বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিদেশের মাটিতে আছি এ জন্যই কি না, ঠিক জানি না। তবে সবাই মিলে যখন কোথাও ঘুরতে গিয়েছি, তখন গাড়িতে বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার গান বাজতে শুনিনি কখনো।

default-image

তাইপে আসার পর আমাদের প্রথম কাজ ছিল এলিফ্যান্ট মাউন্টেনের হাইকিংয়ের শুরুর রাস্তাটি খুঁজে বের করা। পরের কাজটি ছিল সবচেয়ে কঠিন, পাহাড় বেয়ে ওঠা। এ সময়টায় মনে একটু দুশ্চিন্তা কাজ করছিল। তখন মনে হচ্ছিল আসলেই এত উঁচুতে উঠতে পারব কি না। যখন পাহাড়ের কাছে এলাম, মনের ভয় একদম উড়ে গেল। সুন্দর করে পাথর কেটে সিঁড়ি বানানো আছে দৃষ্টিসীমার শেষ অবধি। তা ছাড়া একটু পরপর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসানো আছে পর্যাপ্ত বেঞ্চ। আরও আশার কথা হলো, অনেক ছেলেমেয়ে, এমনকি অনেক বয়স্ক মানুষও এসেছেন হাইকিংয়ের জন্য। দেরি না করে আমরাও ওপরে ওঠা শুরু করলাম। যেমনটি ভেবেছিলাম, তা হয়নি। চারপাশের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম প্রথম ভিউ পয়েন্টে। অবশ্য ততক্ষণে সারা শরীর ঘেমে একাকার।

এখানে আসার আগেই আমরা জেনে নিয়েছিলাম এখানকার দুটি পর্যটকপ্রিয় জায়গার কথা। এর প্রথমটি থেকে পুরো তাইপে শহরের প্যানর‌্যামিক দৃশ্য দেখা যায় খুব ভালো করে। আর অন্যটি হলো বিশালাকৃতির কয়েকটি পাথর, যেখানে পর্যটকেরা তাইপেই-১০১–কে পেছনে রেখে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি তোলেন। মজার ব্যাপার হলো, আমি এলিফ্যান্ট মাউন্টেনের যত ছবি পেয়েছি ইন্টারনেটে, তার বেশির ভাগই ছিল এই দৈত্যাকৃতির পাথরকেন্দ্রিক। আমরাও এই সুযোগ হারাতে চাইনি। তবে সমস্যা হয়েছিল পাথরে ওঠার জন্য স্থানীয় আর বিদেশি পর্যটকদের লম্বা সারি। সময় নষ্ট না করে আমরাও লাইন ধরে দাঁড়িয়ে গেলাম। অন্য সব বিষয়ের মতো এবার আমার ভাগ্য খুব বেশি সুপ্রসন্ন ছিল না। আমি যখন পাথরের ওপর ওঠার সুযোগ পেলাম, ততক্ষণে সূর্য অস্ত যায় যায় অবস্থা। তবু কাঁধ–ব্যাগ থেকে আমার সব সময়ের সঙ্গী পতাকাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। অনেক ভিনদেশি মানুষের সামনে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা।

default-image

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগল। দেখতে পেলাম সময় যত যাচ্ছে, ততই বাড়ছে মানুষের ভিড়। পরে জানলাম, এখানে এত পর্যটক এসেছেন মূলত রাতের তাইপে শহরকে দেখার জন্য। আমরাও অপেক্ষা করতে থাকলাম। সত্যি বলতে কি, এখানকার সন্ধ্যা কিংবা রাতের রূপ সহজে ভোলার মতো নয়। সূর্য অস্ত যেতে না যেতেই বিশাল সব তাইপে স্কাইস্ক্যাপারের হরেক রঙের বাতি জ্বলে উঠল চোখের সামনেই। অবাক হয়ে দেখছিলাম তখন। অন্ধকার যত গাঢ় হচ্ছিল, ততই যেন রাতের তাইপে শহর তার সৌন্দর্যের পেখম মেলে ধরছিল। আর পুরো শহরের মাঝখানে অবস্থিত তাইপেই–১০১–কে মনে হচ্ছিল কোনো এক বিশালাকৃতির ড্রাগন শহরের বুকে নেমে এসেছে, যার শরীর থেকে ঠিকরে আলো বের হয়ে যেন সারা শহরের আকাশকে আলোকিত করে দিচ্ছে।
আমার মনে আছে, ২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে উঁচু ভবন লট্টে টাওয়ারকে রাতের বেলা সিউলের ইথেওয়ানের পাহাড় থেকে দেখেছিলাম। কিন্তু এতটা রাজকীয় মনে হয়নি। সে ক্ষেত্রে তাইপেই-১০১ যেন সদম্ভ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জানান দিচ্ছিল। এর মধ্যে পাশ থেকে একজন মনে করিয়ে দিল আমাদের এখন নামতে হবে। ঘড়ির কাঁটায় তাকিয়ে বুঝতে পারলাম সময় কত নিমেষেই চলে গিয়েছে। আমাদের আগেই পরিকল্পনা ছিল রাতের বেলাতেই ফিরে আসব। তাই দেরি না করে পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে এলাম। ইতিমধ্যে একডেমিয়া সিনিকার বাংলাদেশি গবেষক নায়েম চৌধুরী আমাদের জন্য অ্যারাবিয়ান নাইটস নামের রেস্তোরাঁয় তৈরি করে রেখেছিলেন স্পেশাল বিরিয়ানি। রেস্তোরাঁটি দক্ষিণ এশীয় স্বাদের খাবারের জন্য বেশ জনপ্রিয়। রাতের খাওয়াদাওয়ার পর এবার তাইপে শহর থেকে বিদায়ের পালা। তবে চলে আসার আগে আইকনিক তাইপেই-১০১–এর নিচে দাঁড়িয়ে একটা সেলফি তুলতে ভুল করিনি।
ফিরে আসার সময় রাতের হাইওয়ের দুপাশের লাল-নীল বাতির আলোয় আলোকিত চার পাশকে দেখে মাথার ভেতর ঘুরঘুর করছিল, প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার কয়েকটি লাইন—

default-image

‘চোখ দুটো ঘুমে ভরে
ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে!
ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন,—স্বপন কদিন রয়!
এসেছে গোধূলি গোলাপিবরণ,—এ তবু গোধূলি নয়!’
*লেখক: এ টি এম বদরুজ্জামান (পিএচডি শিক্ষার্থী), ন্যাশন্যাল হেলথ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, তাইওয়ান।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন