default-image

ম্যাকগাইভার ছিল বিটিভিতে একসময়ের বেশ জনপ্রিয় সিরিজ। অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও নানা কৌশলে পারদর্শী একজন গুপ্তচরের বর্ণাঢ্য কাহিনি নিয়ে ১৩৯টি পর্বের সিরিজটি অনেক দেশেই সমাদৃত হয়েছিল। বিপদে পড়লে হাতের কাছে যা পেতেন, তা দিয়েই যন্ত্রপাতি বানিয়ে কৌশলে নিজেকে এবং অন্যদের অনায়াসে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারতেন। ম্যাকগাইভারের অধিকাংশ কৌশল থাকত বিজ্ঞানভিত্তিক। আসলে বাস্তবে এমন বুদ্ধিদীপ্ত, চৌকস ম্যাকগাইভারের কোনো অস্তিত্ব ছিল আজ অবধি তা কেউ উল্লেখ করেছেন বলে অন্তত আমার তা জানা নেই।

তবে আমি বাস্তবেই একজন ম্যাকগাইভারের খোঁজ পেয়েছি। তাঁর নাম মোটেই ম্যাকগাইভার নয় এবং তিনি গুপ্তচরও ছিলেন না। তিনি ম্যাকগাইভারের মতোই মার্কিন নাগরিক, নাম জর্জ ট্রটার (১৯১৫-১৯৯৭), তড়িৎ প্রকৌশলে বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন একজন ২৯ বছরের টগবগে তরুণ।

ঘটনাটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলার সময়ের, আজ থেকে ৭৬ বছর আগে ১৯৪৪ সালের। ঢাকা তখনো আজকের ঢাকা হয়ে ওঠেনি। জনবিরল অপ্রশস্ত রাস্তায় দেখা যেত কিছু কিছু ঘোড়ায় টানা গাড়ি। যানজট কিংবা শব্দদূষণ ছিল না বললেই চলে। মাঝেমধ্যে ঝাঁক বেঁধে জাপানি বোমারু বিমান ঢাকার আকাশ আচ্ছন্ন করে উড়ে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থাপনায় বোমা বর্ষণ করত। সে সময়ে ঢাকার তেজগাঁও এবং কুর্মিটোলা (বর্তমানে হজরত শাহজালাল) বিমানবন্দরের দুটোতেই শত্রুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবস্থান করছিলেন মিত্র বাহিনীর বায়ু সৈনিকেরা।

বিজ্ঞাপন

সেখানে সুদূর মার্কিন মুলুক থেকে এসেছিলেন জর্জ ট্রটার। যুদ্ধবিমানে কোনো রকম বৈদ্যুতিক সমস্যা দেখা দিলে জর্জের ডাক পড়ত। তবে তাঁর কাজের জায়গায় একটা সমস্যা ছিল। সেটা হলো, যেকোনো পরিবহনের জন্য গাড়ির খুব অভাব। বোমারু বিমানের বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত সব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব যে বিভাগের ওপর ন্যস্ত ছিল, তাদের ছিল মাত্র একটি জিপ। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে পরিবহন বা যানবাহন না থাকলে জান বাঁচানো দুষ্কর। আর তা ছাড়া শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, যন্ত্রপাতি এক জায়গায় জড়ো করে না রেখে ১৫ মাইল (২৪ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকিয়ে রাখতে হতো।

default-image

পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে সেগুলো জোগাড় করতে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হতো। অথচ বাড়তি গাড়ির জন্য আবেদন করেও কোনো ফায়দা হচ্ছিল না। তখন এগিয়ে এলেন এই জর্জ ট্রটার।

একটি পরিত্যক্ত বোমারু বিমান বি-২৫এস থেকে খুঁজে নিলেন গাড়ি তৈরির সব সরঞ্জাম। বিমান থেকে নিলেন জ্বালানি ট্যাংক, পাখা থেকে অনেকটা ধাতব অংশ, একটি হিটার এবং আরও কিছু কলকবজা। গাড়ির চাকার জন্য সংগ্রহ করলেন বিধ্বস্ত বিমানের চাকা, বিদ্যুৎ সরবরাহ করার জন্য ২৪ ভোল্টের একটি জেনারেটরও সংগ্রহ করা হলো। এই বিদ্যুৎ উৎপাদক মেশিন দিয়ে দুটি ২৪ ভোল্টের ব্যাটারিকে চার্জ করা হতো। আর ব্যাটারি দুটো থেকে আসত গাড়ি চালানোর প্রয়োজনীয় শক্তি।

বিজ্ঞাপন

সুইচের সাহায্যে একই সঙ্গে দুটো মোটর সমান্তরাল অথবা সিরিজ পদ্ধতিতে চালু করে গাড়ির গতি বৃদ্ধি করা হতো। পেছনে যাওয়ারও উপায় বের করেছিলেন তিনি। গাড়ির গতি বৃদ্ধি একক্সিলেটর এবং ব্রেক কষার পাদানি দুটো অন্যান্য গাড়ির মতোই পায়ের নাগালে রাখা হয়েছিল। বিমান থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে মোটর যাতে অতিরিক্ত উত্তপ্ত না হয়ে দীর্ঘক্ষণ চলতে পারে, তিনি সে ব্যবস্থা করেছিলেন অত্যন্ত দক্ষতায়। তা ছাড়া অন্য সব কমান্ড ড্যাশবোর্ড সুইচ, বোতাম টিপে খুব সহজেই কাজ করা যেত।

default-image

গাড়ির ড্যাশবোর্ড এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যে একজন অনভিজ্ঞ চালকও এমন গাড়ি চালাতে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। সোজা কথায়, গাড়ির ডিজাইন করা থেকে পরিত্যক্ত আর বিধ্বস্ত বিমান থেকে নেওয়া নানা যন্ত্রাংশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ করে জর্জ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত গাড়িটি ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ মাইল বেগে চলতে সক্ষম ছিল। তবে তিনি বলেছেন, ‘আমি এর সর্বোচ্চ গতিবেগ কখনোই পরখ করে দেখিনি।’

গাড়ির ডিজাইন করা থেকে পরিত্যক্ত আর বিধ্বস্ত বিমান থেকে নেওয়া নানা যন্ত্রাংশ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ করে জর্জ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত গাড়িটি ঘণ্টায় ৩৫ থেকে ৪৫ মাইল বেগে চলতে সক্ষম ছিল।

সর্বোচ্চ গতিবেগে এ যানটি ঘণ্টায় ৭৫ মাইল বেগে চলা জিপের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে জর্জ ট্রটার গাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন বলে যুদ্ধের সময় খুব সুবিধা হয়েছিল এবং কাজে গতি এসেছিল। জর্জ ট্রটার শিখিয়েছেন, প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের মুখের দিকে তাঁকিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে না থেকে বুদ্ধি আর উদ্যমকে কাজে লাগিয়ে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান করা যায়। আর প্রয়োজনই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে নতুন উপায় উদ্ভাবনের। তির-ধনুক খেলাটি জর্জ খুব পছন্দ করতেন। তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছরে তির-ধনুকসহ মোট ৬টি যন্ত্রের কৃতিস্বত্ব বা পেটেন্ট করেন।

বিজ্ঞাপন

বৈদ্যুতিক গাড়ির উদ্ভাবনের জন্য এককভাবে কাউকে কৃতিত্ব দেওয়া যায় না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্ভাবক তাঁদের বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে আরও উন্নত এবং সুসংগঠিত বৈদ্যুতিক গাড়িকে আজকের রূপ দিয়েছেন। বর্তমান সময়ে বিশ্বের বড় বড় নগরে বায়ুদূষণ একটি বড় রকমের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

default-image

বিশ্বব্যাপী মৃত্যু এবং রোগের একটি প্রধান কারণ হচ্ছে বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণ কমিয়ে এনে নির্মল বাতাসের বাসনায় উন্নত দেশগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণে অনেকখানি এগিয়ে গেছে। চালকবিহীন গাড়ি, চালকবিহীন উড়ুক্কু ট্যাক্সি এখন আর কল্পকাহিনী নয়, অনেকটাই বাস্তব। তবে এমন বিস্ময়কর উদ্ভাবনের শুরুর দিকে যেভাবেই হোক যখন বাংলাদেশের নামটি আসে, তখন আমাদের উৎসাহ এবং কৌতূহল হয় তা জানার জন্য।

মন্তব্য পড়ুন 0