বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৭২তম এ প্রতিযোগিতায় একজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে সবার মুখে চর্চা যেন একটু বেশি। নাম তাহমিদ আহমেদ। দুবছর আগে, বাংলাদেশ থেকে আসা এই কিশোর, এরই মধ্যে জন্ম দিয়েছে এক নতুন বিস্ময়ের। জাপানের নামীদামি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীদের হারিয়ে সে অর্জন করেছে ‘সাইতামা জুনিয়র হাইস্কুল ইংলিশ স্পিচ কনটেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ’, যাকে নিয়ে বিশেষ ফিচার স্টোরি করেছে জাপানের দৈনিক ইয়োমিউরি শিম্বুন।

default-image

সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। প্রতিটি কলেজের মনোনীত শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক বক্তৃতা দিচ্ছে। একেক প্রতিযোগীর বক্তব্য শেষে করতালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্বজনেরা। উৎসবের উষ্ণতা থাকলেও আবহাওয়া ছিল বেশ ঠান্ডা। তবু তাহমিদের কপালে দেখা দেয় স্বেদ সফেদ জলকণা। দুশ্চিন্তার প্রথম কারণ, সেই একমাত্র শিক্ষার্থী, যার অভিভাবকেরা আজ এখানে আসেননি। আসলে ‘আসেননি’ ঠিক নয়, কথাটি হবে ‘আসতে পারেননি’। একে তো মা অসুস্থ, তার ওপর এক বছর বয়সী তাসরিফের দেখাশোনা। সব মিলিয়ে খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মা শিউলী আক্তারের সেদিন উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে পেশাগত ব্যস্ততার কারণে বাবা মনোয়ার আহমেদও পারেননি গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে সন্তানের পাশে থেকে সাহস জোগাতে। এরই মধ্যে ঢাকায় থাকা নানি, দাদু, চাচ্চুসহ সবার কাছে দোয়া চেয়ে নেয় সে। পাশে না থাকলেও প্রিয়জনদের দোয়া তাকে ছায়া হয়ে অনুসরণ করে, বাবার এই কথা সে মন দিয়ে বিশ্বাস করে।

default-image

দুশ্চিন্তার দ্বিতীয় কারণের নাম মিসাতো খিতা হাইস্কুল। শিক্ষক থেকে সহপাঠী, সবার প্রত্যাশা—এবার চ্যাম্পিয়ন হবে তাহমিদ। কিন্তু তাঁরা জানেন না, আম্মুর সাম্প্রতিক অসুস্থতার কারণে বড় ভাই হিসেবে ওকেই পরিবারের অনেক কাজ সামলাতে হয়েছে। ছোট দুই ভাই ও বোনের দেখাশোনা, গোসল, খাবারদাবার ও ঝগড়া মেটাতে কেটেছে লম্বা সময়। ফলে অজান্তেই কমেছে পড়াশোনা ও প্রস্তুতি। অন্যদিকে এবারের প্রতিযোগিতায় মেধাবী বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে, যাদের নাকি হারানো সম্ভব নয়।

অন্য বক্তার বক্তব্য শেষে একসময় মাইকে নিজের নাম শুনতে পায় তাহমিদ। মাথা উঁচু করে ডায়াসে গিয়ে দাঁড়ায় তাহমিদ। শুরু করে বক্তৃতা, যার শিরোনাম ‘আই অ্যাম হাংরি’। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির এই প্রাক্তন শিক্ষার্থী, তার বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সে জানায়, শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে, কোন সুযোগগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এবং কী করলে তারা আরও বেশি এগিয়ে যেতে পারবে, সেই পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নও তুলে ধরে ১৭ বছরের এই শিক্ষার্থী। চারদিকে তখন পিনপতন নীরবতা। ১৫ মিনিটের বক্তব্য শেষে শুরু হয় তুমুল করতালি।

default-image

পরীক্ষা এমন এক মুদ্রা, যার দুই পিঠেই দুশ্চিন্তা থাকে। শুরুর আগে এক রকম এবং শেষ হলে ফলাফলের জন্য আরেক রকম। আগেরটার চেয়ে পরেরটা মনে হয় একটু বেশি। এবার ফলাফল ঘোষণার পালা। তাহমিদ আহমেদের কপালে আবার বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে। বিচারকদের ভোট গণনা শেষে মাইকে আয়োজকদের ঘোষণা, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন অ্যান্ড দ্য ডিয়ারেস্ট স্টুডেন্টস, সাইতামা ইংলিশ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন প্রাউডলি প্রেজেন্টস দ্য ফার্স্ট প্লেস টু আহমেদ তাহমিদ ফর হিজ আউটস্ট্যান্ডিং স্পিচ এনটাইটেল্ড ‘আই এম হাংরি’।

কিছুক্ষণ আগে ঘাবড়ে যাওয়া কিশোর তখন আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। তুমুল করতালির মধ্যে দৃপ্ত পায়ে সে এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। তবে তার নামের সঙ্গে যখন লাল–সবুজের ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উচ্চারিত হয়, তখন তার ভীষণ আনন্দ হয়, অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে আম্মু–আব্বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু চাইলে কী হবে, তাঁরা যে কাছে নেই! কিছুটা অতৃপ্তি নিয়ে বিজয়ের ট্রফি হাতে তুলে নেয় তাহমিদ।
তাহমিদ আহমেদ বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আমার সাফল্যের পেছনে রয়েছে আমার মা–বাবা ও শিক্ষকদের ঘাম ও শ্রম। তাই তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন আমার লক্ষ্য। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। আর জন্মভূমি স্বর্গের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাই বড় হয়ে দেশের জন্য কাজ করাই আমার স্বপ্ন। বিশেষ করে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে এখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই।’

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন