বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার বড় শহর থেকে কিছুটা দূরে কান্ট্রি সাইডে যেকোনো জায়গায় বেড়াতে যাবেন, রাস্তার দুই পাশে চোখে পড়বে সারি সারি এসব রঙিন গাছ। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ফার্ম হাউসের সীমানা নির্ধারণে বা সীমানাপ্রাচীরের জন্য এ গাছ বেশি বেশি লাগানো হয়ে থাকে। নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের ব্লু মাউন্টেন, বার্থহাস্ট, মাজি, অরেঞ্জ, সেন্ট্রাল কোস্ট, নিউ ক্যাসেল এলাকাজুড়ে প্রচুর পরিমাণে এ গাছ দেখতে পাওয়া যায়।

শরতে শুধু একটি বা দুটি প্রজাতির গাছই রঙিন হয়, তা কিন্তু না। প্রায় সব গাছ প্রতিযোগিতা করে যে যার মতো করে রং ছড়িয়ে থাকে। রঙিন গাছগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে Claret ash, Chinese pistachio, Tupelo, Liquidambar, Chinese tallow tree, Ginkgo, Spindle bush, Hawthorn, Japanese maple, Manchurian pear, Golden ash, Flowering cherry। এ ছাড়া আরও অনেক প্রজাতির গাছ আছে, যেগুলো প্রকৃতির নিয়মে নিজেদের নিজস্ব রং মেলে ধরে।

গাছগুলো শরৎকালের প্রতিটি স্বতন্ত্র মৌসুমে সৌন্দর্যের পরিমাণ এত নিখুঁত রাখে যে তা কেবল অত্যাশ্চর্য বলা চলে। প্রতিবছর নতুন করে আরও বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে আসে। শরৎকালে প্রকৃতি সাজে রঙের এমন একটি ক্যানভাসে, যা কোনো শিল্পী কল্পনাও করতে পারবেন না। রংগুলো সত্যিই এত প্রাণবন্ত এবং স্পষ্ট হয় যে বিশ্বের নামকরা শিল্পীদের পক্ষেও তাঁর রঙের ক্যানভাসে এই রং ফুটিয়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।

default-image

এপ্রিলের শুরুতে সকালে শীত খুব তীব্র হতে শুরু করে, বেশির ভাগ দিনে রৌদ্রের তাপমাত্রা মাঝারি ধরনের এবং সন্ধ্যা শীতল হতে থাকে। শরৎকালে আবহাওয়া পরিবর্তন হতে শুরু করে তাপমাত্রা ক্রমে শীতল থেকে ধীরে ধীরে শীত পড়তে থাকে এবং এই সময়ে সূর্যের আলোর পরিমাণ আরও কমে দিন ছোট হতে থাকে। এই সময় অনেক গাছের পাতা রং পরিবর্তন করতে শুরু করে এবং খুব দ্রুত সময়ে তা মাটিতে ঝরে পড়ে।

প্রয়োজনীয় সূর্যের আলো এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রার পরিবেশের সংস্পর্শে গাছ সাধারণত পাতা সবুজ থাকা অবস্থায় ফেলে দেয়। কিন্তু শীতপ্রধান দেশে শরতে গাছের নিচে পাতায় রঙের বাহার লেগে থাকে। আমরা কি কখনো লাল, কমলা, হলুদ ও বাদামি রঙের পাতায় ঢাকা এ রকম কোনো রাস্তায় হেঁটেছি? এটা সত্যিই মজার এবং মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতো একটি মধুর অনুভূতি, যা আসলে লিখে বোঝানো যাবে না।
শরৎকাল কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে গাছগুলো তাদের পাতায় থাকা সবুজ ক্লোরোফিল ভেঙে ফেলে এবং সেখানে থাকা পুষ্টিগুলো তাদের ট্রাংক এবং শিকড়গুলোতে পুনরায় বিতরণ করতে শুরু করে। এই পুষ্টিগুলো শীতকালজুড়ে ধরে রাখে, যাতে যখন সূর্যের আলো খুব কম এবং চারপাশে প্রচুর ঠান্ডা থাকে, তখন গাছ তার প্রয়োজনীয় রসদ পেতে পারে বেঁচে থাকার জন্য।

ক্লোরোফিলের ক্ষয় হওয়ার ফলে শরতের গাছগুলোতে হলুদ বর্ণ দেখা যায়। গাছ তার পাতার সবুজ রঙের ক্যারোটিনয়েডগুলো (উদ্ভিদে বিদ্যমান পিঙ্গল পদার্থ) সহজেই খালি করতে পারে। তবে পাতার লাল রং অ্যান্থোসায়ানিন নামের রঞ্জক থেকে আসে, যা শরৎকালের শুরুতে গাছকে নিজ থেকে নতুন করে তৈরি করতে হয়। কারণ, পাতা লাল হয়ে যাওয়ার ফলে তা আরও বেশি সময় ধরে গাছে থাকতে পারে এবং গাছও চেষ্টা করে সেখান থেকে যতটা বেশি পরিমাণে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে রাখতে।

নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বন্যা সমভূমির এবং আশপাশের উঁচু অঞ্চলে গাছ ও পাতা নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে নিচু অঞ্চলের গাছের পাতার রঙের তুলনায় উঁচু অঞ্চলের পাতাগুলো বেশি উজ্জ্বল লাল হয়ে থাকে। কারণ, উঁচু অঞ্চলে মাটিতে পুষ্টির গুণাগুণের পরিমাণ কম থাকার কারণে সেখানে পাতাগুলো বেশি লাল ছিল। প্লাবনভূমিতে যেখানে মাটিতে পুষ্টির পরিমাণ পরিপূর্ণ ছিল, সেখানে শরতের গাছের পাতাগুলো বেশি হলুদ ছিল। সাধারণত যেখানে মাটির গুণাগুণ যত খারাপ হবে, গাছের পাতার রং তত বেশি লাল হবে।

শীতকালে প্রচুর ঠান্ডা ও সূর্যের আলো কম থাকায় গাছকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের জন্য কঠোর প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তাই শরতে পাতা জ্বলন্ত লাল হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ বলে যে লাল পাতা পাখিদের আকর্ষণ করতে সহায়তা করে, যাতে গাছের ফলগুলো চারপাশে ছড়িয়ে দিতে পারে ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন চারা জন্মানোর জন্য বা শীতের হাত থেকে গাছকে রক্ষা করে পাতার তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারে।

*লেখক: মোহাম্মদ মিজানুর রহমান মুকুল, সেন্টাল কোস্ট, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন