default-image

তুফান সাহেব রুটিন অনুযায়ী চলাফেরা করতে পছন্দ করেন। দৈনিক রুটিন হিসেবে তিনি ফজরের নামাজ পড়ে হাঁটতে বের হন। সকাল আটটা পর্যন্ত তিনি হাঁটাহাঁটি করেন, এরপর বাড়িতে এসে একটু বিশ্রাম নেন, তারপর গোসল করেন। গোসল করা শেষ হলে পত্রিকা হাতে নিয়ে বারান্দায় বসেন, পত্রিকা পড়তে পড়তে নাস্তা শেষ করেন।

দৈনিক রুটিন হিসেবে হাঁটাহাঁটির মধ্যে যাঁকে সামনে দেখেন, তাঁকেই হাঁটাহাঁটির গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন। চেষ্টা চলতে চলতে একসময় তিনি দেখলেন, তিনি হাঁটতে বের হলে তাঁর সামনে আর কেউ আসে না। আজও দৈনিক রুটিন হিসেবে নামাজ শেষে হাঁটতে বের হয়ে নিজের এলাকার প্রায় শেষ সীমানায় চলে এসেছেন। একজনকে দেখে তুফান সাহেব লোকটার দিকে দ্রুত হাঁটছেন, উদ্দেশ্য লোকটাকে হাঁটার গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝানো। তুফান সাহেবকে দেখে লোকটা দিলেন ভোঁ দৌড়। তুফান সাহেব ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভয়কে জয় করতে পারেন না। কারণ, তিনি যথেষ্ট ভীতু ধরনের লোক। চোর-ডাকাত মনে করে তিনি দ্রুত হেঁটে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। দৌড়াতে পারেন না, নয়তো তিনি দৌড়েই বাড়িতে যেতেন।

বাড়িতে এসে একটু বিশ্রাম নিয়ে গোসল করতে গেলেন। গোসল শেষ করে পত্রিকা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে চেয়ারে বসলেন। তুফান সাহেবের স্ত্রী জরিনা বেগম নাস্তা টেবিলে রেখে চলে গেলেন রান্নাঘরে। তুফান সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পত্রিকার শিরোনামগুলো পড়ে যাচ্ছেন।

default-image

খাটের ওপর তুফান সাহেবের মুঠোফোন একটানা বেজে চলেছে। জরিনা বেগম বিরক্তি ভাব নিয়ে ফোনটা ধরতেই অপর পাশ থেকে একটা নারীকণ্ঠ বলে উঠল—
‘আজ এখনো বাজার নিয়ে আসনি? সকাল ১০টা বাজে, দুপুরের রান্না করতে হবে না? আধা ঘণ্টার মধ্যে ঘরে বাজার না এলে আজ তোমার পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দেব, বলে দিলাম।’
জরিনা বেগম কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল। জরিনা বেগম বুঝে নিলেন, তাঁর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। সকালবেলা হাঁটতে বের হওয়ার নাম করে দ্বিতীয় বউয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। জরিনা বেগম মুখে কাপড় দিয়ে বিলাপ করতে লাগলেন। এদিকে তুফান সাহেব বউয়ের কান্নার শব্দ শুনে বললেন—
‘আজ কি ঝগড়া করার উপায় না পেয়ে কান্না করছ নাকি?’

বিজ্ঞাপন

পাঠকদের বলতে ভুলে গেছি, তুফান সাহেবের যেমন দৈনিক রুটিন আছে, জরিনা বেগমেরও দৈনিক রুটিন আছে। তাঁর দৈনিক রুটিনে আছে ঝগড়া। যেকোনো সময়, যেকোনো মুহূর্তে তিনি ঝগড়া করেন।

জরিনা বেগম মুখে কাপড় দিয়ে বারান্দায় এসে তুফান সাহেবের উদ্দেশে বললেন,
‘এই যে বুড়া, হাঁটতে যাওয়ার নাম করে যে আরেক মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যাও, সেটা কি আমি বুঝি না? সে জন্যই তো বলি, প্রতিদিন হাঁটতে বের হওয়ার কারণ কী! বুড়া বয়সে যে আরেকটা বিয়ে করে আমার জীবনটা শেষ করলে, এর মানে কী?’
—আরে, আমি কোথায় তোমার জীবন শেষ করলাম? তুমিই তো সারা দিন কানের কাছে এসে ঘ্যান ঘ্যান করে আমার জীবনটা শেষ করলে। আজ কোনো ইস্যু পাচ্ছ না দেখে কান্না জুড়ে দিলে, আবার পাগলের মতো বলছ, আমি বুড়া বয়সে আরেকটা বিয়ে করেছি! আমার কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই, একটা বিয়ে করে শান্তি নেই, আবার আরেকটা বিয়ে করতে যাব কোন দুঃখে?

—ও আচ্ছা, এখন তো আমি পুরোনো হয়ে গেছি, বুড়া হয়ে গেছি, এখন সামান্য কথা বললেও আমি সারা দিন কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করি। তাই না?
—এখন আজকের ঝগড়ার মূল কারণ কী, সেটা বলো?
—তোমার দ্বিতীয় স্ত্রী কল করেছে। কল করে বলল, আধা ঘণ্টার মধ্যে বাজার না নিয়ে গেলে তোমার পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দেবে।
—পাগলের মতো কথা বলা বন্ধ করো।

—আমি তো এখন পাগল। উচিত কথা বলি তো, সে জন্য। কল করে আপনার স্ত্রীর রাগ কমান আর তাড়াতাড়ি বাজার নিয়ে যান, নয়তো পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দেবে।
—দেখি ফোনটা দাও। সারা দিন তোমার ঘ্যানঘ্যান আর শুনতে ইচ্ছা করে না।
—উচিত কথা বলি তো, তাই তুমি বলো আমি সারা দিন কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করি। এখনই বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছি, ভালো থেকো তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে।
—পাগল-ছাগল কথা বলতে পারে না, ঘ্যা ঘ্যা করে, ম্যা ম্যা করে। ফোন দাও, দেখি কোন বেটি কল করে আমার সংসার ভাঙতে চাইছে।
তুফান সাহেব মুঠোফোন হাতে নিয়ে কল দিলেন তাঁকে স্বামী দাবি করা মহিলাকে।
কয়েকবার রিং হতেই কলটা রিসিভ হলো।

—হ্যাঁ কে বলছেন?
—আরে, আমি কে বলছি সেটা পরের কথা, আপনি কে বলছেন সেটা বলেন।
—কল করেছেন আপনি। আমি আমার পরিচয় দিতে যাব কেন?
—কী আজব! একটু আগে আপনি কল দিয়ে বলেছেন, আধা ঘণ্টার ভেতর বাজার না নিয়ে গেলে আপনি পা ভেঙে গলায় ঝুলিয়ে দেবেন।
—হ্যাঁ, এটা তো আমি আমার স্বামীকে বলেছি।
—কী মুসিবত! আমার স্ত্রী দাবি করছে আপনি আমার নম্বরে কল করে, আমার স্ত্রী পরিচয় দিয়ে কথা বলেছেন।
—আচ্ছা ভাইজান, আমি চোখে একটু কম দেখি। হয়তো ভুলে আপনার ফোনে কল চলে গেছে। ক্ষমা করবেন।
—আরে বোন, এরপর দেখেশুনে কল দিয়েন। আমার তো সংসার ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেল। আপনার কল পেয়ে তো বউ বাপের বাড়ি চলে যাচ্ছে।
—আচ্ছা, ভাবিকে বলবেন, ভুল করে কল দিয়ে ফেলেছি।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
—কী, শুনলে তো? ভুল করে কল দিয়ে ফেলছে। নাকি বাপের বাড়ি চলে যাবে?
—না, ঠিক আছে। বাপের বাড়ি যাওয়ার দরকার হবে না আর।
—ঠিক আছে, ফোন যেখান থেকে নিয়ে এসেছ, সেখানে রেখে এসো। আমি এখন পত্রিকা পড়ব, পত্রিকা মনোযোগ দিয়ে পড়তে হয়। কল এলে পত্রিকায় মন বসে না।
জরিনা বেগম ফোনটা নিয়ে খাটের ওপর রাখতেই আবার একটা নম্বর থেকে কল এল। এই কলও একজন মহিলা করেছেন। জরিনা বেগম কল ধরে এবার উল্টা কল করা মহিলার সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দিলেন। স্বামীর সঙ্গে যেহেতু ঝগড়া কম হয়েছে, তার প্রতিশোধ নিচ্ছেন এই মহিলার ওপর।

default-image

একপর্যায়ে জরিনা বেগম ক্লান্ত হওয়ার পর ফোনের ও পাশের নারী বলে উঠলেন,
—আপা, আমি আপনার ছোট বোন ঝরনা।
—আরে, কেমন আছিস? তোর নম্বর তো সেভ করা নেই। তোর নম্বর সেভ করল না কেন, তোর দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করে আসি।
জরিনা বেগম যাচ্ছেন স্বামীর কাছে, তাঁর বোনের মুঠোফোন নম্বর সেভ করা নেই কেন, সেটা জানতে।

*লেখক: গাজী ফরহাদ, আল কাছিম, সৌদি আরব

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন