default-image

তারিখটি ছিল সম্ভবত ১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল (স্মৃতি থেকে টেনে নিয়ে লেখা)। রাতে বাড়ির সবাই গ্রামের লোকদের নিয়ে রেডিওতে নিত্যদিনের মতো সংবাদ শুনছিলেন। এমন সময় রেডিওতে ঘোষণা শুনতে পান সবাই, দেশের বিজয় অর্জন করার কথা। ঘোষণাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সবাই এমনভাবে আনন্দ করছিলেন যে দুই হাত ওপরে তুলে নাচতে শুরু করেছেন। চিৎকার–চেঁচামেচি করে এবাড়ি–ওবাড়ির সবাইকে ডেকে জানাচ্ছিলেন কেউ কেউ বিজয়ের কথা। এরপর আশপাশে আশ্রয় নেওয়া পরিচিত-আত্মীয়দের অনেকেই রাতের মধ্যে সেই বাড়ি এসে বাবার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন পরের দিন সবাই একসঙ্গে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা। যাঁরা সেই বিজয়ের আনন্দ দেখেননি, তাঁদের অনেকে দেশে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের ঘোষণায় ঢাকায় যে অবস্থা হয়েছিল, সেই দৃশ্য অন্তত দেখেছেন। সেটা দিয়ে কিছুটা হলেও অনুমান করতে পারবেন আশা করছি, কেমন ছিল আমাদের সেই দিনের আনন্দ-উল্লাস।

পরের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে শীতের মধ্যে লাল চা আর আটার রুটির নাশতা তৈরি করলেও সবাই সেটা খাননি, না খেয়ে আনন্দে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। বড়দের অনেকের মাথায় ছিল বিভিন্ন কাঁথা-বালিশের গাঁটরিবোঁচকা, সিলভারের হাঁড়িপাতিল, নিজেদের কাপড়-লতা। বাড়ি ফিরে আসার পথে রাস্তায় বাবার অনেক পরিচিত-অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এদের সবাই যে ভালো মানুষ ছিল বা তাদের অভিসন্ধিও যে ভালো ছিল না, সেই কথা বাবা মারা যাওয়ার আগেও তাদের সঙ্গে গল্প করে শুনেছি। সেদিন আমরা যেভাবে বাড়ি ফিরেছি, সেই দৃশ্য আমি মনে করেছি রোহিঙ্গাদের তাদের নিজেদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার দৃশ্য দেখে। যদিও আমাদের সঙ্গে তাদের আসার উদ্দেশ্য ভিন্ন, তবুও দৃশ্যের সামঞ্জস্যের কথা বলছি।

দুপুরের আগে আমরা বাড়িতে এসে পৌঁছাই। বাড়ির কাছে এসে পুরো বাড়ি ফাঁকা দেখে অবাক হয়ে যাই সবাই। যদিও আসার আগেই জেনেছি, পুরো ঘরবাড়ি গান পাউডার দিয়ে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। তবুও সেই দৃশ্য অনুমান করা আর নিজের চোখে দেখার মধ্যে পার্থক্য ছিল, যে কারণে বাড়ির কাছে আসতেই সবার চোখ গিয়েছিল অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে। যখন বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালাম, তখন মাকে দেখলাম দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভিটায় ঝাঁপিয়ে পরে ঘর পোড়ার ধ্বংসাবশেষ হাতে নিয়ে উপুড় হয়ে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। সেদিনের সেই দৃশ্য চোখে না দেখলে কেউ অনুমান করে বোঝানোর ক্ষমতা রাখে বলে মনে করি না। আমিও সেই দিনের দৃশ্য এখনো লালন করছি মনের কোঠায়। দেশে এখনো যখন দেখি ছোটখাটো কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক ঘটনাকে ইস্যু করে কারও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়; সেই দৃশ্যের ছবি দেখে কল্পনা করি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাড়িতে ফিরে এসে পোড়া বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ জড়িয়ে ধরে মায়ের কান্নার সেই দৃশ্য। (এই দৃশ্যের কথা মনে করেই লিখেছি আমার সেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দ্বিতীয় উপন্যাস ‘পোড়া বাড়ি’)।

বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের বাড়ির ভিটায় একটি বাংকার খোঁড়া হয়েছিল। আমরা শত্রুদের হাত থেকে বাঁচতে সেই বাংকারে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করার জন্য সেই বাংকার আর কাজে লাগাইনি। পরে আমরা সবাই মিলে ঘর পোড়া সব ছাই নিয়ে ফেলেছি সেই বাংকারে।

সবাই সেদিন একসঙ্গে তড়িঘড়ি হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে একটি ঘরের ভিটা পরিষ্কার করেছিল। সেখানে ঘরের পোড়া টিন ঘরের মতো দুই দিকে দাঁড় করিয়ে রাত যাপনের জন্য ব্যবস্থা করা হয়। পরের দিন আস্তে–ধীরে নিজেদের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে, তা দিয়ে ওপরে এবং চারপাশে পোড়া টিন দিয়ে চাল ও বেড়া দিয়ে অস্থায়ী ছাপরা তৈরি করা হয়। কোনোরকম রাত কাটানোর ব্যবস্থা করার পর প্রতিদিন আস্তে–ধীরে অন্য ঘরের ভিটার ছাই পরিষ্কার করে আমাদের সুন্দর করে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানেই সম্ভবত তখনকার খাদ্যমন্ত্রী ফণিভূষণ মজুমদার গিয়ে বসেছিলেন।

বিষয়টি মনে করছি এ জন্য যে দেশের জন্য সেদিন বড় ভাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে এবং বাবা স্বাধীনতাযুদ্ধকে সমর্থন দেওয়ার কারণেই শুধু দাদার আমলের দেখার মতো কারুকার্যের সব ঘর পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।

আজকাল বিভিন্ন কারণে সেই সময়কার বিষয়গুলো যখন স্মৃতিচারো করি, তখন কষ্টই হয় মনে। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কিছু করার না থাকলেও ভাবি, ভাবতে যে হয়। এই দেশ স্বাধীন করতে যাঁদের ভূমিকা ছিল, তাঁরাই যেন হচ্ছে নিগৃহীত (কারও কারও ক্ষেত্রে তা যে প্রমাণিত)। চলবে...

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন