চীনের শিক্ষাব্যবস্থা–৩

চীনে বিদেশিদের জন্য উচ্চশিক্ষা এবং শিক্ষকতার সুযোগ

বিজ্ঞাপন
default-image

বর্তমান বিশ্বের বিস্ময় গণচীন। কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক কিংবা সামরিক—সব দিকেই পৃথিবীর প্রথম সারিতে চীনের অবাধ বিচরণ। যে চীন কে নিয়ে এত কথা, এত আগ্রহ, তাদের শিক্ষাব্যবস্থা আসলে কেমন? ধারাবাহিক লেখার প্রথম পর্বে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাস্তর পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। পরের পর্বে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তৃতীয় পর্বে থাকছে চীনে বিদেশিদের জন্য উচ্চশিক্ষা এবং শিক্ষকতা পেশার সুযোগ নিয়ে। লেখাটি তাঁদের জন্য, যাঁরা চীনের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে জানতে আগ্রহী। চীনের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন? আমাদের সঙ্গে তাদের মূলত কী কী পার্থক্য রয়েছে?

ধন্যবাদ যাঁরা প্রথম দুটি পর্ব পড়েছেন।

চীনে উচ্চশিক্ষা
বর্তমানে চীনে পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই ছাত্রছাত্রী পড়তে আসেন। সংখ্যাটা নেহাত কম নয়, এমনকি দিনে দিনে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে আবেদন বেড়েই চলেছে। আপাতত চীনে ছয় লাখের বেশি বিদেশি ছাত্রছাত্রী আছেন। এটা পৃথিবীতে তৃতীয়। যুক্তরাষ্ট্র (১১ লাখ) এবং যুক্তরাজ্যের (৬ দশমিক ৫ লাখ) পরেই চীন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ও চীনের আবেদন কম নয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য হারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, একটি চীনা ভাষা শেখা আরেকটি হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করা। সেগুলো হতে পারে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, কলা, চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ অন্য যেকোনো বিষয়। সাধারণত চীনা ভাষা শেখার জন্য এক বছর থেকে দুই বছরের স্কলারশিপ (সিএসসি, প্রভিনশিয়াল, ইউনিভার্সিটি) দেওয়া হয়ে থাকে এবং নিজ খরচেও পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে। টিউশন ফি প্রতি সেমিস্টারে ৭০০০-১০০০ ডলার। আর অন্যান্য বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স, পিএইচডি, পোস্টডক্টরাল করার সুযোগ আছে। তাদের অধিকাংশই ইংরেজি ভার্সন। তবে বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটিতে অনার্স চায়নিজ ভার্সনে হয়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এক বছর চায়নিজ ভাষা শিখে পরে অনার্স শুরু করতে হয়।

এখন আসি পড়াশোনার মান নিয়ে। আগের পর্বেই বলেছি, চীনের অনেক ইউনিভার্সিটিই বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে রয়েছে, তাহলে মানের কথা আসছে কেন? আসছে এ কারণে যে চীনে আসলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের এবং চীনা শিক্ষার্থীদের কারিকুলাম এক নয়। চীনা শিক্ষার্থীরা পড়েন চায়নিজ ভাষায় আর বিদেশিরা পড়েন ইংরেজি ভাষায়। দেখা যায়, একজন খুব ভালো শিক্ষকও শুধু ভাষার দক্ষতার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সমান জিনিস শেখাতে পারেন না। আবার যেখানে দেখা যায়, চীনা শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো মানের জার্নালে পাবলিকেশন আবশ্যক, সেখানে বিদেশিদের জন্য অনেকটা ছাড় দেওয়া হয়। কোর্স ডিজাইনের ক্ষেত্রে ও বিদেশিদের জন্য কিছুটা কম করে করা হয়। সে জন্য দেখা যায়, একজন চায়নিজ শিক্ষার্থী যে পরিমাণ জ্ঞান, মেধা-মনন, শিক্ষা নিয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়, একই ইউনিভার্সিটির একজন বিদেশি শিক্ষার্থী সমান জ্ঞান লাভ করতে পারেন না। অবশ্যই কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে, কিন্তু সেটা যে খুব বেশি, তা নয়। আজকাল একটা কথা খুব শোনা যায় চীনে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের নিয়ে। আসলে মেডিকেলের ক্ষেত্রে উল্লিখিত সমস্যা ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা বিদ্যমান। যেমন ভাষাগত সমস্যা। চীন অনেক বড় দেশ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই অনেকগুলো আঞ্চলিক ভাষা বিদ্যমান। দেখা যায় একজন বিদেশি শিক্ষার্থী চায়নিজ (মান্দারিন) মোটামুটি পারলেও আঞ্চলিক ভাষায় দক্ষতা না থাকায় হসপিটালে গিয়ে রোগীর সঙ্গে ভাবের আদান–প্রদান করতে পারেন না। আবার দৈনন্দিন কথ্য ভাষায় দক্ষতা থাকা মানেও মেডিকেলের টার্মিনোলজির দক্ষতা প্রকাশ পায় না। বেশির ভাগ মেডিকেল শিক্ষার্থীর কথ্য ভাষায় জ্ঞান থাকলেও লিখিত ভাষায় খুব ভালো না হওয়ার দরুন ইন্টার্নের সময় খুব ভালো কিছু শেখা যায় না, যেহেতু হাসপাতালগুলোতে সবকিছু চায়নিজ লিখিত ভাষায়। এবার আসি বিজ্ঞান বা অন্যান্য গবেষণামূলক বিষয় নিয়ে। নিঃসন্দেহে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ থেকে চীনে গবেষণার সুযোগ, মান এবং প্রণোদনা অনেক বেশি। বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটির অনিন্দ্যসুন্দর লাইব্রেরিতে পড়াশোনার পরিবেশ, পর্যাপ্ত পরিমাণে বই, ম্যাগাজিন, বিভিন্ন নামকরা পেইড জার্নালে সাবস্ক্রিপশন করা রয়েছে। যে কেউ ইচ্ছা করলেই খুব সহজে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করে নিজের জীবন গড়ে নিতে পারেন।

চীনে শিক্ষকতা পেশা
বিদেশি শিক্ষকদের জন্য চীনে শিক্ষকতার অনেক সুযোগ রয়েছে। মোটা দাগে আমরা সেটাকে দুই ভাগ করতে পারি। ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষার শিক্ষক এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক। কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে প্রাক্‌-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ইংরেজি শিক্ষাসহ অন্যান্য ভাষাভাষীর শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। সাধারণত এসব শিক্ষক চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাঁদের চুক্তির মেয়াদ সাধারণত এক বছর। তাঁদের বেতন এক হাজার থেকে দেড় হাজার ডলারের মধ্যে হয়, সঙ্গে ফ্রি আবাসন। প্রতিটি সেমিস্টার চার থেকে পাঁচ মাসের হয় এবং তাঁরা প্রতি সপ্তাহে ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা ক্লাস নেন। সেমিস্টার শেষে শীতকালীন ছুটি এক মাসের মতো আর গ্রীষ্মকালীন ছুটি দেড় থেকে দুই মাসের হয়ে থাকে। ছুটির সময়ে বেতন পাওয়া যায় যদি পরবর্তী সেমিস্টারে চাকরি অব্যাহত থাকে।

অন্যদিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের সাধারণত কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে অথবা দুটি বিষয় নিয়ে শিক্ষকতা করেন। তাঁদের আবার দুটো ক্যাটাগরি আছে—একটি স্বল্পমেয়াদি আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক বিদেশি শিক্ষকেরা সাধারণত সপ্তাহে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা শিক্ষকতা করেন। এক. দুই বছর মেয়াদি, তাঁদের বেতনও ১০০০ থেকে ২০০০ ডলারের মধ্যে। গবেষণার জন্য তাঁদের তেমন চাপ থাকে না। কিছু কিছু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতেও বাংলাদেশি পাকিস্তানিসহ কিছু কিছু বিদেশি চুক্তিভিত্তিক শিক্ষককে দেখা যায়। তাঁরা সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ অন্যান্য বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে থাকেন।

সর্বশেষ হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিকালীন বিদেশি ফ্যাকাল্টি বা গবেষক। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের চীনা শিক্ষকদের সঙ্গেও তুলনা করা যায়। তাঁরা শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণাও করে থাকেন। বিশ্বের নামীদামি শিক্ষকদের আকর্ষণীয় প্যাকেজ অফার করে চীন সরকার তাঁদের নিয়ে আসে এবং তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন থাকে না। তাঁদের বেসিক বেতন ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে, (একেকজনের যোগ্যতা অনুসারে) এর পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ–সুবিধা বিদ্যমান। ফ্রি আবাসনের পাশাপাশি তাঁরা গবেষণা ফান্ডও পেতে পারেন এমনকি সেটা ১ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এ গবেষকেরা সপ্তাহে ৪ থেকে ৮ ঘণ্টা শিক্ষকতা করে থাকেন। যোগ্যতা অনুসারে তাঁদের বিভিন্ন পদবি থাকে (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, প্রফেসর ইত্যাদি)। বাংলাদেশি শিক্ষকদের জন্য (অন্যান্য পেশারও) চীনা সরকার প্রথম তিন বছর করমুক্ত বেতন ঘোষণা করেছে। সহজেই কোনো বাংলাদেশি পেশাজীবী এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।

পরিশেষে বলা যায়, শুধু চীনে নয়, যোগ্যতা দিয়ে সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশিরা সাফল্যের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। সেটার জন্য শুধু প্রয়োজন পর্যাপ্ত ইচ্ছাশক্তি আর অনুসন্ধিৎসু চোখ–কান খোলা রেখে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা।


* লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গুয়াংডং ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, চীন

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন