্বপ্ন আর তুমুল আগ্রহ আর আবেগে সে প্রেমে পড়েছিল, আস্তে আস্তে সে তুমুল প্রেম আর তীব্র আগ্রহে ভাটা পড়ে। আবেগটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। একটা সময় যে মানুষটা আপনাকে বিভোর করে রাখত। কী খেয়েছ আজ? তোমাকে কি অন্য কেউ মেসেজ দেয়? ওকে ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড করবা না, অন্য কারও সঙ্গে চ্যাট করবা না, এ করবা না, সে করবা না...ইত্যাদি অনেক কথা বলে রোজ ঝগড়া–অভিমান আর ভালোবাসায় বিভোর করা মানুষটির প্রতিটি কথাই আপনি নিঃসংকোচে মেনে নেওয়ার পরও সেই প্রিয় মানুষটি আস্তে আস্তে চলে গেলে নিজেকে অনেক অসহায় লাগে।

রোজ যে মানুষটির মেসেজে ঘুম ভাঙত, আবার তার মেসেজ পড়েই ঘুমাতে যেতে হতো, সেই মানুষ একদিন আস্তে আস্তে নীরব হয়ে গেলে অনেক দিন বুকে অস্পষ্ট কষ্ট আর কান্না সঙ্গী থাকে।

মানুষটা একদিন হুট করে হারিয়ে যায় না। মানুষটার আবেগ, বিশ্বাস, ভালোবাসা অল্প অল্প করে যখন কমতে থাকে, তখন সে আস্তে আস্তে ফোনকল কমিয়ে দেয়, যেখানে দিনে অজস্রবার কল দিত, তখন সে দিনে একবার–দুবার কল দিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। মেসেজ লেখা কমিয়ে দেবে। দেখা করাটা হয়ে উঠবে তার আগের মতো। সবকিছুর মূলে থাকবে একমাত্র অজুহাত ব্যস্ততা। নিদারুণ ব্যস্ততা তাকে আগলে রাখবে আপনার কাছ থেকে।

default-image

আপনার কাছে তখন এক এক করে জমতে থাকবে অভিযোগ, অভিমান আর তীব্র অপেক্ষার ভালোবাসাটুকু। তার অল্প অল্প নীরবতা, এড়িয়ে যাওয়া, অল্প অবহেলাটুকু আপনি আস্তে আস্তে বুঝতে পারবেন। আপনি এ–ও বুঝতে পারবেন যে তার পৃথিবী থেকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছেন। সবই বুঝবেন অথচ মন মানবে না। মস্তিষ্ক আপনাকে তার বিষদ বলে দেবে কিন্তু আপনার মন মানবে না। মন বলবে, এখনো সে খুব ভালোবাসে, হয়তো তার সত্যি সত্যি ব্যস্ততা। এখন মস্তিষ্ক নয়, আপনার মন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। কারণ, মানুষটার প্রতি আপনার ভালোবাসা এতটাই বেড়ে গেছে যে আপনি আর কোনো সত্য বিশ্বাস করতে রাজি না।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বাস করেন, যখন একটা মানুষ আস্তে আস্তে দূরে যাওয়ার পথ খোঁজে, আপনি তখন ধীরে ধীরে তার ভালোবাসায় আরও বেশি জড়িয়ে যান। এখন আপনার ভালোবাসাটা ক্রমেই ওপরের দিকে। নিজেকে দিন দিন তার কাছে হারিয়ে ফেলেন অথচ আপনার মানুষটি তখন ধীরে ধীরে বের হতে থাকে। আস্তে আস্তে আপনি তার মন থেকে, আবেগ থেকে সরতে থাকেন। যে মানুষটা আগে আপনার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারত না, এখন সে এসব কোনো গল্প শুনেও বেশ চুপ থাকে। তার মানে এখন আর তার খারাপ লাগে না, কারণ তার মনে আপনি আর আগের মতো নন।

ছোট ছোট অভিমান, অপেক্ষা, ভালোবাসা সব মিলিয়ে আপনার অভিযোগের পাহাড় এলে তার কারণ আপনি জানতে গেলেই বিপত্তি। তখন অজুহাত আর রেগে যাওয়া। তারপর একদিন সব ছেড়ে মানুষটি একেবারে নাই হয়ে যায়। হ্যাঁ, আপনার প্রিয় মানুষটি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। ফেসবুকে থাকে, মেসেঞ্জারে অ্যাকটিভ না–ও থাকে অথচ আপনার পৃথিবীতে সে আর থাকে না। আপনার মেসেজের রিপ্লাই দূরে থাক, সে আর সিনও করে না। এভাবেই একটা তুমুল প্রেম আস্তে আস্তে নিঃশেষ হয়ে যায়। একটা মানুষের কাছে আপনি ছিলেন তার আবেগ আর আপনার কাছে সে ছিল ভীষণ রকম ভালো লাগা আর ভালোবাসা। আপনি তাই মেনে নিতে পারেন না।

নিজেকে কষ্ট দেন, ঘুমাতে পারেন না, সারা দিন অস্থির থাকেন, কারণে–অকারণে কান্না করেন। অথচ বিপরীত মানুষটি স্বাভাবিক, যেন কিচ্ছু হয়নি। কোনোকালে কিছু হয়নি।কখনো কখনো আপনি ডিপ্রেশনে চলে যান, গভীর ভালোবাসায় অনেকে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে। কেউ কেউ ফেরানোর বৃথা চেষ্টা করে। কিন্তু আদতে যারা যায়, তারা হুট করে যায় না, আস্তে আস্তে সবকিছু ভেবে, আবেগ নিঃশেষ হয়ে গেলে চলে যায়। আপনার কাছে তার কিছু আর অবশিষ্ট নাই বলেই তার আর ফেরার প্রশ্ন আসে না। এই সত্য আপনাকে মানতে হবে। ধীরে ধীরে নিজেকে তার মতো করে তুলতে হবে।

হয়তো পারবেন কিংবা পারবেন না। তবে আর যা–ই করেন কারও জন্য নিজেকে নিঃশেষ করবেন না। জগতে প্রেম–ভালোবাসা, ভালো লাগা এসব আসে–যায়, তবে একমাত্র মৃত্যু আর হারিয়ে যাওয়াটাই সত্য। বাদবাকি কেবল বেঁচে থাকার নিমিত্তে সৃষ্টির এক খেলা। সে খেলায় কেউ হেরে যায়, আর কেউ কেউ জিতে যায়।

জীবনানন্দের একটা কবিতার অংশ দিয়ে শেষ করি...
চোখ দুটো ঘুমে ভরে,
ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে!
ফুরিয়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন,- স্বপন ক’দিন রয়!
এসেছে গোধূলি গোলাপি বরণ,-এ তবু গোধূলি নয়!
সারাটি রাত্রি তারাটির সঙ্গে তারাটিরই কথা হয়,
আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের’পরে!

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন