default-image

‘স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’৷ এই স্লোগানে মহান বিজয় দিবসকে সামনে রেখে কানাডার টরন্টোতে নর্থ আমেরিকার প্রথম পরিপূর্ণ বাঙালি সাংস্কৃতিক শিক্ষানিকেতন ‘যথার্থ’ আয়োজন করে দিনব্যাপী বাঙালির বিজয় উৎসব–২০১৪। এই উৎসবে অন্যান্য আয়োজনের পাশাপাশি সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা প্রদান করা হয় বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে।
যথার্থর দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় ছিল শিশু-কিশোরদের সুন্দর বাংলা হাতের লেখা ও অঙ্কন প্রতিযোগিতা, বাংলাদেশ ও বাংলাভাষা প্রতিযোগ, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সমগ্র অনুষ্ঠানটির মূল আকর্ষণই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান পর্বটি। যথার্থ এবার যে সাতজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মাননা দেয় তাঁরা হলেন মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিঞা, ছানাউল ইসলাম খান, এম আর জাহাঙ্গীর, রঙ্গলাল দেব চৌধুরী, রথীন্দ্রনাথ রায়, এ কে রিয়াজ উদ্দিন সফদার ও মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী। সম্মাননা পদক তুলে দেন ইমপালস্কো লিমিটেডের চেয়ারম্যান সুশীতল সিংহ চৌধুরী, সংগঠক নাসিরুদ্দোজা ও সাংবাদিক সওগাত আলী সাগর। সংক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানস্থলের প্রায় ৫০০ মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও অভিবাদন জানান।
উল্লেখ্য যে, মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কয়েকটি মৌলিক লেখা নিয়ে সূর্য সন্তান নামে যথার্থ একটি বিশেষ প্রকাশনা প্রকাশ করে। প্রকাশনাটির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এটি দেখে মনে হয় যেন সেই ১৯৭১ সালেই এটি মুদ্রিত হয়েছিল। বিশেষ স্মৃতি ও বিশেষ একটি সময়কালের ধারণা সৃষ্টির জন্যই এভাবে প্রকাশনাটি মুদ্রিত হয়েছে। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধাই তাঁর লেখায় যুদ্ধকালের ঘটনা অত্যন্ত সাবলীল ও পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আগামী প্রজন্মের কেউ যদি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গবেষণার কাজ করতে চান, সে ক্ষেত্রে এই প্রকাশনাটির তথ্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও একুশ শতকে আমাদের অর্জন’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক আজকাল সম্পাদক সৈয়দ আবদুল গফফার, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী ও লেখক-গবেষক সুব্রত কুমার দাস।

default-image

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যথার্থর শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ছিল চোখে পড়ার মতো। যথার্থর সংগীত বিভাগ, তবলা বিভাগ, গিটার বিভাগের নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা যথার্থর লোগো ও ‘স্বাধীনতা তুমি রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’ লেখা টি-শার্ট ও হ্যাট পরে মঞ্চে যখন পরিবেশনা শুরু করে, তখন গোটা হলে অন্য রকম এক আবহের সৃষ্টি হয়। মঞ্চে সংগীত পরিবেশন করেন টরন্টোর স্বনামধন্য স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ ও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কিংবদন্তী শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। নৃত্য পরিবেশন করে বিশিষ্ট নৃত্য প্রশিক্ষক বিপ্লব করের ‘নৃত্যকলা কেন্দ্র’ ও যথার্থর নৃত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা। যন্ত্রানুষঙ্গ কি-বোর্ডে ছিলেন মামুন কায়সার, তবলায় রণি পালমার ও গিটারে সোহেল ইমতিয়াজ।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘বিজয় দিবস পুঁথি’। যথার্থ সব সময়ই তাদের অনুষ্ঠানে আবহমান বাংলা সংস্কৃতির কোনো একটি বিষয়কে তুলে আনে। যে কারণে তাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানে যাত্রাপালা, জারিগানের কোনো না কোনো একটি পরিবেশনা থাকেই। এবারে ছিল পুঁথিপাঠ। সুমন সাঈদের পরিবেশনায় ‘বিজয় দিবস পুঁথি’ সব দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ঠিক ১২টা ১ মিনিটে যখন কানাডায় ১৪ ডিসেম্বর শুরু, সেই সময় উপস্থাপক হলের দর্শকদের উঠে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। আর এই নীরবতা পালনের মাধ্যমেই যথার্থ তার অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করে। বাঙালির বিজয় উৎসব–২০১৪ ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও মানের দিক থেকে অনেক সমৃদ্ধ একটি আয়োজন। এই সুদূর প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতিচর্চায় এই রকম অনুষ্ঠান যত বেশি হবে, ততই আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে বেগবান করতে পারব।
সুব্রত পুরু
টরন্টো, কানাডা

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন