default-image

প্রাচীন এক বাঙালি কবির হাতে মাত্র কয়েকটি ছত্রে পল্লবিত হয়ে উঠেছিল বসন্তের অন্তরস্থিত প্রকৃতি। তিনি বলেছিলেন, সখী হে, জাগো এবার। ধরায় বসন্ত এসেছে। আকাশের গায়ে গায়ে পলাশ ছড়িয়েছে তার রাঙা সূর্যের মতো জীবনের রং। কুসুমিত হয়েছে শ্যামল শোভন বনোভূমি। কোকিল গাইছে। আম্রমুকুল তার আকুলিত সৌগন্ধে চঞ্চল করে তুলছে ভ্রমর ভ্রমরীকে। প্রফুল্ল বসন্তকে দেহমনে এখনই তাই বরণ করে নেবার পুলকিত মুহূর্ত। অতএব সখী, এবার তুমি জাগো৷
বসন্ত বিশ্বজীবনজুড়ে তাই মহাজাগরণের পরম উৎসব। এই জাগরণ জগৎ চরাচরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া। হিল্লোলিত হয়ে ওঠা ধরিত্রী পৃথিবী ও সৌরসূর্যের অপরূপ সাম্যাবস্থার সৃষ্টিমুখর হারমোনিতে। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যে সাম্যাবস্থাকে বলা হয়েছে‘ভারন্যাল ইকুয়িনক্স’। এই অবস্থা অবশ্য পৃথিবীর উত্তর ও দ‌ক্ষিণ গোলার্ধে একই সময়ে উপস্থিত হয় না। উত্তর মেরুতে যখন বসন্তের জয়গান, দ‌ক্ষিণ মেরুর চরাচরজুড়ে তখন হেমন্ত ঋতুর পদচারণ। বসন্তের শুরুতে সময়ের দৈর্ঘ্য দিন-রাত্রিতে সমান সমান। এই ঋতুতে শীতের শীতলতা থাকে না। অথচ গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহও নেই। তাপমাত্রার অপরূপ ভারসাম্যে সৃষ্টি বিকাশের সব বাধা দূরীভূত হয় বলে সৃষ্টির আনন্দ লহরীতে মুখর হয়ে ওঠে ধরণি। কারণ, এই সময় নিজ অক্ষপুটে ২৩.৫ ডিগ্রি বাঁকা হয়ে বসে সূর্যকে প্রদ‌িক্ষণ করতে করতে জগৎপালিনী ধরিত্রী সৌরসূর্যের সংস্পর্শে তার উত্তর কিংবা দ‌ক্ষিণ মেরুতে একটি নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে সৃষ্টির মধুর খেলায় মাতে। বসন্ত ঋতুকে সৌন্দর্যের বিদগ্ধ স্রষ্টারা তাই ‘ঋতুরাজ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বলেছেন, বসন্ত বাকি সব ঋতুরই রাজা। কারণ বসন্ত প্রাণের রঙে রসে নিজে জাগে এবং জাগিয়ে তোলে জগৎকে। বসন্ত তাই ঋতুরাজ।
বসন্তের আবির্ভাব মানেই বাইরের দৃশ্যমানতায় জীবনের জয়গানে সৌন্দর্যের আরাধনা। পাখরা বাসা বাঁধছে মধুর কণ্ঠে গান গেয়ে। পশুদের রাজত্বে নব সৃষ্টির উদ্দীপনা জাগছে মহাসমারোহে। উদ্ভিদজগৎ পল্লবিত জীবনোচ্ছ্বাসের সন্তরে সন্তরে। ধরণি তার ধ্যানবন্দনা শেষে পরমানন্দের শিহরণকে প্রাণশক্তিরূপে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিশ্বপ্রকৃতির চেতনাজুড়ে। বসন্তের রং তাই জীবনদায়িনী পৃথিবীর সব শক্তির উৎসদাতা সৌরসূর্যের জীবনদীপের লালচে হলুদ রং। এই রং অনাদিকালের অন্তহীন প্রাণশক্তির অমিত তেজের প্রতীক। নিত্য প্রবাহিত প্রাণপ্রবাহের জীবনমন্থিত নির্যাস। বসন্তকে উদ্দেশ্য করে সৌন্দর্যের সাধক কবি রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছিলেন: হে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরণীর ধ্যানভরা ধন,/বৎসরের শেষে/শুধু একবার মর্তের মূর্তি ধর ভুবনমোহন/নববরবেশে।
বস‌ন্তের ভুবনমোহন নববরবেশ প্রাচীনকালেই চোখে পড়েছিল রূপসচেতন মননশীল মানুষের। একটি অপরূপ সাম্যাবস্থা বিরাজ করলেই যে জীবনমাধুরী রোজ রূপে রসে নতুন জীবনচৈতন্যে ভরে ওঠে, বসন্ত ঋতুর প্রকৃতিতে এই বস্তুনিষ্ঠ সত্যতাকে আবিষ্কার করেছিলেন তাঁরা। বহু দেশের বসন্ত উৎসবে এই মর্মবাণী রূপকে আর প্রতীকে প্রতিফলিত তাই। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই বসন্ত ঋতুর উৎসব সৃষ্টির পেছনে এমন সব গল্পকাহিনি রয়ে গেছে, যাদের কাহিনি বিস্তারের ভিন্নতা সত্ত্বেও উপসংহারের ফলাফল তাই একই মর্মবাণী শোনায় আমাদের। সেই মর্মবাণী হলো, সৌন্দর্যসাধনার ভেতর দিয়ে নবযৌবনে, নবায়নে, নবজন্মে, নতুন করে উত্থানে, নতুনভাবের আগমনে কিংবা নতুন রূপের আবর্তনেই জীবনের আবির্ভাব। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সভ্য সমাজের সংস্কৃতমান মানুষগোষ্ঠী জীবনমুখর বসন্তকে নিজস্ব ধ্যান-ধারণায় এভাবেই উৎসবের অঙ্গ করে তুলেছেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। অভিজ্ঞানের ফসল দিয়ে আনন্দিত পরশে সাজিয়েছেন বসন্তের পরমোৎসবকে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সভ্যতায় বসন্ত সে কারণে রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, বৈজ্ঞানিক, প্রাকৃতিক আর সামাজিক উৎসবের অঙ্গীভূত হয়ে গেছে।
চীন ও ভিয়েতনামের সংস্কৃতিতে বসন্ত ফেস্টিভ্যাল নতুন বছরের উৎসব পালনের মুহূর্ত। সংবছরের ক্যাল্লোর প্রস্তুতির শুভ সময়। এই দুই দেশেরই পৌরাণিক গল্পকাহিনিতে অনুষ্ঠান পালনে যে রূপকল্পের বিস্তার উৎসবজুড়ে রয়েছে, সেখানে রাক্ষস-ক্ষোকসের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বই প্রধান কথা। মনুষ্যত্বের বিজয়লাভে স্বস্তি আর আনন্দের মধ্যে নবজীবনকে অভিনন্দিত করার উপসংহার। বসন্ত উৎসব ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, টার্কি, আর্মেনিয়া, পাকিস্তান, উজবেকিস্তানসহ আরও অনেক দেশে ‘নওরুজ’ উৎসব নামে প্রতিপালিত। নওরুজ অবশ্য প্রাচীনকালে পারস্য অধিবাসী জরোয়াসট্রিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবেই পরিচিত ছিল বিশাল ভূখণ্ডজুড়ে। এখানেও চাইনিজ রূপকথারই খানিকটা অদল-বদল কাহিনির প্রতিধ্বনি। কাহিনিটি এ রকম-জিহক নামের এক অত্যাচারী রাজা নিয়মিত নির্মমভাবে দলন করতেন প্রজাসাধারণকে। তাই দেখে বিদ্রোহী হয়ে কেওয়া নামের একজন মানবহিতৈষী ব্যক্তি দুর্জন রাজার বিরুদ্ধে বীর হয়ে যুদ্ধে নামেন। যুদ্ধে রাজার সৈন্যসামন্ত পরাজিত হলে বিজয়ী কেওয়া জিহককে রাজসিংহাসন থেকে ছুড়ে ফেলে হাতুড়ি দিয়ে মাথা ভেঙে হত্যা করেন। অত্যাচারী রাজার মৃত্যু হলে সব ক্রীতদাস মুক্তি পান। অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হলে রাজ্যজুড়ে নেমে আসে নিশ্চিন্ত প্রশা‌িন্ত।

default-image

কোরিয়ায় বসন্ত উৎসব মানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রশা‌িন্ত আর প্রশস্তি। এ সময় নিভৃত পল্লির নিরালা কোণ থেকে আলোঝলমলে শহুরে সভ্যতা পর্যন্ত সর্বত্রই জেগে ওঠে নানা রঙের ফুলের সজ্জায় এক নান্দনিক মুখরতা। তখন গাছে গাছে পুষ্পিত হয়ে ওঠে ফুলের অতুলনীয় সৌন্দর্যরাশি। সবার গৃহ রাশি রাশি ফুলের অলংকারে ভূষিত হয় রুচিশীলভাবে। গোটা দেশজুড়ে নেমে আসে অঝোর ধারায় রূপের প্লাবন। যে প্লাবন অনুভবের জন্য প্রতিবছর ট্যুরিস্ট হিসেবে যোগদান করেন আন্তর্জাতিক বিশ্বের সহস্র সহস্র বিদগ্ধজন। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া অথবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এই ফুলের উৎসব পালিত হয়। কিন্তু তার মেজাজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই উৎসবের নাম ‘স্প্রিং কারনিভ্যাল’। বসন্তকালীন ফুলের উদ্দেশ্যেই এই উৎসব সম্পূর্ণ নিবেদিত। তারপরও স্প্রিং কারনিভ্যাল বিশেষভাবে সামাজিক আর সাংস্কৃতিক উৎসব। এখানে ফুলের উৎসব ঘিরে মুখরিত হয় ফ্যাশন শো, স্টাইল আর নানা রকম ফান করার প্রতিযোগিতা। জীবনের দায়দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি নিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যে কয়েকটা দিনের জন্য মুক্তি লাভের স্বীকৃতি।
ক্রিশ্চিয়ান জগতের বেশর ভাগ দেশে সুবিখ্যাত বাস‌ন্তিক উৎসব-‘ঈস্টার’। জীবনের অনির্বাণ উৎসধারার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ভক্তিনিবেদিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান এটি। ২২ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন দেশে ঈস্টার উদযাপিত হয়। এই উৎসব ঈশ্বরপুত্র যিশাসের মৃত্যু থেকে পুনর্জীবন লাভের অভিনন্দিত ইতিহাস। যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার দুদিন পরে তাঁর পুনরুত্থান এটাই প্রমাণ করে, জগতের সব অন্যায়, অত্যাচার আর বর্বরতার মধ্যেও সভ্য সংস্কৃতিমান মানুষ তাঁদের মননে চিন্তনে, প্রেমে ভালোবাসায় নতুন করে বেঁচে উঠে ফিরে যেতে চান নতুন জীবনের চেতনায়। মানুষের বোধ আর বোধির ক্ষেত্রে বারবার পৌঁছে দিতে চান শাশ্বতকালের জীবনরস। যে জীবনরস বিশ্বপ্রকৃতির সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে জাগরিত হয়ে ওঠে বসন্ত ঋতুতে। তাই চারুকলায় ও সংগীতে, সাহিত্যে কিংবা ভাস্কর্যে অনাদিকাল ধরে মানুষ কেবল ভাবের তরঙ্গে ভেসে থেকেই বাস‌ন্তিক বসন্তকে সমাদর জানায়নি, তাকে উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে অর্থবহ করে তুলতে চেয়েছে জীবনানন্দের অঙ্গ করে।
তবে বস‌ন্তের উৎসব দ‌ক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে যেভাবে আবেগে, প্রেমে, রঙে নেশায়, আনন্দে আশ্বাসে অন্তরের সান্নিধ্য লাভে নিবিড়ভাবে ধরা দেয়, তার তুলনা বোধ করি বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না। এই দেশগুলো হলো নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ। এখানে বসন্ত মানেই বসন্ত পঞ্চমী। হোলিখেলা, দোলযাত্রা, রাসলীলা, বাসন্তী পূজা আর পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িজুড়ে মানব মনের প্রেম ছড়ানো। প্রকৃতির দেহে যেমন বস‌ন্তের রং, সৃষ্টির মুখরিত উল্লাস, তেমনি এখানকার মানুষেরও মনে মনে সবার সঙ্গে মেলনবন্ধনে, রঙে রসে, ভালোবাসায় বর্ণিল হওয়ার উৎসব। ঊর্বশী প্রকৃতির উত্তাপহীন সৌন্দর্যকে রসবোধের আবেশে জীবনের পাত্র ভরে পান করার অনুষ্ঠান। নাচে, গানে, কবিতা পাঠের আসরজুড়ে, বাসন্তী রঙের শাড়ির ছোঁয়ায় নতুন জীবনবোধের উদ্দীপনা। এ দেশের বসন্ত উৎসব তাই চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকার নিরন্তর প্রেমের ঝুলনখেলা। সব রকম বিভেদ ভুলে মহাপ্রেমে রাঙিয়ে দেওয়ার অভিষেক। এখানেও রয়েছে পৌরাণিক কাহিনির নানান ইতিবৃত্ত। কিন্তু সব ধর্মীয় কাহিনির মর্মকথা ছাপিয়ে এ দেশের বাসন্তিক অনুষ্ঠানে কেবল ভাবেরই তরঙ্গবিহার। আনন্দের লীলা‌ক্ষেত্র হয়ে ওঠা অকস্মাৎ। যেখানে বসন্ত প্রকৃতির জীবন্ত ছবি, জীবন জাগরণের সন্তরে সন্তরে অনুপম করে সাজানো।

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন