বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি জার্মানির সর্ব উত্তরের শহরে কিলে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জমজমাট একটা ফুটবল ম্যাচ। বাংলাদেশি কমিউনিটির দল ‘হামবুর্গ এডলার্স এফ সি’ এবং ‘কিল-বে অব বেঙ্গল’। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে জাতীয় সংগীতের সুর আমাদের প্রশান্তি দেয়।

default-image

তবে স্বদেশ থেকে প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার দূরে জার্মানির মাটিতে যখন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’, এ সুর বেজে ওঠে, তখন যে ভালো লাগার সৃষ্টি হয়, সেটি লিখে প্রকাশ করার মতো শব্দ নেই, সেটি কেবল অনুভব করতে হয়। সেই অনুভূতি গায়ে মেখে দুই দলের ফুটবলাররা খেলতে শুরু করেন। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ৩-১ গোলে হামবুর্গ জয় পায়। তবে জয়–পরাজয়ের ঊর্ধ্বে ছিল হামবুর্গ ও কিলের বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রীড়াপ্রেমীদের উৎফুল্লতা। কারণ, পড়াশোনা ও কাজের চাপে পিষ্ট থাকার পর কিছু সময় খেলাধুলা আর সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্ত সব সময় আসে না।

ইউরোপে প্রসিদ্ধ শহর এবং জার্মানির প্রধান বন্দরনগরী হামবুর্গ থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে বাল্টিক সির তীরের ছোট্ট শহর কিল। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সমুদ্রবেষ্টিত শহরটিকে অনেক প্রবাসী তুলনা করেন বাংলার রানিখ্যাত চট্টগ্রামের সঙ্গে। এ শহরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শতাধিক বাংলাদেশি পড়াশোনা করেন। আছেন অনেক পেশাজীবী। ১৬৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত ১২ জন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাই উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার জন্য প্রসিদ্ধ শহরটি বাংলাদেশিদের অনেকের পছন্দের শহর। পড়াশোনার পাশাপাশি বিনোদনের জন্য নিয়মিত ফুটবল ও ক্রিকেট খেলেন বাংলাদেশিরা। তবে সাম্প্রতিক কালে করোনার লকডাউনে বাড়তি সময় পাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফুটবল আয়োজন শুরু করে এখানকার ফুটবলপ্রেমীরা।

default-image

গত ১১ জুলাই সারা পৃথিবীর ফুটবল–ফ্যানদের চোখ যখন কোপা আমেরিকার ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ এবং ইউরোর ফাইনালের ইতালি-ইংল্যান্ড ম্যাচে তখন কিল শহরের বাংলাদেশিদের চোখ ছিল আরও একটি ফাইনালে। কারণ, একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় কিল শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয়োজিত প্রথম ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল। টুর্নামেন্টে তিনটি দল অংশ নেয়। জাঁকজমকপূর্ণ এ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয় ‘কিল ভাইপার’ এবং রানার্সআপ হয় ‘কিল মেভাররিক্স’। টুর্নামেন্টের অন্য দলটি ছিল ‘লে লুপ দি কিল।’

চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড় রাকিব ফাইনাল খেলার পর বলেন, ‘আসলে আমার চ্যাম্পিয়নশিপ দরকার ছিল না, দেশের বাইরে পড়তে এসে জার্মানিতে এত সুন্দর পরিবেশে স্বদেশিদের সঙ্গে খেলাধুলা করতে পারাটাই বিশাল ব্যাপার।’ রাকিব কিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। একই বিভাগের অপর শিক্ষার্থী মিথুন এবং ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সের শিক্ষার্থী সাঈদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ও বেশি টিম নিয়ে আয়োজন হবে কিলে বাংলাদেশিদের এমন টুর্নামেন্ট। শুধু নিজেদের মধ্যে ম্যাচেই সীমাবদ্ধ নয় এ শহরের ফুটবল উন্মাদনা। ১০ সেপ্টেম্বর এই শহরেই অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতের ম্যাচ। বেশ দাপটের সঙ্গে ভারতকে ৩-০ গোলে হারান প্রবাসী বাংলাদেশিরা। দলের পক্ষে জোড়া গোল করেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রাজীব।

default-image

শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ নয় এখানকার ক্রীড়া উৎসব। যে ক্রিকেটের সঙ্গে বাঙালির আবেগ জড়িয়ে আছে, সে ক্রিকেটও আয়োজিত হয় নিয়মিত। সম্প্রতি শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। লথেস কিল, ক্রিকেটখোর কিল এবং ইয়োনকোস ডি কিল নামের তিনটি দল এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে, যেখানে ইয়োনকোস ডি কিল চ্যাম্পিয়ন হয়। এ ছাড়া কিলের বাংলাদেশিরা অংশ নেন আন্তদেশীয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টে, যেখানে আরও অংশগ্রহণ করেন ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ক্রিকেটাররা।

default-image

ঠিক এভাবেই উচ্চশিক্ষা আর ক্যারিয়ারের স্বপ্নে শিকড় থেকে দূরে আসা প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুঁজে নিচ্ছে নতুন শিকড়। কেবল বিনোদন আর কমিউনিটির বন্ধন দৃঢ় করা নয়, আয়োজকদের প্রত্যাশা, ক্রীড়ার মাধ্যমেও লাল–সবুজের পরিচিতি হতে পারে সারা বিশ্বে। তারা আরও মনে করেন হয়তো আজ নয়, আগামী বছর নয়, তবে দুই বছর কিংবা পাঁচ বছর পর হলেও এই ক্রীড়াচর্চা থেকে উঠে আসতে পারে ইউরোপ ফুটবলে বড় কোনো তারকা বা ফুটবল সংগঠক। হয়তো দেশের খেলাধুলাতেও থাকতে পারে তাদের কারও নাম।

লেখক: রবিউল এইচ চোধুরী, অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট, ইউরো ফিনস, হামবুর্গ, জার্মানি

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন