default-image

আমাদের অনেকের মধ্যে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আর সেটি হচ্ছে, কোনো ছেলে কী কোনো মেয়ের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে না? ঠিক একইভাবে যদি আমি বিপরীত দিক থেকে প্রশ্নটি করি, তাহলে বিষয়টি দাঁড়ায়, কোনো মেয়ে কী কোনো ছেলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে না?

সরল ভাষায় প্রশ্নটির উত্তর কোনোভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। এটি স্বীকার করতে হবে যে আমাদের সমাজব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেকটা রক্ষণশীল, ইউরোপ কিংবা আমেরিকা অথবা অস্ট্রেলিয়ার সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের কোনোভাবে উদার বলা যাবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য দেশের মানুষের মানসিকতায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে, তবে দেশে নারী ও পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য, সেটি আশানুরূপভাবে এখনো দূরীভূত হয়নি। বিপরীত লিঙ্গের দুজন মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্বকে এ দেশের অনেকে এখনো স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেন না।

তবে যদি বিষয়টি ইউরোপ কিংবা পাশ্চাত্য দেশগুলোর সমাজব্যবস্থার নিরিখে চিন্তা করি, তাহলে বিপরীত লিঙ্গের দুজন মানুষের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তেমন একটা অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এ জন্য যে পরস্পরকে কোনো ধরনের সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে হবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

ফেসবুকে ইরেনা প্রোসহিচ নামের এক তরুণীর পরিচয় হয় আমার। ইরেনা বর্তমানে মেসিডোনিয়ার অধিবাসী ও পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। একজন ছেলে একজন মেয়ের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে কি না, এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, অবশ্যই একজন ছেলে একজন মেয়ের সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে। এ জন্য যে তাদের মধ্যে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকতে হবে, সে বিষয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। জীবনে চলার ক্ষেত্রে যেকোনো সময় একে অন্যের কাছে আসতে পারে এবং এভাবে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে পারে।

ইরেনা বলেন, ‘এটা ঠিক যে মেসিডোনিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া কিংবা আলবেনিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান দেশগুলোতে এখনো নারী ও পুরুষের অধিকার সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আমাদের সমাজব্যবস্থায় এখনো বেশ কিছু জিনিস প্রচলিত রয়েছে, যা আপনি পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে কখনো খুঁজে পাবেন না। যেমন: আমাদের দেশে কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়েকে ডেটিংয়ের জন্য প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে কোনোও রেস্তোরাঁয় আমন্ত্রণ জানান, তাহলে এখানকার সমাজব্যবস্থা অনুযায়ী আপনাকে ওই মেয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এমনকি রেস্তোরাঁয় খাবার শেষে তাঁর বিলও আপনাকে পরিশোধ করতে হবে। পারিবারিক বিভিন্ন প্রথার ওপর আমরা এখনো আস্থাশীল। কেননা, আমাদের জীবনে অর্থোডক্স চার্চগুলোর প্রত্যক্ষ প্রভাব আজও জোরাল। তাই মেয়েদের বিয়ের আগে অভিভাবকেরা ছেলের সক্ষমতা যাচাই করেন।’

default-image

ইরেনার মতে, আমাদের সবার উচিত নারী-পুরুষনির্বিশেষে সমাজের সবাইকে সমানভাবে দেখার চেষ্টা করা এবং সবাইকে একই রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা। এ প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, মানুষকে মূল্যায়ন করা উচিত তাঁর মানবীয় গুণাবলি দ্বারা, তাঁর কর্মের দ্বারা। কে নারী কিংবা কে পুরুষ, বিষয়টি কোনোভাবে বিবেচনায় আনা উচিত নয়। আপনার সঙ্গে যদি কারও মতের মিল হয়, তাহলে অবশ্যই আপনারা একে-অন্যের কাছাকাছি আসতে পারেন। নিজেদের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করতে পারেন, মনের মধ্যকার না বলা কোনো কথা নিয়েও পরস্পরের মধ্যে আলোচনা করতে পারেন। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে পারেন, আড্ডা দিতে পারেন এবং যেকোনো প্রয়োজনে বন্ধুত্বের দায়িত্ববোধ থেকেই একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারেন।’

বিজ্ঞাপন

ইরেনার এ বক্তব্যের সঙ্গে অনেকটা একমত পোষণ করেছেন নেদারল্যান্ডসের অধিবাসী রবিন কালইয়াও। তিনি বলেন, ‘যেকোনো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হচ্ছে আপনারা একে অন্যের মতামতের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল। কে নারী কিংবা কে পুরুষ, এ বিষয় বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কখনো বিবেচনায় আনা উচিত নয়। একজন মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে স্বাভাবিকভাবে সবার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করুন, পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরুন। নিজেদের মধ্যকার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করেন।’

রবিনের মতে, যেকোনো কিছুকে দেখতে একটি জিনিসের প্রয়োজন, আর সেটি হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি। রবিন বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের অবস্থান থেকে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। এভাবে যদি আমরা সামষ্টিকভাবে কাজ করতে পারি, তাহলে একদিন আমরা আমাদের স্বপ্নের পৃথিবী সৃষ্টি করতে পারব, যেখানে কোনো ধরনের বিভেদ, বৈষম্য কিংবা অপরাধ থাকবে না।’
ভিক্টোরিয়া স্কুইলার একজন ব্রাজিলিয়ান নাগরিক, যিনি সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে ‘জেন্ডার ইনিকুয়ালিটি ইন লাতিন আমেরিকান কান্ট্রিজ’ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর অধীনে পিএইচডি করছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীর এ যুগেও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য বিদ্যমান। আমরা যদি আমাদের চিন্তাধারার পরিবর্তন করতে পারি, তাহলে অনেকাংশে এ বৈষম্য হ্রাস করা সম্ভব।’

default-image

রবিন ও ইরেনার মতো তিনিও মনে করেন, নারীকে নারী এবং পুরুষকে পুরুষ হিসেবে বিবেচনা না করে সবাইকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের প্রতিও তিনি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, পৃথিবীর অনেক দেশে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সহশিক্ষার বিষয়টি অনেক রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় এখনো সেভাবে গৃহীত হয় নি। আমি মনে করি, উন্নয়নশীল দেশগুলো সহশিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতে পারে। সহশিক্ষার ফলে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই একে অন্যের কাছে আসার সুযোগ পাবে এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে।’ ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও তিনি সহশিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

মানুষের জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতার নাম বন্ধুত্ব। পারিবারিক কিংবা সামাজিক, যেকোনো সম্পর্ক কখনো বিকশিত লাভ করে না, যদি না এ সম্পর্কের মধ্যে ‘বন্ধুত্ব’ বিষয়টির উপস্থিতি না থাকে। ইংরেজি সাহিত্যের লেখক ভার্জিনিয়া উলফ বলেছিলেন, ‘কেউ কেউ পুরোহিতের কাছে যায়, কেউ কবিতার কাছে, আমি যাই বন্ধুর কাছে।’ বন্ধু ছাড়া লাইফ সত্যি কঠিন। তবে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত রক্ষণশীল। এ জন্য অনেক সময় দেখা যায়, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর ছেলেমেয়ের মধ্যকার স্বাভাবিক মেলামেশাকেও আমাদের মুরব্বিরা সেটিকে ভালো চোখে দেখেন না। এমনকি বিয়ের পরও যদি কোনো মেয়ে তাঁর কোনো ছেলে বন্ধু কিংবা অফিসের কোনো ছেলে সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে পরিবারের অন্য সদস্যরা সেটিকে ভালোভাবে দেখেন না। একইভাবে বিয়ের পর কোনো ছেলেও যদি তাঁর মেয়ে বন্ধু বা অফিসের কোনো মেয়ে সহকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, সেটিকেও পরিবারের সদস্যরা ভালোভাবে নেন না। এ ছাড়া সহশিক্ষার মতো বিষয়টিও এ দেশে এখনো সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এসব কারণে হয়তো একজন ছেলের সঙ্গে একজন মেয়ের বন্ধুত্ব এখনো সে রকম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি সমাজের সবার কাছে।

*লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন