বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুপুরের খাবার শেষে জর্জিও আমাকে বাটুমির বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে গেলেন। এমনিতে চিড়িয়াখানা কিংবা বোটানিক্যাল গার্ডেনের মতো স্থানগুলো আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করে না। তবে বাটুমির বোটানিক্যাল গার্ডেন সচরাচর অন্যান্য বোটানিক্যাল গার্ডেনের তুলনায় একেবারে আলাদা। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে প্রবেশ করতে হলে আলাদাভাবে ১৫ জর্জিয়ান লারি দিয়ে টিকিট ক্রয় করতে হয়। পুরো বোটানিক্যাল গার্ডেনটিকে ভালোভাবে ঘুরে দেখতে হলে এক দিন সময়ের প্রয়োজন। এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া—এই ছয়টি মহাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের গাছগাছালি ও লতাপাতা নিয়ে সাজানো হয়েছে বাটুমির বোটানিক্যাল গার্ডেন। এ ছাড়া এ গার্ডেনের ভেতর বেশ কিছু বৃক্ষ রয়েছে, যেগুলো জর্জিয়ার এনডেমিক উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতর প্রতিটি মহাদেশের নামে আলাদা আলাদা সেকশন রয়েছে এবং এ সেকশনগুলোতে সেই গাছগাছালি ও লতাপাতাকে রাখা হয়েছে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট মহাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিটি বৃক্ষের গায়ে বৈজ্ঞানিক নাম ও সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। শীতের আগমনে চারপাশের প্রকৃতি রুক্ষ হয়ে উঠলেও বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতর বেড়ে ওঠা গাছগাছালি ও লতাপাতাগুলো নিজেদের সজীবতাকে ধরে রাখার জন্য বুক চিতিয়ে লড়াই করে যেতে দেখলাম। কিছুটা সময়ের জন্য বিমর্ষ হয়ে পড়লাম, গ্রীষ্মকালে এখানে বেড়াতে এলে নয়নাভিরাম সবুজের স্নিগ্ধতাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেতাম। সেই সঙ্গে রংবেরঙের বিভিন্ন ধরনের ফুলের সুবাসে মনটাও ভরে উঠত।

বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে এক অসাধারণ রূপে কৃষ্ণসাগরকে দেখা যায়। সাগরের তীর ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে রেললাইন। প্রতিদিন এ রেললাইনের ওপর দিয়ে ডিপিডিসি থেকে বাটুমি কিংবা বাটুমি থেকে বিবিসিতে ট্রেন চলাচল করে। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ওপর থেকে এ দৃশ্য দেখা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেনের অবস্থান বেশ উঁচুতে। তাই এ উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে কৃষ্ণসাগরের কালচে নীলাভ জলরাশির সৌন্দর্যের স্বাদ নিতে অসাধারণ লাগে। ব্যাকরণের কোনো উপমা ব্যবহার করে এ অনুভূতিকে প্রকাশ করা যায় না।

default-image

বোটানিক্যাল গার্ডেন পরিদর্শন শেষে আমরা চলে এলাম বাটুমি বুলেভার্ডে। একে দূর থেকে দেখে দুবাই মনে করে অনেকে ভুল করে বসতে পারেন। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন দালানকোঠা এ স্থানকে চাকচিক্যময় করে তুলেছে। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে একটু স্বস্তির নিশ্বাস পেতে বাটুমিবাসী এখানে আসেন। সাগরের পানে তাকিয়ে প্রশান্তি লাভের চেষ্টা করেন। সূর্যাস্তের আগমুহূর্তে সাগরের তীর ধরে হাঁটার মধ্য দিয়ে আলাদা একধরনের পরিতৃপ্তি পাওয়া যায়।

default-image

বাটুমিতে বেড়াতে আসার পর একটা বিষয় ভেবে আমার বেশ আফসোস লাগছিল, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের মালিক বাংলাদেশ। প্রায় ৯৩ মাইল দীর্ঘ এ সমুদ্রসৈকতের বেশির ভাগ অংশ বালি দ্বারা পরিপূর্ণ। অথচ বাটুমির সমুদ্রসৈকতগুলোর বেশির ভাগ পাথুরে, বালির অংশ অনেকটা কম। ছোট ছোট নুড়িপাথরের জন্য অনেক সময় হাঁটতে কষ্ট হয়ে যায়, কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের তুলনায় বাটুমির সৈকত বেশ সংকীর্ণ। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতকে ঘিরে যথার্থ পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। আশা করি, একদিন কক্সবাজারও বিদেশি পর্যটকদের সমাগমে মুখর হবে।

শুরুতেই উল্লেখ করেছি, জর্জিয়ার একমাত্র সমুদ্রবন্দর বাটুমিতে। জর্জিয়ার জলসীমার ওপর দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজ কিংবা নৌযানের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে বাটুমি বুলেভার্ডে লাইটহাউস স্থাপন করা হয়েছে। লাইটহাউসের পাশে নাগরদোলার দেখা পেলাম। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে যুগলদের অনেকের কাছে এ নাগরদোলা বিশেষ আকর্ষণের বস্তু। নাগরদোলার ওপর থেকে পুরো বাটুমি শহরকে দেখা যায়।

বাটুমিতে বেড়াতে আসবেন অথচ আলী অ্যান্ড নিনো স্ট্যাচুর সামনে ছবি তুলবেন না, তা কি হয়! গুগলে আপনি বাটুমি লিখে সার্চ করলে সবার আগে এই আলী অ্যান্ড নিনো স্ট্যাচুর ছবি দেখতে পারবেন। আইফেল টাওয়ার যেভাবে প্যারিসকে বিশ্বের বুকে প্রতিনিধিত্ব করে, ঠিক একইভাবে আধুনিক সময়ে বাটুমি ও আলী অ্যান্ড নিনো স্ট্যাচু একে অন্যের সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। লাইলি-মজনুর মতো আলী-নিনো প্রেমকাহিনিনির্ভর লোকগাথা। ককেশাস অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যকার বন্ধনের গাঢ়ত্বকে ফুটিয়ে তুলতে উপমা হিসেবে আলী ও নিনোকে ব্যবহার করেন। আলী ও নিনোর প্রেমকাহিনির ওপর ভিত্তি করে উপন্যাসও রচিত হয়েছে।

default-image

আলী ছিল আজারবাইজানের রাজধানী বাকুর সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এক যুবক, অন্যদিকে নিনো ছিল জর্জিয়ার রাজকুমারী। জর্জিয়ার সাধারণ মানুষ বেশ ধর্মভীরু, দেশটির সমাজব্যবস্থা ও রাজনীতিতে তাই অর্থোডক্স চার্চের প্রভাব অত্যন্ত জোরালো। আলী ও নিনো দুজন ছিল দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। এ জন্য তাদের মধ্যকার ভালোবাসাকে সমাজ ভালোভাবে নেয়নি। তারপরও সমাজের সব বাধাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আলী ও নিনো একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হওয়ার প্রয়াস নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাদের এ মিলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আলী প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারায়। লোকগাথায় উল্লেখিত আলী ও নিনোর মধ্যকার ভালোবাসার প্রতি সম্মান জানাতে বাটুমি বুলেভার্ডে এ স্ট্যাচু স্থাপন করা হয়। জর্জিয়ান ভাস্কর তামারা কেভিসিতাজে এ স্ট্যাচুর কারিগর। বুলেভার্ডের একপাশে এবং আলী অ্যান্ড নিনো স্ট্যাচুর ঠিক সামনে সাগরের একেবারে গা ঘেঁষে ঘাটে বাঁধা অবস্থায় সারি সারি ইয়ট ও জাহাজ দেখতে পেলাম। কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিল, ইয়টে করে সাগরে ভেসে দূরদূরান্তে অভিযানে বেরিয়ে পড়ি। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার আকাঙ্ক্ষা কিছুটা সময়ের জন্য মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিল। সাগরের পাড়ে কয়েকটি সুভেনিয়র শপও ছিল।

default-image

অর্থোডক্স খ্রিষ্টানিটির পর জর্জিয়ায় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করেন। দেশটির সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জর্জিয়ায় মোট জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। সমগ্র জর্জিয়ার মধ্যে আচারিয়া প্রদেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাটুমিতে অবস্থিত একমাত্র জামে মসজিদটিকে দেখার জন্যও অনেক দর্শনার্থী জড়ো হন। ১৮৮৬ সালে আসলান বেগ কিমশিয়াসভিলি নামের এক ধনাঢ্য জর্জিয়ান মুসলিম ব্যবসায়ী নিজস্ব অর্থায়নে এ মসজিদ নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাটুমিতে নতুন করে মসজিদ স্থাপনের দাবি উঠেছে, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় এখনো এ দাবি আলোর মুখ দেখেনি। বাটুমির সিটি সেন্টারের খুব কাছে এ মসজিদের অবস্থান, আশপাশের অট্টালিকার ভিড়ে কেবল সুউচ্চ মিনারের কল্যাণে এ মসজিদকে শনাক্ত করা যায়। বাটুমির গল্পটা শেষ হলো ঠিক এখানে এসে।

default-image

এটা ঠিক যে জর্জিয়ার প্রতি আমার অনুভূতি অনেকটা বন্ধুর। পুরো ছয় দিনের সফরে আমাকে বেশ কিছু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যেগুলো কোনোভাবে আকাঙ্ক্ষিত ছিল না। তবে বাটুমি আমার অন্তরে বিশেষভাবে ভালোবাসার জাগরণ ঘটিয়েছে, আর এ ভালোবাসা মূলত কৃষ্ণসাগরকে ঘিরে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সখ্য নিত্যদিনের আর সেই সখ্য হয় যদি সাগরের মতো কোনো একটি নৈসর্গিক উপাদানের সঙ্গে, তাহলে তো কথাই নেই। কৃষ্ণসাগরের প্রতি এ ভালোবাসা থেকে একদিন আবারও বাটুমির বুকে ফিরে যেতে চাই, নভোগর্ডের রাজকুমার জ্যাঙ্কোর মতো আমারও এ সাগরকে ভালোবেসে গান শোনাতে ইচ্ছা করে।


*লেখক: রাকিব হাসান রাফি, শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব নোভা গোরিছা, স্লোভেনিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন