বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পুরোনো সময়ের চেনা কারও ফোন এলে, সেটি তখন আর কেবল ফোনালাপ থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে টাইম মেশিনে ভ্রমণ, স্মৃতির অলিগলি ধরে হাঁটাহাঁটি।

মনে পড়ে, দিনাজপুরে বাড়ি ছিল দিনার আহমেদের। আমরা ডাকতাম, দিনাজপুরের দিনার ভাই। ছোটখাটো মানুষ, ছিমছাম জীবন। বেশ গুছিয়ে কথা বলতেন। খুশি হলে শরীর দুলিয়ে হাসতেন। রাগ করলে সেটি চেহারায় লুকানোর উপায় জানতেন না।
দিনাজপুরের সেই দিনার ভাই, যিনি এককালে কেবল কথা দিয়ে আশপাশকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন, আজ তিনি মাত্র দু–তিনটি বাক্য বলে হাঁপিয়ে ওঠেন। গলা যেন ভেঙে আসে তাঁর। কাতর স্বরে বলেন, `প্লিজ, একবার আমার সঙ্গে দেখা করেন। জরুরি দরকার।'
বাংলাদেশে চিকিৎসক শেষ জবাব দেওয়ার পর স্বজনেরা রোগীকে আর হাসপাতালে রাখতে চান না। বাড়িতে নিয়ে যান। যেন জীবনের শেষ সময় চেনা বাড়ির চেনা পরিবেশে কাটাতে পারেন। যেন তাকে মমতায় ঘিরে রাখে চেনা চেনা প্রিয় মুখ। যেন তাকে ছায়া দেয় তার নিজ হাতে লাগানো সেই চেনা গাছ। এ সময় রোগীকে সাধ্যমতো ভালো খাবার খেতে দেওয়া হয়। পরিবারের সবচেয়ে দূরে থাকা মানুষটিও কাছে থাকার চেষ্টা করেন। এসব কিছু করা হয় জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির অন্তিম সময়কে যতটা সম্ভব স্বস্তিময় করে তুলতে;‌ সব ছেড়েছুড়ে চলে যাওয়ার মতো কঠিন নিষ্ঠুর ব্যাপারটিকে সহনীয় করে তুলতে।

বাংলাদেশে যে প্রচেষ্টা করা হয় ঘরের ভেতরে, বিলেত–আমেরিকায় সেই ব্যাপার ঘটে হসপিসে।

সচরাচর যাঁদের জীবনের আয়ু বড়জোর ৬ থেকে ১২ মাস, বেঁচে থাকার আশা খুবই ক্ষীণ, যাঁরা আক্ষরিক অর্থেই চিকিৎসার ঊর্ধ্বে, কেবল তাঁদের জন্য খোলা থাকে হসপিসের দরজা।

হসপিসে যে যান, তিনি আর ফিরে আসেন না।‌ হসপিস মানে জীবনের শেষ ওয়েটিং রুম, যেখানে মানুষ মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে।
হসপিসে হাসপাতালের মতো রোগনির্ণয়ের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা নেই। রোগীকে সারিয়ে তোলার, বাঁচিয়ে রাখার তোড়জোড় নেই। সুস্থতার, সবলতার আশাও নেই।

হসপিস মেডিকেলের এমন শাখা, যেখানে শান্ত–সৌম্যভাবে কেবল মৃত্যুর জন্যই অপেক্ষা করা হয়‌। ধরা যাক, একজন ক্যানসার রোগীকে হসপিসে পাঠানো হলো‌‌। তার মানে তাকে বাঁচিয়ে রাখার জাগতিক আয়োজন শেষ। তাঁর জন্য বন্ধ কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপির দীর্ঘ ক্লান্তিকর প্রক্রিয়া‌। এখন থেকে তার মৃত্যুর পথকে আর দীর্ঘায়িত করা হবে না। খেতে পারলে খাবেন, না পারলে নেই। মুখে নল ঢুকিয়ে কৃত্রিম উপায়ে খাওনোর চেষ্টা করা হবে না। ভেন্টিলেটর, সার্জারি চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল হিসাব–নিকাশ হসপিসে নেই। এখানে হিসাব সোজাসাপটা।

রোগীর যদি ঘুম না আসে, হয়তো তাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হবে, যদি তার তীব্র ব্যথা থাকে, তবে ব্যথানাশক দেওয়া হবে। এতটুকুই। এর বেশি কিছু নয়।

হসপিস মৃত্যুকে দ্রুত করে তোলে না, বরং মৃত্যুর আগের সময়টুকুকে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক করার চেষ্টা করে, কষ্টকে যথাসাধ্য সহনীয়, কোমল করে তোলার চেষ্টা করে।

মৃত্যুর সঙ্গে স্রষ্টার সম্পর্ক গভীরতর। মৃত্যু নিশ্চিত জানলে মানুষ অধিক স্রষ্টামুখী হয়। এ কারণে হসপিসে যার যার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আধ্যাত্মিক সহায়তাও পাওয়া যায়।

পরম করুণাময়ের ডাকের অপেক্ষায় হসপিসের বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির কাছে এসে হাজির হন হয়তো গির্জার ফাদার, নয়তো মন্দিরের পুরোহিত অথবা মসজিদের ইমাম সাহেব। পাঠ করে শোনান পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। বলেন, মৃত্যু মানে পরম করুণাময়ের আরও নিকটবর্তী হওয়া, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে ঝরনাধারায় বহুমুখী প্রবাহ; যেখানে তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবেশ করবেন, আর সে স্থান থেকে কখনোই তাকে বিতাড়িত করা হবে না‌।

এভাবে সাহস জুগিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করা হয়। বস্তুত হসপিসে ভর্তি হওয়া মানুষের জীবনে মৃত্যু ছাড়া দ্বিতীয় কোনো গন্তব্য নেই, গত্যন্তরও নেই।

সেই হসপিস থেকে দিনাজপুরের দিনার ভাইয়ের ফোন পেয়ে আমি বিচলিত হই। তাঁকে দেখার আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়।
পূর্ব লন্ডনের মেয়ার স্ট্রিটের সেন্ট জোসেফ হসপিস আমার বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। এমনকি চাইলে দিনে সাতবারও যাওয়া–আসা করা যায়!

কিন্তু এখন সময়টাই দুঃসময়ের দখলে। করোনা মহামারি যাপিত জীবনের সব প্রয়োজন–যোগাযোগে নতুন নিয়ম যোগ করে দিয়েছে।
এমনিতে অবশ্য হসপিসে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতে বাঁধাধরা নিয়ম নেই। হসপিসের দরজা স্বজনের জন্য সব সময় খোলা। তবে এখন সে পরিস্থিতি নেই। কেবল দুজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যথানিয়ম অনুসরণ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেখা করতে পারবেন। সে অর্থে দিনার আহমেদের সঙ্গে আমার যোগাযোগের তেমন সুযোগ নেই। তবুও হসপিসের রিসেপশনে ফোন করি। রিসেপশনের মেয়েটি একটু অবাক হন। বলেন, ‘মিস্টার আহমেদের কোনো বন্ধু কিংবা স্বজন আছে বলে তো জানি না। তিন মাসে এক দিনও কেউ তাকে ফোন করেনি, দেখতে আসা তো বহুদূরের কথা।’

মেয়েটি সহজেই সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে হসপিসে দেখা করার নিয়মকানুন জানিয়ে দেন।

পরদিন জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো হসপিসে যাই। পরপারে যাত্রার অপেক্ষায় হসপিস নামের এই ওয়েটিং রুমের আর কোনো যাত্রীর সঙ্গে এদিন দেখা হয়নি। কেবল দেখা হয় আমাদের দিনাজপুরের দিনার ভাইয়ের সঙ্গে। দেখে তাঁকে চেনার উপায় নেই। যেন বাংলা ভাষার ‘অস্থিচর্মসার’ শব্দটির আক্ষরিক অনুবাদ। জীবনের সময় ফুরিয়ে এলে একে একে ছুটি নেয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো। জানতে পারি, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর সারা শরীরে। দ্রুত কমছে হাঁটার শক্তি, হাতের ভর, গলার আওয়াজ।

দিনাজপুরের দিনার ভাই তাঁর যৌবনকালে একদিন ইরান, তুরস্ক, ফ্রান্স হয়ে লরির পেছনে চেপে কার্লে সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। এ দেশে বৈধ অভিবাসী ছিলেন না তিনি। তাই সেই যে ২০-২২ বছর আগে এসেছিলেন, তারপর আর ফেরা হয়নি দেশে। মা–বাবার একমাত্র সন্তান। বাবা আর বেঁচে নেই, মা–ও মারা গেছেন দুই বছর আগে। এ দেশে তিনি বিয়ে করেছিলেন। বনিবনা হয়নি।

বছর তিনেক আগে এ দেশে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া সেই তুমুল একা মানুষটি এ মাটিতে স্থায়ী ঘুমের বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন।
তাঁর আর কোনো পিছুটান ছিল না, পিছুডাকও নয়। তবে কেন আমাকে ডেকে আনতেন তিনি, কিসের আশায়, কী প্রয়োজনে?

উত্তরের জন্য খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি। তিনি দ্রুত কথা শেষ করেন। বলেন, দিনাজপুরের লিচু খাইতে মন চায়। খাঁটি দিনাজপুরের খাঁটি মাটির লিচু, আনিয়ে দিতে পারবা?

বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ছেলেমানুষি আবদার। কিছু সময় নীরব থাকি। তাঁর কাছ থেকে সময় চেয়ে নেওয়ার মতো সময় কই! তবু বলি, লিচু আনিয়ে দিতে পারব, তবে কয়েক দিন লাগবে।
আমার আশ্বাসে প্রায় গর্তে ঢুকে পড়া চোখে কিছুটা হলেও যেন আশার ঝলক দেখি।

দিনার ভাইকে বলা হয়নি, দিনাজপুরের লিচু এখন আনা যাবে না কিছুতেই। করোনার কারণে দেশে আসা–যাওয়া প্রায় বন্ধ। কেউ যদি আসে, তাঁকে ১০ দিন থাকতে হয় হোটেল কোয়ারেন্টিনে (দুদিন আগে এ নিয়ম বদলে গেছে)‌। এমন দুঃসময়ে কে আনে লিচুর গোছা!

চাইলে বাজার থেকে লিচু কিনে নিয়ে বলতে পারি, এই নিন দিনাজপুরের লিচু। এমন প্রতারণায় কোনো দোষ নেই। আমি তা–ও করি না। দিনার ভাইকে কথা দিয়েছি, লিচু নিয়ে তাঁর কাছে যাব। তিনি অপেক্ষা করেননি। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দিনার ভাই না–ফেরার দেশে চলে যান। পূর্ব লন্ডনের হ্যানল্ড এলাকার গার্ডেন অব পিসে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

দেশ ছেড়ে আসার পর আর কখনো দিনাজপুরে ফেরা হয়নি দিনার ভাইয়ের। মৃত্যুর আগে দিনাজপুরের লিচুও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।
কিছু জীবন বড় বেশি অপূর্ণ থেকে যায়!

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন