default-image

সময়টা ছিল ২০০৮। আমার স্টুডেন্ট লাইফের শেষের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় নামক ইনকিউবেটরের জীবন শেষ করে প্র্যাকটিক্যাল লাইফের জীবন শুরুর প্রথম দিকটা। চাকরি খুঁজছি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদিন ফোন পেলাম। আমার চাকরির আবেদনের প্রেক্ষিতে তারা আমার একটি ভাইভা নিতে চায়। আমাকে জিজ্ঞাসা করল, কখন ফ্রি আছি? সময়টা আমি পরে জানাতে চাইলে ফোনদাতা আমাকে তার পরিচয় দিলেন। তিনি তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বরটি দিয়ে সময় করে যোগাযোগ করতে বললেন। পরিচয় থেকে জানতে পারি তিনি একজন শিক্ষক ও তার পদবি অধ্যাপক।

পরদিন ইন্টারভিউ দেওয়ার সময়টা জানাতে তার দেওয়া নম্বরে কল দিই। কল দিতেই তার ফোনের ওয়েলকাম টিউনের গানটি শুনে আমি যারপরনাই হতভম্ব হয়ে যাই। তার ওয়েলকাম টিউনের গানটি ছিল গায়ক হাবিবের গান—‘ভালোবাসব...বাসব রে’। এমন টিন-এজদের হিপ হপ সং একজন অধ্যাপকের মোবাইল ফোনের ওয়েলকাম টিউন…! আমি শুধু হতভম্বই নয়, কেন যেন মেনেও নিতে পারছিলাম না। অ্যাপয়েন্টমেন্টের টাইম ঠিক করলেও সেখানে ভাইভা দিতে যাব না ঠিক করলাম। কিন্তু ভাইয়ার পীড়াপীড়ি ও অধ্যাপককে দেখার কৌতূহল মেটাবার ইচ্ছায় নির্ধারিত সময়ে অফিসে গিয়ে দেখা করলাম বটে, তবে সেখানে জয়েন করলাম না।

দুই.
চাকরি করার পাশাপাশি হায়ার স্টাডিজ অপরচুনিটির খোঁজে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে মেইল করতাম। একদিন একটা বড় রিপ্লাই পেলাম অস্ট্রেলিয়ার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসপেক্টিভ সুপারভাইজারের কাছ থেকে। পদবিতে তিনি অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও আমার সিভি দেখে তিনি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আনন্দিত আমি তার রিসার্চ সম্পর্কে আরও খোঁজ নিতে শুরু করলাম। অনলাইন ঘেঁটে তার একটা ব্যক্তিগত সাইট পেলাম। সাইটটা খুলেই তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। সাইটের হোমপেজের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তার একটা ছবি, ছবিটা এমন যে সেখানে তিনি তার নাকটা ডান হাত দিয়ে বিকটভাবে উঁচু করে ধরে আছেন, আর ক্যাপশনে লিখে রেখেছেন, This is how I look like. হতভম্ব আমি...তার মেসেজের প্রতি-উত্তর দিলাম না। তবে সেই চেহারাটা মনে গেঁথে গেল।

তিন.
সময় গড়িয়ে যায়। ২০০৮ থেকে ২০১৭। আমার চারপাশটা যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, হয়েছি আমিও। স্টুডেন্ট লাইফে যে রাজনীতি অসম্ভব অপছন্দ করতাম, সময়ের প্রয়োজনে সেই রাজনীতিতে নিজেকে কিছুটা জড়িত করেছি, বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে, বাংলাদেশে ভালো কিছু করতে হলে, রাজনীতি বুঝতে হবে, এটা একটা সহজ সূত্র। একটা সময়ে নিজের ভেতরে এই রাজনীতির অবর্তমানে নিজের অনেক প্রাপ্য বুঝে পাইনি, ঠকিয়েছে অনেকেই। তাই পূর্ণতা পেতে আরও জড়িয়ে পড়েছি। ধীরে ধীরে চিন্তার একটা জগৎ জুড়ে বসে গেছে ধর্ম আর রাজনীতি। এগুলোর আন প্রডাকটিভ রূপ দেখে ভেতরে বিদ্রোহ জন্ম নিয়েছে। মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়েও ভাবনার জগতের অনেকটাই দখল করে নিয়েছিল এই ধর্ম আর রাজনীতি।
পিউরিটান সব সময়েই ছিল। কিন্তু তারপরেও সূক্ষ্মভাবে এডালটারেটেড হয়েছি। এই সময়টার ভেতরে আমার অনেক পরিবর্তন হয়েছে আমি বুঝতে পারি। ধর্ম, রাজনীতি আর দর্শন এগুলো অনেকটা এলোমেলোভাবে কখনো কখনো রুক্ষভাবে আমার ভেতরে প্রবেশ করেছে। চোখ বন্ধ করলে আমি আমার পরিবর্তনগুলো দেখি, ফেসবুক স্ক্রল করলে অস্থিরতার চিত্র দেখতে পাই।
আমি অবাক হই।
কিন্তু জীবন কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সময় যেমন অতীত হয়, বোধও তেমনি হয় অতীত, ব্যাকডেটেড। এই ফেলে যাওয়া বোধ থেকে যে নস্টালজিয়া তৈরি হয়, তা বোধ হয় একধরনের ফিলোসফি।
আমার ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে স্বার্থের টানে আমি বিচলিত হই, কিন্তু সংস্পর্শগুলো যখন দেখি আমি অবাক হই। সত্যকে এড়ানো যায় না, পাশ কাটানো যায় না। সত্যকে স্বীকার করে নিতে হয়। আমি স্বীকার করে নিই। কিন্তু সত্য কি, কীভাবেই বা তা সত্য, তা আমি বুঝি না।

চার.
সুদূর এই অস্ট্রেলিয়ায় এখন আমার ডিপার্টমেন্টের হেডকে দেখি হাফপ্যান্ট পরে একটা বাইক চালিয়ে অফিসে আসেন। গুড ডে ফিদা, ডেভিডের সঙ্গে দেখা হলেই সম্ভাষণ জানান।
অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট মিসেস এলাইনি কোনো কারণে অফিসে গেলেই বলে ওঠেন, হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ টুডে, হানি?
ওরিয়েন্টেশন উইকে ভার্সিটির সামনে ফ্রি বিয়ার, ওয়াইন বিতরণ করা হয় নবাগত স্টুডেন্টদের মাঝে। বছরে খুব ঘটা করে একটা পার্টি হয়, নাম টোগা পার্টি। টোগা পার্টির ইতিহাস অন্যরকম হলেও পার্টিটা মূলত অপজিট জেন্ডারের মধ্যে ফ্রেন্ডশিপের জন্য ব্যবহৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ।
হাফপ্যান্ট পরে স্কুল প্রধানের অফিসে আসা কিংবা হানি বলে সম্বোধন করাটা ইতস্তত করে না আমায়। এ রকম পরিবেশে থেকে আমি এখন অভ্যস্ত হয়েছি নাক উঁচু করে ধরা সেই ছবিটির বিষয়ে। আমি বুঝতে পারি, এটা একটা সাবলীলতা যা এদের কালচারের সঙ্গে মানানসই।
আমার প্রফেসরের সঙ্গে যখন ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আড্ডা হয়, মাঝে মাঝে বলি আমি আমাদের কথা, বাংলাদেশে আমাদের শিক্ষকতার ধরন। বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা রাজনীতি করেন, আবার সেই সূত্রে দেশের রাষ্ট্রপতি হন। শুনে তিনি অবাক হন, বোধকরি মজাও পান। (তবে বারাক ওবামাও যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন সেই উদাহরণ টেনে তাকে কিছুটা নিবৃত্ত করি।)
তবে, বুঝতে পারি এরা অন্যরকম জীবনযাপন করে আর খুব সন্তর্পণে ধর্ম আর রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে চলে। তাই এই বিষয়ে কথোপকথন বেশি দূর এগোয় না।
বাংলাদেশ থেকে আসার সময় ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের একটা প্রিয় গান আমার ফোনের ওয়েলকাম টিউনে ছিল। সেটার ভাবাবেগ কিংবা প্রেজেন্টেশন হয়তো হাবিবের সেই গানটির মতো ছিল না। তবে, আজ বুঝতে পারি আমিও কিন্তু পরিবর্তিত হয়েছিলাম। এভাবে ক্রমে ক্রমে আমরা সবাই বোধ হয় বিভিন্ন রঙ্গে রঞ্জিত হই, আর আপন রংটি হারিয়ে যায় তাদের মাঝে।
মাঝে মাঝে নির্জনতায় আবদ্ধ হয়ে নিজেকে একা করে জীবনের গভীরতম বোধকে আমি অনুভব করতে চেষ্টা করি। বিশাল আকাশের নিচে জোছনার অপূর্ব রূপ আমি দেখি কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতা, কিন্তু কেন যেন গভীরে তা আজ আমি অনুভব করতে পারি না। নিদ্রাহীন দীর্ঘ রজনী আমি অপেক্ষা করি, কোনো দিন কি পারব সেই বোধকে স্পর্শ করতে। অবোধ নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি, যা ঘটছে তাই বাস্তবতা আর ভাগ্যে যা আছে তা হবেই।
As the Holy Quran says,
Every man’s fate,
we have fastened
on his own neck. (-Sura bani israil.)
আমরা কি করব না করব সবই পূর্ব নির্ধারিত, তাই মাঝে মাঝে মনে হয় কি হবে চিন্তা করে? মেনে নিয়ে অভ্যস্ত হওয়াই যেন জীবনের উদ্দেশ্য। একদা দুর্বিনীত ভেবে যা বাধা দিয়েছিলাম তা আজ আমার জীবনের অংশ, এটাই ছিল অবধারিত নিয়তি। তাই নিয়তির হাতে সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে অপেক্ষা করাই ভালো।
আমি অপেক্ষা করি।

ফিদা হাসান: গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন