বেঁচে থাকতে মাকে নিয়ে কিছু লেখা লিখেছি, যা দেশের কিছু পোর্টালে বিভিন্ন সময় পাবলিশও হয়েছে। এবার করোনাভাইরাসের মহামারিতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দী অবস্থায় থেকে মাকে নিয়ে লেখার বিষয়টি আরও বড় করে করার চিন্তা থেকেই এ লেখা। ছোট বয়সে মায়ের আঁচলের নিচে থাকার অনেক স্মৃতিই এখন উঁকিঝুঁকি মারছে। তবে মায়ের অনেক বিষয়ই এখন ঝাপসা, তারপরও মা তো। মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে বসে মনে হয়েছে এত ঘনিষ্ঠ রক্তের সম্পর্ক যার সঙ্গে, সেই মায়ের স্মৃতি ভুলে যাওয়া সহজ নয়। তাই চেষ্টা করলাম রোমন্থন করতে।

 ছোটবেলায় যখন বুদ্ধি হতে শুরু হয়, তখন বাড়ি এবং আশপাশে যারা আমার মতো ছোট বা সমবয়সী ছিল, তাদের সঙ্গে খেলা করার সময় প্রায়ই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতাম। স্কুলে ভর্তির সময় ঘনিয়ে এলে আমরা নিজেদের মধ্যে কে ভর্তির সুযোগ পাবে, তার পরীক্ষা করতাম ডান হাতে মাথার ওপর দিয়ে বাঁ দিকের কান স্পর্শ করার মাধ্যমে।

বিশেষ করে গ্রামে একই বয়সের ছেলে মেয়ে যারা ছিলাম, এরা একত্র হলে প্রায়ই এভাবে আমরা কান ধরে দেখতাম কে কতটা কান ধরতে পারি। শুরুতে বাঁ কান ছুঁতে পারতাম না। ফলে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগ্রহে প্রায় প্রতিদিনই আমরা একে অপরের হাত ধরে টেনে বাঁ কান ছোঁয়ানোর মাধ্যমে দেখতাম কার স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স হয়েছে। একদিন যখন প্রথম আমি কোনোভাবে কান ছুঁতে সক্ষম হই, তখন আমার আনন্দ আর দেখে কে? বাড়িতে এসে মাকে বললাম, আমার কান ছোঁয়ার কথা। মা আমার কথায় স্কুলে ভর্তি করার কথা বলে আশ্বস্ত করে। এরপর প্রথম এই কান ছোঁয়ার আনন্দ দেখে মাকেও খুব খুশি হতে দেখেছি।

এরপর সত্যি সত্যি একদিন মা খুব সকালে রেডি করে স্কুলে নিয়ে গেল আমাকে ভর্তি করানোর জন্য। স্কুলে গিয়ে দেখি পরিচিত–অপরিচিত আরও অনেকে সেখানে বসে ভর্তি পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছে। সময় হলে আমাদের দুটি শ্রেণিকক্ষে নিয়ে বসানো হয়। আমি যে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে বসি, সেই শ্রেণিকক্ষে এসে প্রবেশ করলেন বয়স্ক এক শিক্ষক। তিনি ছিলেন আমাদের পাশের বাড়ির, সম্পর্কে জ্যাঠিমা হন। নাম তাঁর আগ্নেশ ডি কস্তা। তিনি শ্রেণিকক্ষে এসে আমাদের সঙ্গে প্রথম স্বাভাবিক হাসি হাসি করে কথা বলতে শুরু করলেন।

আমাদের প্রথম অফিসকক্ষের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল। শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর মনের ভেতর ছাত্রত্বর ভাব জাগে। নিচু বেঞ্চে বসে একটু উঁচু বেঞ্চে হাত রেখে সবাই বসলাম। একটু সময় যেতে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করি। মা তখন বাইরে দাঁড়িয়ে মুখে আঙুল দিয়ে কথা না বলার নির্দেশ করছিল। এ অবস্থায় কে শোনে কার কথা। সবাই শব্দ করে কথা বলায় শ্রেণিকক্ষে বেশ চেঁচামেচির মতো শব্দ হতে থাকে। শিক্ষক এভাবে আমাদের কথা বলার সুযোগ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘণ্টা বাজানোর পর শিক্ষকের নির্দেশে সবাই চুপ হয়ে যাই। এই ঘণ্টার বাজানোর মধ্য দিয়ে আমাদের সবার পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়।

এরপর একজন একজন করে আমাদের সবাইকে শিক্ষক তাঁর সামনে ডেকে ডান হাত মাথার ওপর দিয়ে নিয়ে বাঁ পাশের কান ধরতে বললেন। এভাবেই বয়স নির্ণয় করে ভর্তি হওয়ার যোগ্য কি না, তা পরীক্ষা করা হয়েছিল আমাদের। যারা কান ছুঁতে পারছিল, তারাই ভর্তির যোগ্য বলে ধরা হয় এবং তাদের এক পাশে বসতে বলেন। যারা কান ছুঁতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তাদের অযোগ্য হিসেবে আলাদা বসানো হচ্ছিল।

আমার আগে যাদের ডাকা হয়েছে, তাদের এভাবে আলাদা করে বসাতে দেখে বুঝতে পারি এক দিকে যোগ্যদের, আরেক দিকে যে অযোগ্যদের বসানো হচ্ছে। যখন আমার ডাক এল, তখন মা দূর থেকে চোখ বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়ের দিকে তাকিয়ে ডান হাত মাথার ওপর দিয়ে বাঁ কান ধরার চেষ্টা করায় আমার মনোযোগ বাইরে চলে যায়। তা দেখে শিক্ষক (আগ্নেশদি) ধমকে বলছিলেন, এই! বাইরে কী দেখছ? বাইরে নিয়ে বসিয়ে রাখা হবে কিন্তু। সেই দিনের সেই ধমকের কথা ভোলার নয়। (শিক্ষক তার ভর্তিবিষয়ক কার্যক্রম শুরু করার আগে নিজের নাম ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে বলেছিলেন, তাকে আগ্নেশদি ডাকার জন্য)।

সবকিছুর পরও যখন আমি যোগ্যদের দলে গিয়ে বসলাম। তখন মাকে দেখছিলাম কেমন হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর তো স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় মা আমাকে কত কথা বলল।

আমরা নয় ভাইবোন। নয় ভাইবোনের মধ্যে আমার নম্বর আট। মা বলল, স্কুলে গিয়ে পড়া লেখা করে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারলে বড় ভাইবোনদের মতো ঢাকা শহরে গিয়ে পড়াশোনা করা যাবে। মা সেদিন আমাকে প্রথম বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাল। মায়ের দেখানো সেই স্বপ্ন একসময় সার্থক করার চেষ্টা করেছি, যখন বুঝতে শিখি। চলবে...

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0