default-image

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকাল প্রকাশনীর স্টলের সামনে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে কবির। আজ বইমেলার পনেরো দিন। মেলা ক্রমেই জমে উঠেছে। কবিরের পুরো নাম কবির হোসেন। বাড়ি টাঙ্গাইল। স্থানীয় কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে একটা বইয়ের লাইব্রেরিতে চাকরি করে। ছোটবেলায় বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর বিধবা মা সংসারের হাল ধরেছে। মা একটি সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক।

কবিরের প্রথম কবিতার বই এবারের মেলায় প্রকাশিত হয়েছে। এই নিয়ে তার আনন্দের সীমা নেই। মেলা উপলক্ষে ছুটি নিয়েছে। অবরোধ-হরতালের মধ্যেই প্রতিদিন সে খুব ভোরে উঠে নাশতা খেয়ে টাঙ্গাইল থেকে বাস ধরে দশটার মধ্যে বইমেলায় পৌঁছায়। তারপর বিকাল প্রকাশনীর স্টলের সামনে মেলা শেষ অবধি দাঁড়িয়ে থাকে।
বিকাল প্রকাশনীর কর্ণধার বেলাল আহমেদ যে একবারের অনুরোধে তার বই প্রকাশ করতে রাজী হয়েছে তা কিন্তু নয়। অনেক হাত কচলানো, ঘোরাঘুরি আর পুরো টাকা আগাম পরিশোধের পর অবশেষে মেলার পঞ্চম দিনে তার বই জানালা বইমেলায় এসেছে। আগের দিন কবির অধীর আগ্রহে নিউমার্কেটের বই বাঁধাইয়ের দোকানে বসে থেকেছে। বাচ্চা জন্মানোর পর পর মা যেমন স্বস্নেহে তাঁর সন্তানকে বুকে জড়িয়ে শরীরের গন্ধ নেন সে-ও ঠিক তেমনি পাগলের মতো সদ্য বাঁধানো বইটাকে দুহাতে ধরে গালে ঘষে পাতা উলটে গন্ধ শুঁকতে থাকে। দোকানের কর্মচারীরা কবিরের এই কাণ্ড দেখে তাজ্জব বনে যায়।
ওই দিনই সকালে স্টল খোলার পর কবির নিজের হাতে অতি যত্নে তার বই তাকে সাজিয়ে দিয়েছে। এই কদিনেই বেলাল আহমেদ কবিরের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত। সে কবিরের সকাল থেকে রাত অবধি স্টলের সামনে মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাকে একদম মেনে নিতে পারে না। এই নিয়ে সে কবিরকে বলেছে, ‘ছোট ভাই, সারা দিন বটগাছের মতো স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কী আছে? তোমার কোনো বই বিক্রি হলে অথবা কোনো পাঠক অটোগ্রাফ চাইলে আমি সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে মোবাইলে ফোন করে জানাব।’
এ কথা শোনার পর সে কিছুটা বিব্রত হলেও তার সারা দিন রাত দাঁড়িয়ে থাকার কোনো হেরফের হয় না। বরং বেলাল স্টলে না থাকলে দোকানের সামনে তার পায়চারীর মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একদিন একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে স্টলে এসে অন্য বইয়ের সঙ্গে তার বইটা যেইমাত্র হাতে তুলে নিয়েছে অমনি কবির তা দূর থেকে দেখতে পেয়ে কয়েক লাফে তার পেছনে এসে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে যে, ছেলেটা ভড়কে গিয়ে বইগুলো ফেলে পালিয়ে বেঁচেছে। তারপর কবিরেরও ধাতস্থ হতে বেশ সময় লেগেছে।
বেলা পড়তে না-পড়তেই নামকরা কবি সাহিত্যিকেরা বিকাল প্রকাশনীর স্টলে জড় হলে সেখানে দর্শকদের ভিড় আর জটলা তৈরি হয়। তারা ধূমায়িত চায়ের কাপকে একপাশে সরিয়ে নিজেদের লেখা বইয়ে পাঠকদের জন্য বিরামহীনভাবে অটোগ্রাফ দিতে থাকে। কবির দূরে দাঁড়িয়ে আবছাভাবে কল্পনায় তাকেও অন্য প্রথম সারির লেখকদের মধ্যে দেখতে পায়। তাই সে সব সময় স্টলের খুব কাছাকাছি থাকে যেন পাঠকেরা তার বই হাতে তুলে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়েই তাকে দেখতে পায় আর অটোগ্রাফের জন্য আবদার করতে পারে।
কবিরের নিজের কোনো টাকা-পয়সা নেই। তার মা ছেলের আগ্রহ দেখে প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা ধার করে ছেলের কবিতার বই প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। প্রতিদিন বাসায় ফিরলেই মা খাবার প্লেটে তুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, ‘ছোট্ট কবি, আজ মেলায় কয়টা বইতে অটোগ্রাফ দিলি?’
সে মাথা নিচু করে থাকে। মা তখন বলে, ‘এই তো কেবল মাত্র বইমেলা শুরু হয়েছে। কয়েকটা দিন যেতে দে, তারপর দেখিস ছোট্ট কবিকে ঘিরে কেমন হইচই পড়ে যায়।’ বলতে বলতে মা তার কবিতার বইয়ের থেকে কয়েকটা লাইন পড়ে শোনায়।
কবির মার গলায় তার কবিতা শুনে অভিভূত হয়ে পড়ে। মাঝে এক দিন সে বই মেলায় যেতে পারেনি। ওই দিন তার চোখ ও কান ছিল মোবাইলের দিকে। এই বুঝি বইমেলা থেকে ফোন এল। কেউ হয়তো বই কিনে তাকে অটোগ্রাফ দেওয়ার জন্য খুঁজছে আর নাছোড়বান্দার মতো স্টলে দাঁড়িয়ে আছে। শেষে সন্ধ্যার পর সে প্রবল আগ্রহ নিয়ে বেলাল ভাইকে ফোন করল। অনেক পরে ফোন ধরে বেলাল বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আরে ছোট ভাই, এত অস্থির হইলে চলে। কবিতা লিখে বই ছাপালেই তো আর কবি হওয়া যায় না। তারপর খট করে লাইনটা কেটে দেয়।’
ইদানীং তার হাঁটার মধ্যেও কবিদের মতো কেমন যেন একটু দুলুনির ভাব চলে এসেছে। তা ছাড়া বই প্রকাশের পর থেকে তার কাঁধে সব সময় একটা কাপড়ের ব্যাগ ঝোলানো থাকে। তাতে কয়েকটা নতুন বই আর একটা দামি কলম রাখা আছে। বলা তো যায় না, কখন অটোগ্রাফশিকারিরা তাকে ঘিরে ধরে। এর মধ্যে অবশ্য সে মেলায় আসা কয়েকজন নামীদামি লেখককে তার কবিতার বই উপহার দিয়েছে। মনে প্রবল আশা ছিল বইটি হাতে নিয়ে তারা হয়তো বলবে, বাহ, তোমার বইয়ের প্রচ্ছদটা তো খুব সুন্দর হয়েছে। তারপর তার সামনেই পাতা উলটে পুরো একটি কবিতা পড়ে ফেলে বলবে, এই যে কবি সাহেব, তোমার একটা অটোগ্রাফ আর মোবাইল নম্বর লিখে দেও। বইটার বাকিটা শেষ করেই তোমাকে কল দেব। বাস্তবে তারা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভদ্রতা বজায় রাখতে শুধু তার হাত থেকে বইটা নিয়ে সামনের টেবিলে রেখে দেয়।
আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। বিকেলে লোকে লোকারণ্য। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। দেখা গেল মধ্যবয়সী বোরকা পরা একদল মহিলা বিকাল প্রকাশনীর স্টলের সামনে ভিড় করছে। কবির দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ করল তাদের প্রায় সব কজনেই তার বই হাতে নিয়ে পাতা ওলটাচ্ছে। কবির দুরু দুরু বুকে তাদের দিকে এগিয়ে যেতেই তারা সবাই তাকে ঘিরে ধরল অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। স্টলে বসা লেখকদের কয়েকজন অবাক বিস্ময়ে নিজেদের অজান্তেই কবিরের বই হাতে তুলে নেয়।
একজন মহিলা বোরকার নেকাব সরিয়ে কবিরের বই থেকে আবৃ​ত্তি করে চলেছে: বাহান্নতে বাবাকে হারিয়ে/ ব্যথা ভুলে শোককে জড়িয়ে/ প্রত্যয়ে বুক বেঁধেছি/ মায়ের ভাষায় কথা বলেছি৷ একাত্তরে ভাইকে খুঁজে ফিরে/ কোথাও দেখা না পেয়ে/ দুঃখ অশ্রু আড়াল করেছি/ স্বাধীন দেশের পতাকা ধরেছি৷ নব্বইতে ছেলের লাশের মিছিলে/ কাঁধে বয়ে নিয়ে সান্ত্বনা খুঁজেছি/ তার শেষ বিন্দু রক্ত বুঝি/ স্বৈরাচারের পতন এঁকেছে৷
কবির এতক্ষণে তার মাকে চিনতে পারে। মা সদলবলে তার বান্ধবীদের নিয়ে বই মেলায় হাজির হয়েছে। ততক্ষণে স্টলের সামনে অনেক দর্শকের ভিড় জমে গেছে। কবির লজ্জিত ভঙ্গিতে প্রথম তার মাকে অটোগ্রাফ দিয়ে অন্যদের দিকে এগিয়ে যায়।

(নাইম আবদুল্লাহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিপ্রবাসী লেখক-সাংবাদিক)

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন