default-image

সুইজারল্যান্ডের জুরিখে প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিশুদের নিয়ে ‘কিন্ডার উমসুক’ নামের একটি পদযাত্রার আয়োজন করা হয়। সেই পদযাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন দেশের শিশুরা দেশীয় পোশাক, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে প্রদর্শন করে থাকে। ২০১৯ সালে বাংলা স্কুল জুরিখের শিশুরা বাংলাদেশের পতাকা, গামছা ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে যখন সেই গামছা যাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিল, রাস্তার দুপাশে সুইসের বেশ কিছু নাগরিককে বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে চিৎকার করতে দেখা গেল। সেই দৃশ্যটির ধারণ করা অংশটি যখন চোখে পড়ল, গর্বে ও খুশিতে বাঙালি হিসেবে নিজে গর্বিত অনুভব করেছি। আমাদের গৌরবের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে এই প্রজন্মের শিশুরা এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যাবে দেশ থেকে দেশান্তরে।

default-image

সময়ের পরিক্রমায় ১৮ বছর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা স্কুল, জুরিখ তাদের স্বকীয়তা ধরে রাখতে সদা সচেষ্ট। ৬৫ জন নিয়মিত শিক্ষার্থীর প্রাণবন্ত উপস্থিতিতে, প্রতি শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত বিনা মূল্যে চলছে অনলাইন বাংলা ক্লাস। এই কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষক হিসেবে আছেন আটজন মেধাবী, উদারমনস্ক, মুক্ত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রবাসী বাঙালি। এঁরা হলেন সুলতানা খান, মুক্তা আক্তার, রোমানা হোসাইন, কানিজ ফাতিমা, সেলিনা হোসাইন, সিমুন আজাদ, আনিস খান, সোহেল আজাদ প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনার দুঃসময়ে সশরীরে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিশুরা যেন তাদের বাংলা ভাষাকে ঘরে বসেই শিখতে পারে এবং অক্ষরজ্ঞান নিতে পারে, সে জন্য অনলাইনে বাংলা শেখার ক্লাসের শুভ উদ্বোধন করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মোস্তাফিজুর রহমান।

default-image

বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের উদ্যোগে প্রতিবছর বাংলাদেশের স্কুলের নির্ধারিত বই উপহার হিসেবে দেওয়া হয় বাংলা স্কুল জুরিখের শিশুদের মধ্যে। অনলাইনে ক্লাস শুরু হওয়ার কারণে বাংলা স্কুল জুরিখের ব্যাপ্তি এখন ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য ক্যান্টনেও। অন্যান্য ক্যান্টনের শিশুরাও স্কুলে যুক্ত হচ্ছে অনলাইনে। বিদেশের মাটিতে, তা–ও আবার চারটি প্রধান ভাষার দেশে এই অসাধ্যকে সাধন করেছেন বাংলা স্কুল জুরিখের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বাকিউল্লাহ খান ও সুলতানা খান দম্পতি। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডির ভেতরেই বাংলা স্কুলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের জাতীয় দিবস এবং উৎসবনির্ভর দিনগুলোকে সামনে রেখে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সরব কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। গত বছর বিজয় দিবসকে উপলক্ষ করে বাংলা স্কুল বাচ্চাদের দেশের কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ ও বিজয় ফুল শেখাতে উদ্বুদ্ধ করে।

default-image

স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে স্কুলের সভাপতি বাকিউল্লাহ খান বলেন, আমাদের বাচ্চাদের যদি তাদের দাদা–দাদু, ফুফুদের সঙ্গে কথা বলতে বলি, তখন কেমন আছো, ভালো আছির মধ্যেই তাদের কথা আটকে যায়। তারা যেন তাদের রক্তের সম্পর্কগুলোর প্রকৃত মূল্যায়ন করতে পারে, নিজেদের আবেগ–অনুভূতিকে ভালোভাবে প্রকাশ করতে পারে নিজের ভাষায় এবং সর্বোপরি সামনের ১০ বছর পর বাংলাদেশের একটা প্রজন্ম এই দেশে নিজেদের শিকড় স্থায়ীভাবে গড়তে যাচ্ছে, সেই প্রজন্মরা যেন সুইসের মাটিতে দেশীয় সংস্কৃতিতে শক্ত করে গড়তে পারে, তিনি সেই আশাবাদই পোষণ করেন, স্বপ্ন দেখেন। বাঙালি ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে দেশকে এবং দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বের মানুষের কাছে মাথা উঁচু করে তুলে ধরার অভিপ্রায় নিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলা স্কুলগুলো এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক খবর আমরা অনায়াসে জানতে পারি, কিন্তু খান দম্পতিদের মতো অসংখ্য প্রবাসী বাঙালিরা তাঁদের শ্রম, ত্যাগ, সময়, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শুধু দেশপ্রেমকে জিইয়ে রাখবেন বলেই ওনাদের এই পথচলা। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে বিদেশের মাটিতে সমুজ্জ্বল রাখছে এই বাংলা স্কুলসংশ্লিষ্ট সবাই।

default-image

‘শিকড়ের টানে শিখি মাতৃভাষা’ স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে বাংলা স্কুল প্রবাসী বাঙালিদের অন্তরে ধারণ করে বাংলাদেশের পরিচয়কে এবং লাল–সবুজের পতাকার মান বিশ্বদরবারে আরও সমৃদ্ধ করুক।

*লেখক: রাওদাতুল জান্নাত, সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন