করোনাজীবনের ১২তম দিন

টেনশন, আর যেন কেউ অসুস্থ না হয়

বিজ্ঞাপন
>করোনাভাইরাসে পাল্টে গেছে জীবনের বাস্তবতা। আক্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। করোনায় জীবন নিয়ে লিখছেন অনেকেই। এই চিকিৎসকও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সিরিজ লিখছেন। আজ পড়ুন ১২তম পর্ব।

গতরাতে নিদ্রাদেবীর সাক্ষাৎ পেতে সময় চলে গেছে... কখন যে ঘুমিয়েছি ঠিক জানি না। ভাই মেসেজ করছে, ঘুমিয়ে যাও! ওরা থাকে দুনিয়ার অন্যপ্রান্তে! সেখানে দিন আমার রাতে।

সকালে উঠে দেখি, কাজে থেকে জানতে চাচ্ছে কেমন আছি। গতকাল কাউকে কোনো উত্তর দিইনি। একই কথা... না ভালো লাগছে না! উইকনেস যাচ্ছে না। মেয়ে গতকাল দৌড়ে বেড়িয়েছে বিড়াল নিয়ে। দেখি কি অবস্থা আজ!

টেক্সট এল, চা রেডি! ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই দেখি বাচ্চারা নাশতা করতে এসেছে। মেয়ে কম প্লেন করছে, পায়ে উইক লাগছে! আমার ক্র্যাম্প ছিল। গেটোরেড (স্পোর্টস ড্রিংক) খেতে বললাম একটু। খেয়ে ওপরে গেল।

ঘণ্টাখানেক পর মনে হলো কিছু খাইনি চা ছাড়া! চা টা ভালো বানিয়েছে। নিজ থেকে বানিয়ে দিয়েছে, আমি তাতেই খুশি। মেয়েকে দেখে ভালো লাগছে না। টায়ার্ড বোঝা যাচ্ছে। সব ওষুধ ঠিক করে খাচ্ছে কি না বুঝতে পারছি না। আর যেহেতু আমার শরীর ভালো লাগে না, এদের খাবার দাবারের খেয়াল রাখতে পারছি না।

ভাবলাম লাঞ্চ বানাই। গতকাল থেকেই শ্রিম্প স্ক্যাম্পি বানাব ভাবছি- চিংড়ি মাছ, বাটার দিয়ে, লেবু দিয়ে নুডলস-সঙ্গে কিছু অলিভ দিয়ে দেব, পেঁয়াজ আর টার্কি সসেজ। ইতালিয়ান ধাঁচের পাস্তা, মেয়ে পছন্দ করে।

বাবার সঙ্গে ফাইনালে দুদিন পর কথা হলো। রান্না করে সবাইকে খেতে বললাম। ও যেতে চাচ্ছিল, শ্বশুরবাড়ি থেকে খাবার আনতে, সঙ্গে বাচ্চাদের অর্ডার আছে। বললাম রান্না যেহেতু হয়ে গেছে, এখন আর কোথাও না যেতে- মেয়ের হাতে খাবার আর ওষুধ দিয়ে এলাম।

মেয়ের বাবাকে বলেছিলাম মেয়েকে নিচে ডাকতে, মেয়ে বলেছে, পায়ে জোর পাচ্ছে না নামার জন্য! খাবার দিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার দেখতে গেলাম। খায়নি ঠিকমতো। রুচি কমে গেছে বুঝতে পারছি।

লন্ড্রি চলছে লাগাতার গত দু সপ্তাহ ধরেই। রুমে এসে দেখি, আমার বিছানা রেডি করে দিয়েছে! কাল থেকে ভ্যাকুম করার জন্য ঘুরছে। আমি না করেছি রুমে ঢুকতে বা বেশিক্ষণ থাকতে। তারপরও যে এটা-সেটা করে দিয়ে যাচ্ছে- মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়-প্রকাশ করি না!

দেখি মেয়ের কি অবস্থা যায় আজ। ঠিকমতো খেতে হবে আর লিকুইড খেতে হবে। দেখি স্যুপ বানাব। ইনস্ট্যান্ট স্যুপের আইডিয়া যার মাথায় এসেছিল, সে আসলেই জিনিয়াস! এটা-সেটা ইনগ্রিডিয়েন্টস দিয়ে- যে কেউ নিজেদের রুচি, টেস্ট মতো করে নিতে পারে।

আমার করোনা রি-টেস্ট করতে হবে। কর্তারও, কাশছে সেও তবে স্বীকার করতে নারাজ। ছেলেকেও টেস্ট করাতে হবে। বাবা-মায়েরও একবার করে আনানো দরকার। যদিও আমাদের সঙ্গে থাকে না, তবে তারাও কাজ করেন। এক্সপোজার যে কোনো সময় হতে পারে। হাইরিস্ক জনগণ।

