default-image

এখানেও ঘটনার শেষ নয়! আমাদের চারটা গাড়ির ভেতর দুটো ভেতরে ঢুকতে পারল। বাকি দুটো গাড়ি নিয়ে আমরা কিছুতেই ঢুকতে পারলাম না। এই গভীর রাতে এ কী বিপত্তি রে বাবা! ক্যাম্পিং সাইটের অফিস হোটেলের মতো নয় যে ২৪ খোলা থাকবে। সন্ধ্যা সাতটাতেই বন্ধ হয়ে যায়! তারপর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, রাত সাড়ে ১১টার পর গাড়ি ঢোকানো যাবে না। অথচ বাকি দুটি গাড়ি ঢুকতে পারল কীভাবে, সেটা জানতে চাইলাম একজন স্টাফের কাছে। সে গম্ভীরভাবে বলল, ‘সেটা বলতে পারি না!’ কী ভুতুড়ে ব্যাপার রে বাবা! অগত্যা গাড়ি গ্রাউন্ডের বাইরের পার্কিং জোনে রেখে ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় বড় বড় গাছের মাঝ দিয়ে আমি, বাবাই আর আশিসদা হেঁটে কটেজে ফিরলাম! হাঁটতে হাঁটতেই আশিসদা হাসিমুখে বলে উঠলেন, ‘ওরে ওরে ওরে, সেই মজা রে!’

পরদিন আমরা যাব কেওকেনহফে! সবচেয়ে বড় টিউলিপবাগানে! যে বাগানকে কেন্দ্র করেই আমাদের এবারের প্ল্যানটি করেছিলাম। টিকিট আগে থেকেই অনলাইনে কিনে রাখতে হয়েছিল। এ সময় লাখ লাখ মানুষ যায় এ বাগান ঘুরে দেখার জন্য। প্রবেশপথের অনেক আগে থেকেই ডিজিটাল বোর্ডে দেখাচ্ছে, সব টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছে। মানে টিকিট না কিনেই যদি কেউ এই পথ ধরে এগোন, তবে সেখানে থেকেই বিদায় নেওয়া ভালো। বিভিন্ন জায়গাতে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন এক জায়গাতেই বেশি ভিড় না হয়। দারুণ ব্যবস্থাপনা, বাগানের ভেতরে ও বাইরে। আমি সব সময়েই অবাক হয়ে ভাবতাম টিউলিপ ফুল নিয়ে এত কেন মাতামাতি? ইউটিউবে দেখেও এ প্রশ্নের উত্তর পাইনি। কিন্তু যে মুহূর্তে ভেতরে ঢুকলাম, আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেল! যেদিকে তাকাই, শুধু নানা ধরনের, নানা রঙের টিউলিপ সবুজের মধ্যে ছেয়ে রয়েছে।

দিগন্তজোড়া টিউলিপরাশি দেখে ডাচ্‌দের টিউলিপম্যানিয়াকে বুঝতে আমার আর অসুবিধা হলো না। অনেকেরই জানা নেই, টিউলিপের আদি বাস ছিল হিমালয়ান অঞ্চলে, তিয়ান শান পর্বত এলাকায়। সেখান থেকে ষোড়শ শতকে তুরস্ক হয়ে এ ফুল পৌঁছায় নেদারল্যান্ডসে। তুর্কি সুলতানরা বসন্তকালে বাগানে টিউলিপ পার্টি করতেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ আছে।

কেওকেনহফের বাংলা করলে হয় ‘হেঁশেল বাগান’! এই নামের পেছনের গল্পটাও কিন্তু বেশ মজার। পঞ্চদশ শতকে তেলিঙ্গেন দুর্গের হেঁশেলে সরবরাহের উদ্দেশ্যে ফল আর সবজিবাগান হিসেবেই সূচনা হয় ২০০ হেক্টর জমির ওপরে এই কেওকেনহফের। আর আজ এই ৩২ হেক্টর জমির ওপর তৈরি করা কেওকেনহফ বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পুষ্পোদ্যান। এখানে সাত মিলিয়ন ফুল নানা বিন্যাসে, নানা সজ্জায়, নানা রঙে সজ্জিত ও সুশোভিত! ফুডকোর্টের পাশেই বেশ কয়েকটি স্যুভেনির শপ আর প্যাভিলিয়ন।

এসব প্যাভিলিয়ন থিম স্পেসিফিক। প্রথম যেটি দেখলাম, সেটি ওয়েডিং ফ্লাওয়ারস। হার্ট শেপে সাজানো পুষ্পরাজি। অনেক রঙের। ৭০০ থেকে ৮০০ প্রজাতির টিউলিপ রয়েছে এই বাগানজুড়ে। মানুষের কল্পনায় যতগুলো ফুলের রং ও রঙের শেড রয়েছে, সব কটির দেখা পাওয়া যায় এখানে। সমুদ্রের মতো বিশাল বাগানে যেন ফুলের বন্যায় রঙের ঢেউ হিংসা-হানাহানিতে ভরা জগৎকে ঢেকে দিয়েছে। এত সুন্দর, এত বর্ণিল, এত পরিকল্পিত ফুলের সমাহার পৃথিবীতে আর কোথাও নেই। বাগানের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে অপূর্ব লেক আর ধার ঘেঁষে রয়েছে ফুলের সমুদ্র! কোথাও কোথাও এমনভাবে সাজানো, যেন ফুল দিয়ে আঁকা হয়েছে বিমূর্ত কোনো শিল্পকর্ম।

default-image

ডাচ্‌ ঐতিহ্যের উইন্ডমিলও রয়েছে এ বাগানে। বাতাসের শক্তি আহরণ করে তা পানি উত্তোলন ও সরবরাহ, কাগজ, গাছের গুঁড়িসহ নানা উৎপাদন কারখানায় ব্যবহৃত হতো উইন্ডমিল। একসময় ভীষণ জনপ্রিয় প্রযুক্তি ছিল। ছিল বলছি কেন, পুরো নেদারল্যান্ডসে এখনো ছড়িয়ে আছে কয়েক হাজার উইন্ডমিল। তবে শিল্পবিপ্লবের পর প্রযুক্তি বদলেছে। উইন্ডমিলের জায়গা নিয়েছে উইন্ড টারবাইন। পুরো কেওকেনহফ–বাগানের বার্ডস আই ভিউ পাওয়া যায় বলে সবাই মই বেয়ে উঠে উইন্ডমিলের চূড়ায়।

বাগানের এক জায়গায় মিউজিকের ব্যবস্থা রয়েছে, দেখে মনে হয়, সিডি প্লেয়ারে মিউজিক হচ্ছে। আসলে কিন্তু তা নয়! কাজগুলো পরীক্ষা করার জন্য পেছনে ঘুরেই দেখতে পেলাম একটি একক বেল্ট-চালিত চাকা সংযুক্ত করে এতে শক্তি দিচ্ছে, যার মধ্যে বিভিন্ন অর্গান পাইপ, কাঠ-ব্লক ও ড্রাম রয়েছে। এর মাধ্যমে সুমধুর সুর তৈরি হচ্ছে, যা একটি লম্বা শিটে স্বরলিপির মতো রেকর্ড করা থাকে, সেই অনুযায়ী সুর তৈরি হয়। অনেকক্ষণ আমি আর ছেলে লিওনেল মিউজিকের সঙ্গে নাচলাম মনের আনন্দে। আমরা সবাই মনে হয় সবচেয়ে শেষে এখান থেকে বের হয়েছিলাম!

পরদিন ফেরার পালা। ক্যাম্পিং সাইটেই সবাই একসঙ্গে সকালবেলা ট্রেনে করে ঘুরে পুরো এলাকা দেখে দুপুরের দিকে ফিরে চললাম যার যার নীড়ের দিকে।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন