default-image

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে...
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কোন প্রসঙ্গে গানটি লিখেছিলেন আমার জানা নেই। কিন্তু এই লাইনগুলো এখনো প্রকৃতিপাগল মানুষের মনে বাজে অবিরত। বিশেষ করে যখন পূর্ণিমার ভরা চাঁদে সারা পৃথিবী এক মায়াময় আলোয় আলোকিত হয়, তখন আর তাঁরা নিজেদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে পারে না। আসলে কবিগুরুকে বাদ দিয়ে যেমন আমাদের মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি বাংলার প্রকৃতিকেও কল্পনা করা অসম্ভব। আমাদের ছোটবেলায় একেবারে নিয়ম করে মাকে দেখেছি নানিবাড়িতে নাইওরে যেতে। মায়েরা ছিলেন ১১ বোন আর ৩ ভাই। বোনেরা বিয়ে হয়ে বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করতেন আর মামারা নানাবাড়িতে চার ভিটায় ঘর তুলে বসবাস করতেন। বিভিন্নজন বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকলেও নাইওরের সময়টাতে আমরা সব মামাতো–খালাতো ভাইবোন একত্র হওয়ার সুযোগ পেতাম, তাই সেই সময়ের জন্য আমরা অপেক্ষা করতাম সারা বছর।

নানাবাড়িতে গেলে রাতের বেলা উঠানে পাতা হতো খেজুরের পাতার বারোয়ারি বিছানা। রাতে খাওয়ার পর সেখানে দল বেঁধে শুয়ে পড়তাম। এরপর বসত গল্পের আসর। নানি এসে গল্প শুরু করতেন। নানিকে আমরা নানি বললেও আমাদের অনেকেই ডাকত বউ বলে। নানি এসে শুয়ে পড়ার পর আমাদের মধ্যে হুল্লোড় লেগে যেত, কে নানির কাছাকাছি শোবে, সেটা নিয়ে। নানিই সেটার সমাধান দিতেন। বয়সে যারা একেবারে ছোট, তারাই নানির কোলে আশ্রয় পেত। এরপর একে একে আমরা শুয়ে পড়তাম। মোট ১৪ ছেলেমেয়ের প্রত্যেকের বয়সের হিসাব নানি রাখতেন। এরপর শুরু হতো গল্পের আসর। অবশ্য গল্পকে আমাদের এলাকায় বলা হয় ‘কেচ্ছা’। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ থেকে শুরু করে ‘আরব্য রজনী’র গল্প, এমনকি পুরাণের গল্পও বলা হতো পালা করে। আমরা তখন জানতাম না, এই গল্পগুলোর আবার প্রকার আছে। আমরা শুধু জানতাম, এগুলো রূপকথার গল্প, অবশ্য রূপকথা কাকে বলে, তখন পর্যন্ত আমরা সেটাও জানতাম না।

বিজ্ঞাপন
default-image

আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম। মাঝেমধ্যে গল্পের পাশাপাশি ধরা হতো ধাঁধা। অমাবস্যা থাকলে আকাশভর্তি থাকত তারায়। তারা নিয়ে সবচেয়ে সাধারণ ধাঁধা ছিল—বাটা ভরা সুপারি, গুনতে পারে কোন ব্যাপারী। মাঝেমধ্যে আমাদের চোখে পড়ত—হঠাৎ একটা দুইটা তারা আকাশের এক মাথা থেকে ছুটে অন্য মাথায় চলে যাচ্ছে। নানি তখন বলতেন রাম–রাবণকে তির মারছে, আর তিরের ফলাটা জ্বলজ্বল করছে। পূর্ণিমার রাতে যখন আকাশে কাঁসার থালার মতো বড় চাঁদ উঠত, তখন আবার অন্য রকম গল্পের আসর বসত। চাঁদে নাকি এক বুড়ি থাকেন এবং বসে বসে চরকা কাটেন, তখন আমরা নানিকে বিভিন্ন রকমের প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেলতাম। নানি দম নিয়ে নিয়ে একে একে সবারই প্রশ্নের উত্তর দিতেন। আর সব গল্পই শুরু হতো একটা সাধারণ লাইন দিয়ে ‘সে অনেক দিন আগের কথা’ অথবা ‘এক দেশে ছিল’ আর গল্প শেষ হতো ‘আমার কেচ্ছাটি ফুরাল নটে গাছটি মুড়াল’।

এভাবে বড় হতে হতে আমরা প্রকৃতির সব উপাদানের প্রতি একধরনের মমতা অনুভব করতে শুরু করলাম। জীবন এরপর তার গতিময়তায় সেই চর এলাকা থেকে শুরু করে একসময় কুষ্টিয়ার শহরতলিতে নিয়ে এসে ফেলল। এরপর ঢাকা হয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আমাদের বসবাস। সিডনির যান্ত্রিক জীবনে আমাদের চলতে হয় ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে, কখনোবা ঘড়ির কাঁটার আগে। পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সপ্তাহের পাঁচ দিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর দুই দিন পরিবারের সঙ্গে দৌড়ানো। আমি এই লাইফস্টাইলটাকে বলি, পাঁচ দিন গাধার জীবন আর দুই দিন বানরের জীবন। একটুও অবসর নেই। সবাই যেন একেকটা কলের পুতুল। কোনো এক চালক চাবি দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে আর আমরা আবদুর রহমান বয়াতির গানের কথামতো ছুটে চলেছি অবিরাম—
‘একটি চাবি মাইরা দিলা ছাইড়া
জনম ভরি চলিতেছে।’

default-image

এর মধ্যেও আমাদের মতো যারা তরল মনের অধিকারী, তারা প্রবাস জীবনের সবকিছুর মধ্যেই দেশের ছায়া খুঁজে ফিরি। একটু অবসর পেলেই স্মৃতির ডালা মেলে ধরি আর আনন্দগুলোও করতে চাই দেশের আদলে। এখনো আমরা আমাদের বাচ্চাদের ঘুম পাড়াই বাংলা ভাষার ঘুম পাড়ানি ছড়া বলে। আমাদের ছেলেটার জন্ম অস্ট্রেলিয়াতে, তাই জন্মসূত্রেই সে অস্ট্রেলিয়ান। আমি প্রতি রাতে তাকে কাঁধের ওপর নিয়ে ‘আয় আয় চাঁদ মামা ছড়াটা বলে ঘুম পাড়ায়’। হঠাৎ একদিন শুনি সে ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে পুরো ছড়াটা তার মাকে শোনাচ্ছে। এ ছাড়া ঘুমাতে যাওয়ার আগে উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র থেকে গল্প পড়ে শোনায়। উপেন্দ্রকিশোরের গল্প সমগ্র পড়তে গিয়ে বুঝতে পারলাম ছোটবেলায় নানির কাছে আমরা এসব গল্পই শুনতাম। এই গল্পগুলো ছেলেকে পড়ে শোনাই আর আমাদের স্মৃতিতে থাকা গল্পের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করি। পূর্ণিমা রাত আসলে কখনো বাড়ির পেছনের আঙিনায় আবার কখনোবা বারান্দায় আমরা বসে বাচ্চাদের আমাদের শৈশবের গল্প শোনায়। পূর্ণিমা রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলেও আমার কেন জানি ঘুম আসতে চায় না। রাতে অনেকবার ঘুম ভেঙে যায় আর আমি বাইরে এসে দেখি চাঁদটা তখন কোথায় আছে? অনেকটা হুমায়ূন আহমেদের গানের কথার মতো—
‘চাঁদনি পসরে কে আমারে স্মরণ করে
কে আইসা দাঁড়াইসে গো আমার দুয়ারে।’

অবশ্য সিডনিতে জ্যোৎস্নার আসল সৌন্দর্য বুঝতে পারা যায় না, কারণ, চারদিকেই অনেক রকমের আলো। আমার মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে পূর্ণিমার রাতগুলোতে পুরো শহরে ব্ল্যাকআউট হোক। মানুষ অবাক হয়ে দেখুক তাদের আশপাশে প্রকৃতি কত উপাদান ছড়িয়ে রেখেছে অবাক হওয়ার জন্য, কিন্তু সেটা তো আর সম্ভব না, তাই মনে মনে পরিকল্পনা করছিলাম কোনো এক পূর্ণিমার রাতে বনে চলে যাব পূর্ণিমার আসল সৌন্দর্য দেখার জন্য, কিন্তু সঙ্গী পাচ্ছিলাম না। হঠাৎই একদিন সুযোগটা এসে গেল। আশফাক ভাই, দিশা ভাবি, তাঁদের মেয়ে আলিশা ও ছেলে দৃপ্ত—আমরা বলি, সিডনিতে আমাদের আপন বড় ভাই, ভাবি, ভাইঝি এবং ভাতিজার অভাব পূরণ করেছে। আর আমাদের বর্তমান বাসাটাও তাঁদের খুব কাছে, তাই আমরা মাঝেমধ্যেই রাতে হাঁটতে হাঁটতে তাঁদের বাসায় চলে যাই। তারপর সবাই মিলে হাঁটতে বের হই। দিশা ভাবির জন্মদিন উপলক্ষে আশফাক ভাই একটা ছোটখাটো সারপ্রাইজ পার্টি দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আর তাঁর সঙ্গে যোগ দিলাম আমাদের পরিবারের চারজন, সিডনিতে আমাদের স্থানীয় অভিভাবক নাজমুল ভাই এবং সন্ধ্যা ভাবি আর তাঁদের ছেলে সজীব, ছেলের বউ ফাহিমা এবং দুই নাতনি জেইনা ও জাহিয়া।

বিজ্ঞাপন
default-image

নির্দিষ্ট দিনে সবাই অফিস শেষ করে এসে নাজমুল ভাইদের বাসায় হাজির হয়ে গেলাম। জন্মদিন পালনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমি হঠাৎই প্রস্তাব করলাম, আজ যেহেতু পূর্ণিমা রাত, চলেন সবাই মিলে জ্যোৎস্না বিহারে যাই। অন্যান্য দিন কেউই রাজি হন না কিন্তু সেদিন দিশা ভাবি রাজি হয়ে গেলেন। সঙ্গে আমি আর ফাহিমাও সুর মেলালাম। জায়গাটা আমি মনে মনে আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম। আমাদের বাসা থেকে মাত্র মিনিট দশেকের ড্রাইভ, নাম কেইথ লংহার্স্ট রিজার্ভ। আমাদের বাসা সিডনির দক্ষিণ পশ্চিমের সাব–আর্ব মিন্টোতে। এগুলো একসময় মফস্বল এলাকা ছিল। দিনে দিনে শহরের হাওয়া লাগছে। আমাদের বাসার আশপাশেই এখনো অনেক ফার্ম হাউস আছে, আছে সবজির খেত, আরও আছে নদী ও বন। কেইথ লংহার্স্ট রিজার্ভ আসলে একটা বন। সিডনির জর্জেস রিভারের দুই পাশেই রয়েছে ঘন বন। সেটারই নাম এলাকা অনুযায়ী শুধু পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে এসে আমরা বুঝলাম জ্যোৎস্নাবিহারে যাওয়ার জন্য আবহাওয়াটা দুর্দান্ত। পঞ্জিকা অনুযায়ী অস্ট্রেলিয়াতে এখন বসন্তকাল, তাই বাইরে নাতিশীতোষ্ণ বাতাস। আমরা তিন পরিবার বেরিয়ে পড়লাম জ্যোৎস্নাবিহারে।

বনের মধ্যে আঁকাবাঁকা উঁচু–নিচু রাস্তা পেরিয়ে একটা জায়গায় গিয়ে রাস্তাটা শেষ হয়ে গেছে। সেখানে গাড়ি পার্ক করে আমরা বনের মধ্যে এগিয়ে চললাম। আমরা কিঞ্চিৎ ভয় পাচ্ছিলাম যে এই রাতের বেলায় বাচ্চাগুলোকে কীভাবে ম্যানেজ করা যাবে কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, চাঁদের আলোয় তারাই সবার আগে গিয়ে আমাদের পথ দেখাচ্ছে। এভাবে আলিশা, দৃপ্ত, জেইনা ও তাহিয়া আমাদের পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল। জাহিয়া ওর বাবার কোলে আর রায়ান ঘুমিয়ে পড়াতে আমার গিন্নি গাড়িতেই রয়ে গেল। এই জায়গাটা রায়ানের খুবই পছন্দ কিন্তু ঘুমিয়ে পড়াতে ওকে আর নিয়ে আসা হলো না। বনের মধ্যে চাঁদের আলোয় সবকিছু খুবই পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল। মাটির পায়ে হাঁটা পথ, মাঝেমধ্যে ছোট ছোট পাথর ছড়ানো। গাছের পাতার ফাঁক গলে চাঁদের আলো এসে পড়ছে আর তাতেই তৈরি হচ্ছে অদ্ভুত সব আলপনা। চারদিকে পরিচিত বন কিন্তু চাঁদের আলোয় সব কেমন অপরিচিত এবং রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমরা এগিয়ে চললাম।

default-image

রাস্তাটা বেশ কয়েক জায়গায় পাথরের মধ্য দিয়ে সামান্য নিচে নেমে গেছে। সেখানে দুই পাশে পাথর দাঁড়িয়ে আছে অনেকটা রাতজাগা প্রহরীর বেশে। বাচ্চারা হইহই করে পাথরে উঠে তাদের কৃতিত্ব দেখাচ্ছিল। প্রায় এক কিলোমিটার হাঁটার পর রাস্তাটা হঠাৎ নিচে নেমে গেছে। নিচেই জর্জেস রিভারের পানির প্রবাহ। পানির প্রবাহটা ঠিক এই জায়গাটাতে এসে সামান্য নিচে পড়ে একটা ঝরনা তৈরি করেছে, যার পানি পড়ার শব্দ ওপর থেকেও পাওয়া যায়। আমরা দল বেঁধে নামা শুরু করলাম। আশফাক ভাই আর দিশা ভাবি একটু আগেই থেমে গিয়েছিলেন আর নিচে নামার ঠিক আগেই সজীব এবং জাহিয়া থেমে গেল, কারণ, জাহিয়াকে কোলে নিয়ে এই খাড়া সিঁড়ি ওঠানামা করা যথেষ্ট পরিশ্রমসাধ্য কাজ হবে। আমরাও কিছুদূর নামার পর আর ঝুঁকি নিলাম না, কারণ, বয়স্ক মানুষ বলতে শুধু আমি আর ফাহিমা কিন্তু বাচ্চা মোট চারটা। আমরা যখন ফিরছি, তখন দৃপ্ত বলল, ‘ইয়াকুব চাচ্চু, আমরা দিনের বেলায় এখানে আসব কেমন?’ আমি বললাম, অবশ্যই।

প্রতি পূর্ণিমা রাতেই আমার একজন মানুষের কথা খুব করে মনে পড়ে। তিনি হলেন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, যাঁর হাত ধরে আমরা জ্যোৎস্নাবিলাস, জ্যোৎস্নাবিহারের মতো বিষয়গুলো উদযাপন করতে শিখেছি। এবার বনে জ্যোৎস্নাবিহারের পর মনে মনে পরিকল্পনা করে রেখেছি কোনো এক পূর্ণিমার রাতে আমরা আবারও দলবল নিয়ে বেড়িয়ে পড়ব। এবারের গন্তব্য হবে সমুদ্র। আমাদের এই জীবনে আসলে এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দই আমাদের সুখী করে। পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে শুধু খেয়ে–পরে বেঁচে থাকার নামই জীবন নয়, বরং প্রকৃতির রূপ-রস–সুধা যতটা পারা যায় উপভোগ করার মধ্যে জীবনের আসল সার্থকতা। আর এগুলো উপভোগ করতে শিখে গেলে যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি আর কখনো আপনার জীবনকে পেয়ে বসবে না। পাশাপাশি আপনার শৈশব–কৈশোরের স্মৃতি বারবার আপনার মনে ফিরে এসে আপনার মনকে রাখবে সতেজ–সজীব, আর জীবনটাকে মনে হবে অর্থবহ। বারবার এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে ইচ্ছা করবে। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়—
‘পৃথিবীতে ফিনিক ফোটা জোছনা আসবে।
শ্রাবণ মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার বাজবে।
সেই অলৌকিক সংগীত শোনার জন্য আমি থাকব না।
কোনো মানে হয়।’

মন্তব্য পড়ুন 0