ভাইদের ওখানেও করোনা বাড়ছে, সারাক্ষণ টেনশন! ছোট ভাই বউ প্রেগনেন্সীর কম্পিকেশন নিয়ে হসপিটালে ভর্তি! ভাগ্যিস অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা ভালো। বলে দিয়েছি বেশি টেনশন না করতে। হয়তো প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি হয়ে যাবে, তবে তার জন্য টেনশনের কিছু নাই এটলিস্ট অস্ট্রেলিয়ায়। গত দুবছর অসুস্থতা যেন আমাদের পরিবারের পিছু ছাড়ছে না। দু’ভাই ই পর পর মেজর অ্যাক্সিডেন্ট করল। ছোট ভাই এখনো পুরোপুরি রিকভার করে নাই। বড়টা নিজের সমস্যা সব সময় ছোট করে দেখায়। আর এত দূর থেকে কেউ কারও জন্য দোয়া ছাড়া কিছু করতে পারে না।

default-image

মেয়েকে গোসল করে নিতে বললাম, মে বি ভালো ফিল করবে। ভ্যাকুম করতে হবে ওপরে এর মাঝে কর্তা বেড়িয়ে গেছে খাবার নিয়ে আসতে। ফুচকা খেতে ইচ্ছা হচ্ছে ভীষণ ঝাল দিয়ে- বাঙালি দোকান আছে, যেতে আধা ঘণ্টা লাগবে-বলে দিলাম যদি পায় যেন নিয়ে আসে। ছেলেমেয়েদের তাদের খাবার শেষ করে নিতে বললাম-কেউ খাবার শেষ করে নি। আসলে এখন আর্লি ডিনার।

এমনিতেই খাবার নষ্ট করতে মন চায় না। কত মানুষ না খেয়ে থাকে। আর এরা অসুস্থ না হলে হতো, না খেলে শিওর ফেলে দিতে হবে। তাগাদা দেওয়ায় কাজ হলো- খাবারগুলো শেষ করেছে। দুর্বল ফিল অতটা করবে না। পরে যদি ডিনার করতে চায়, করে নিবে।

খাবার আর পানি, এ দুটো জিনিস নষ্ট করতে দেখতে ভালো লাগে না। কত মানুষ খাবার আর সুপেয় পানির অভাবে থাকে! ছোটবেলায় রাস্তায় কলতলায় পানির হাহাকার দেখেছি। সাপ্লাইয়ের পানি শেষ হওয়ার জন্য বাবা-মাকেও পানি জমিয়ে রাখতে দেখেছি- নষ্ট করতে দেখতে ভালো লাগে না। আর খাবারের কষ্ট? কতজন আমাদের বাড়িতে ভাতের জন্য বসে থাকতেন। ভাতের মাড় খেতেও দেখেছি! এক থালা ভাতের হাহাকার দেখেছি আশপাশে অনেক! এসব কষ্ট না দেখলে আসলে বোঝা যায় না- বুঝতে পারলে, ডিএনএ-তে মিশে থাকে। ধান আনতে দেখেছি, সেগুলি ছড়াতে দেখেছি, সে ধান সিদ্ধ করে শুকোতে দেখেছি, ঢেঁকিতে পাড়িয়ে চাল বানাতে দেখেছি- কতশত প্রসেস করার পর এক থালা ভাত- সব দেখা আছে। আর পানি? রান্নার জন্য পুকুরের পানি, মাইলখানেক দূর থেকে বাড়ির নারীদের খাবারের পানি আনতে হতো! তারপর বাড়ির কোণে কোণে চাপ কল!

এদের খাবার শেষ হতেই কর্তা মায়ের বাসা থেকে খাবার নিয়ে হাজির। মা অনেক খাবার পাঠিয়েছে-ডিনার করে নিলাম দুজন দুই জায়গায় বসে।

খেয়ে-দেয়ে আমরা পরকাল নিয়ে কথা বলছি- দেখি স্বগতোক্তি করছে, ‘নাহ, আমার পরকালে সত্তর জন হুর লাগবে না! এত মহিলা দিয়ে কি করব? আর যদি ব্যাডএস হয়, তাহলে তো আরও সমস্যা!’ ব্যাডএ্যাস মানে স্ট্রং পারসোনালিটি? রাফ, টাফ, শক্ত মহিলা, - বলে কি দরকার দুই লাইফেই সাফার করার? আমি হাসি! বলি আমার মতো নরম মানুষ পেয়েও তোমার এত ভয়? বলে তুমি তো দশে এগারো পাওয়ার মতো শক্ত মহিলা। মেয়েটা অসুস্থ বলে হয়তো আজ নিজেকে শক্ত প্রমাণ করতে হচ্ছে। আমি হাসি! আসলে হয়তো আমি অতটা শক্ত নই! চারদেয়ালের ইট পাথরের মাঝে, দু একজনকে ভালোবেসে যে কোনো মেয়েই শক্ত হতে পারে। তাদের জন্য সব করার ক্ষমতা রাখে। ইমোশনের চেয়ে, যুক্তিটা বড়, তবে ইমোশনটাও কম বড় নয়!

দিন শেষে মেয়েটার মুখে হাসি দেখে অন্যরকম প্রশান্তিতে মনটা ভরে গেল। অসুস্থতা ভোগাবে, তারপরও যখন একটু ভালো বোধ হয়, সেটা দেখতেও ভালো লাগে। আবার ওই যে টেনশন যেন আর কেউ অসুস্থ না হোক! আহা জীবন! চলবে...

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন