বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জিওর্জির সঙ্গে আমার প্রথম গন্তব্য ছিল ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ক। বাটুমির মূল শহর থেকে ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব ২৫ মাইলের কাছাকাছি। ছোট-বড় বিভিন্ন আয়তনের পাহাড়, হ্রদ ও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে প্রবাহিত হওয়া নদ-নদী ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ককে অপার্থিব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উত্তরাধিকারী করেছে। পার্কের প্রবেশমুখে একটি ভাস্কর্য দেখতে পেলাম, এ ভাস্কর্যটিকে বাহ্যিক দিক থেকে সে অর্থে বিশেষ বলার সুযোগ নেই। জিওর্জি জানালেন, জর্জিয়ানদের স্বাধীনতাসংগ্রামকে স্মরণ করতে এ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ক দক্ষিণ বরাবর তুরস্কের সীমানার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। গ্রীষ্মকালে অনেক পর্যটক স্কুটি চালিয়ে এ পার্কের রাস্তা ধরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অভিযানে বের হন। সময় স্বল্পতার দরুন পুরো পার্কটিকে ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি, কেবল মাখুন্টসেটি ও মিরভেটি এ দুটি ওয়াটারফল দর্শনের মধ্য দিয়ে ম্যাচাখেলার অধ্যায়ের ইতি টানতে হয়েছে। মাখুন্টসেটি ওয়াটারফল থেকে কয়েক গজ দূরে স্খালটা নদীর ওপর পাথরের তৈরি আর্কশেপের ছোট একটি সেতু রয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীর মতে, এ সেতুর বয়স ৯০০ বছরের ওপরে।

ওয়াইন ও মধু উৎপাদনে জর্জিয়া বেশ প্রসিদ্ধ। জর্জিয়ার ওয়াইন শিল্প কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। অনেকে বলে থাকেন সমগ্র পৃথিবীতে জর্জিয়া প্রথম দিককার ওয়াইন উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি। ওক ব্যারেলের পরিবর্তে জর্জিয়া সম্পূর্ণ নিজস্ব ফর্মুলায় ওয়াইন প্রস্তুত করে। একইভাবে জর্জিয়াতে মধু উৎপাদনের ইতিহাসও বেশ প্রাচীন এবং কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ক ঘুরতে এসে পাশাপাশি স্বচক্ষে জর্জিয়ার ওয়াইন শিল্প এবং এখানকার মধু উৎপাদনের দীর্ঘদিনের ইতিহাস সম্পর্কেও জানার সুযোগ হলো। পার্ককে বেষ্টন করে থাকা গ্রামগুলোর অর্থনীতিও এ দুইয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

default-image

ম্যাচাখেলা ন্যাশনাল পার্ক পরিদর্শন শেষে আমরা গোনিও ফোরট্রেসের দিকে ছুটে গেলাম। জর্জিয়াসহ গোটা ককেশাস অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের যে কয়েকটি নিদর্শন রয়েছে, তার মধ্যে গোনিও ফারট্রেস অন্যতম। রোমান সম্রাট নিরোর শাসনামলে এ ফোরট্রেসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথম দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা গোসলের কাজে এ স্থানটি ব্যবহার করতেন, এ জন্য এ ফোরট্রেসের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের পুল তৈরি করা হয়েছিল। তবে ফোরট্রেসের ভেতরে সবচেয়ে প্রাচীন যে প্রকোষ্ঠ রয়েছে, সেটি শস্য সংরক্ষণ করার কাজে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিরক্ষার কাজে এ ফোরট্রেসকে ব্যবহার করা হতো। ফোরট্রেসের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে পাঁচ জর্জিয়ান লারি দিয়ে টিকিট কিনতে হয়।

default-image

বর্ডার ক্রসিং পয়েন্ট সারপি
গোনিও ফোরট্রেস থেকে কৃষ্ণসাগরের তীর ঘেঁষে দক্ষিণে কয়েক মাইল এগোলে বিশাল এক দেয়ালের মতো চেকপোস্টের দেখা মিলবে। জর্জিয়ার সীমানা সেখানে শেষ। চেকপোস্টের ওপাশ থেকে তুরস্কের পতাকা উড়ছে। স্থানীয় অধিবাসীরা এ বর্ডার ক্রসিং পয়েন্টকে সারপি নামে অভিহিত করেন। তুরস্কের সীমানার দিকে চোখ পড়তেই দেখা পেলাম অটোমান স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত ছোট-বড় বিভিন্ন আয়তনের মসজিদ। জনবসতির হারও সীমান্তের ওপারে বেশি। অন্যদিকে জর্জিয়ার অংশের তুলনায় তুরস্কের অংশকে আমার কাছে দূর থেকে অধিক পর্বতময় মনে হয়েছে। কৃষ্ণসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে এ চেকপোস্টের সামনে থেকে তুরস্ক ও জর্জিয়া—এ দুই দেশের পতাকাকে এক ফ্রেমে রেখে ছবি তোলার চেষ্টা করলাম। তুরস্ক ও জর্জিয়া এ দুই দেশের মধ্যে স্থলপথে পণ্যের আদান-প্রদান পরিচালিত হয় সারপির এ বর্ডার ক্রসিংকে ঘিরে।

default-image

আয়তনে জর্জিয়া খুব বড় কোনো দেশ না হলেও দেশটির অভ্যন্তরে যে কয়েকটি স্থান আমার ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে, তার আলোকে জর্জিয়াকে আমার বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ মনে হয়েছে। জর্জিয়ার প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নিজস্ব সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস রয়েছে। তা ছাড়া দেশটিতে অঞ্চলভেদে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেও ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তাই বাটুমি ভ্রমণের পর আপনার মধ্যে যে ধরনের অনুভূতির সৃষ্টি হবে, ওই একই অনুভূতি আপনি রাজধানী তিবিলিসি কিংবা তৃতীয় বৃহত্তম নগরী কুতাইসির ক্ষেত্রে পাবেন না। ঐতিহাসিকভাবে বাটুমি আচারা নামক এক ভূখণ্ডের অন্তর্গত। আচারা বর্তমানে জর্জিয়ার অন্যতম স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ এবং বাটুমি এ প্রদেশের রাজধানী।

বাটুমির যাঁরা স্থানীয় অধিবাসী, তাঁরা নিজেদের আচারিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন। বাটুমিতে আসার আগে অনেকে আমাকে আচারিয়ান খাচাপুরির স্বাদ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। খাচাপুরি জর্জিয়ার একটি ঐতিহ্যবাহী খাবার। পিৎজার সঙ্গে খাচাপুরির কিছুটা সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, এ কারণে অনেকে খাচাপুরিকে জর্জিয়ান পিৎজা হিসেবেও আখ্যা দেন। অবশ্য পিৎজার মতো খাচাপুরিতে কোনো ধরনের টপিং ব্যবহার করা হয় না। ময়দার তৈরি খামিরের ওপর বিভিন্ন ধরনের পনির স্থাপন করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে একে ওভেনে বেক করা হয়, অথবা চুলায় সেঁকা হয়। এভাবে তৈরি হয় খাচাপুরি। জিওর্জিকে বললাম, দুপুরের খাবারে আমি আচারিয়ান খাচাপুরি ট্রাই করতে চাই। আমার কথা শুনে তিনি আমাকে বাটুমির সিটি সেন্টারের কাছে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। চলবে...


* লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন