তালেব আলীর অনুশোচনা

বিজ্ঞাপন
default-image

বাপ গত হওয়ার পর থেকেই আজ কত দিন হয়ে গেল দুই চোখের পাতা এক করতে পারছেন না তালেব আলী। তাই রাতের পর রাত ঘরের মধ্যে পায়চারি করেই কেটে যায় তার সময়। বউ গুলেজান অনেক পীড়াপিড়ি করেছেন ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু ডাক্তার দেখিয়ে লাভ কী? লাভ যে নাই তা তিনি খুব ভালো করেই জানেন। তার যে রোগ, সেটা সারানোর মতো ক্ষমতা কারও নেই। গুলেজান অনেকবার চেষ্টা করেছে তার স্বামীর মনের কথা জানবার। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তালেব আলী চান না, তার পরিবার তার এই কষ্টের ভাগীদার হোক। তিনি মনে করেন, এই ব্যথা বহন করার দায়িত্ব শুধু তার একান্তই একার। না ঘুমালে যা হয়। মেজাজটা আজকাল খুব খিটখিটে থাকে তালেব আলীর। কারণে-অকারণে, সময়ে-অসময়ে, বউ গুলেজান আর মেয়ে গুলফানের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেন তিনি। যা তিনি জীবনে চিন্তাও করতে পারেন না। এভাবে চলতে থাকলে পাগল হতে আর বেশি দিন সময় লাগবে না তার। হঠাৎ একদিন রাতে তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। নিজের মনে বিড়বিড় করে কী সব বলছেন। তার কোনো আগাগোড়া নেই। তিনি ভাবছেন, হায় আল্লাহ! পাগল হয়ে যাচ্ছি নাকি?

মেয়ে–বউ সবাই ঘুমে বিভোর। তার মনে হলো সে কে? তার বয়স কত? এই দুনিয়ায় সে আর বাঁচবেই বা কত দিন? পুরোনো দিনের অনেক কথাই মনের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল তার! আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে মেজাজটা তেতে গেল। নিজের বয়স নিজেই হিসাব করে অস্থির হয়ে উঠলেন তিনি! আগের দিনের মা–বাবারা কি সন্তানদের জন্মতারিখ কখনো হিসাব রাখতেন? তাদের সন্তানদের জন্মের দিনক্ষণ খুব সামান্যই তারা বলতে পারতেন! বড়জোর বলতেন, তোর জন্ম মাঘ মাসের শীতে, আর নাহয় ভরাডুবি বর্ষাকালে—এতটুকুই। তবে দাদির মুখে একবার শুনেছিল, বড় বর্ষাকালে নাকি তার জন্ম হয়েছিল। তিনি তার বয়স হিসাব করে অস্থির। হায় আল্লাহ! হাতে তো আর সময় বেশি নেই। এতটুকু সময়ের মধ্যে তিনি কী করবেন আর না করবেন। ভাবতে ভাবতে আজানের সুর ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গে কড়কড় করে মোরগের ডাক। ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। অত্যন্ত জনদরদি ভালো একটা মানুষ এই তালেব আলী। কত রাত তিনি আর না ঘুমিয়ে কাটাবেন। গুলেজান বেগম চোখ ডলতে ডলতে শোয়া থেকে উঠে বসলেন। মেয়ে গুলফানকে বললেন, ভোর হয়া গেছে, উঠ।

তালেব আলীর বয়স খুব একটা বেশি না হলেও ভাবখানা, তার বয়স অনেক হয়েছে। কপালের ওপর তিনটা ভাঁজ পড়েছে। সেই ভাঁজের মধ্যখানে গোল টিকার মতো কাল দাগ। কপালের মধ্যেখানে দেখে মনে হয় কাদা চেপে রেখেছেন। না ঘুমাতে ঘুমাতে তার মনমেজাজে সব সময় একটা খড়খড়া ভাব থাকে। গলা খেঁকিয়ে বলে উঠলেন, সকলের ঘুম কী ভাঙল? সকালে এক কাপ চা হইলে ভালো হইতো! বউ গুলেজান হুড়মুড় করে বিছানা থেকে নেমে এসে স্বামীকে বললেন, আপনে সেই কোন সকালে উঠছেন। আপনার শরীলডা ভালো তো? কত কইরা কইলাম ডাক্তার দেহান। হেইডা কানে গেল না। শোনো গুলেজান বেগম, আমার যে রোগ, তাতে ডাক্তার দেখায়া কোনো লাভ হইব না। প্যাঁচাল বাদ দিয়া এক কাপ চা আনো। তাতে যদি মেজাজখান চাঙা হয়।

গুলেজান বেগম চা এনে স্বামীর সামনে দিয়ে বললেন, হায় আল্লাহ, আপনে চিয়ার রাইখা ওই নিচা টুলে বসছেন ক্যান?

: মেয়ে মানুষের স্বভাবটাই খারাপ। খালি কথায় কথায় ফ্যাছ ফ্যাছ করা! শোনো, গুলেজান। আমি ঠিক করছি ওই চেয়ারে আর বসব না। চেয়ারখানা মেলা পুরানা হয়া গেছে। ভাবতাছি, নতুন কইরা চেয়ার বানাব।

: হায় আল্লাহ! এইডা আপনে কী কন? ওই চেয়ারখানা আপনের কত শখের! আর চেয়ারখানার ভেতরে কেমন একটা জমিদার জমিদার ভাব আছে। এই চেয়ারখান যে বানাইছিল সে কী আর এই দুনিয়ায় আছে যে আপনেরে আর একখান বানায়া দিবি?

: শোনো গুলেজান বেগম। তোমার ওই একখানা খুব বাজে অভ্যাস। খালি উকিলের মতো জেরা করা। এখন হইতেছে গিয়া মডান যুগ। এর চাইতে কত ঢকের চেয়ার বাহির হইছে সিডা তোমর জানা নাই।

: আপনে যাই কন না ক্যান, আপনের বাপজান এই চেয়ারে বইসা গ্যাছে। এখন আপনি বসতাছেন। হের পর আপনের নাতি বসব, তারপর আবার হের ছেলে বসব। আর কইব, এইখান আমার নানাজানের বাপের চেয়ার!

তালেব আলী খাতা–কলম নিয়ে হিসাব করতে বসলেন। তার বাপের আমলের কী কী আছে তার একটা তালিকা করে ফেললেন। কাঁসার বাসনকোসন, চেয়ার-টেবিল, খাট-পালং আর এই ভিটেমাটি। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন বাপের রেখে যাওয়া কোনো জিনিসপত্র তিনি আর ব্যবহার করবেন না। যথেষ্ট হয়েছে, বাকি জীবনটা তিনি শান্তিতে কাটাতে চান। বাপের এই পাপ থেকে মুক্তি না পেলে তিনি বেশি দিন বাঁচতে পারবেন না। তাই তিনি ঠিক করলেন এই সমস্ত জিনিসপত্র গরিব মানুষের মধ্যে দান করে দেবেন। তার বাপের রেখে যাওয়া সমস্ত কিছু থেকে তিনি মুক্তি পেতে চান। বাপের জীবনের কথা ভেবে তার দুই চোখের ঘুম হারাম। তার কেবলি মনে হয় এই বুঝি তার বাপের মতো, তার গা দিয়েও কিলবিল করে পোকা বের হচ্ছে! তার বাপের মৃত্যুর সময় যে পরিণতি হয়েছিল, তিনি তার নিজের জীবনে চান না।

এমন সময় মেয়ে গুলফান বাবার দিকে শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলল, বাবা, এই যে তোমার শরবত।

শরবতের গ্লাস চোখে পড়তেই তার ছোটবেলার বন্ধু পরিমলের কথা মনে পড়ে গেল। পরিমলের বাড়ি গেলে পরিমলের মা অনু মাসি ঠিক এই রকম কাঁসার গিলাসে করে কুসুরের রস খেতে দিতেন। বাড়ির সব কাশার বাসনপত্র দেখলে তার মনে হয়, এই বাসনপত্রগুলো তার চোখে আঙুল দিয়ে বলছে, আমাদের মালিক তুমি না! আমাদের মালিক হইল গিয়া পরিমল, গৌরী, বাকচি, দেবাশিস! তিনি মেয়েকে বললেন, শোন মা, আজকালকার যুগে কেউ আর কাঁসার বাসনকোসন ব্যবহার করে না। যাও, তোমার মারে কও আইজ থিক্যা চীনামাটির বাসনকোসন ব্যবহার করতি। যাও, এই গিলাস আমার সামনে থিক্যা নিয়া যাও! তোমার মা জানি লেখাপড়া সামান্য করছেন। কিন্তু তুমি তো লেখাপড়া ভালোই করতেছ! যাও, কাচের গিলাসে কইরা শরবত নিয়া আসো।

: হ বাবা, তুমি ঠিকি কইছ! আমার বান্ধবী মণি, ওগের বাড়ি দেখছি চীনামাটির বাসন।

: যাও, গিয়া তোমার মারে বোঝাও! তারে কিছু কইলেই, খালি উকিলের মতো জিরা করে। ভাগ্যিস লেখাপড়ার দৌড়ও খুব একটা বেশি না! থাকলি যে তোমার মা কী করত আল্লাহ পাকই জানেন।

: বাবা, তুমিও তো বেশি লেখাপড়া কর নাই। কিন্তু দেখো, তোমার কত বুদ্ধি। মা আর তোমার বুদ্ধি আছে বইলাই তো আমি লেখাপড়ায় এত ভালো। দেখ না? মেলা লেখাপড়া জানা মানুষের পোলাপানের মাথায় কিছুই নাই। খালি গোবর ভরা। আমার মারে, তুমি এসব কইবা না। আমার মা অনেক বুদ্ধিমতী। আসলে বাবা, সত্যি কইরা কইবা, তোমার কী হইছে? মা কইতেছে, তুমি নাকি আজকাল চেয়ারে বসতেছ না। আর কী সব ভাবতেছ? কাঁসার বাসনকোসন দুই চোখে দেখতি পার না! এই সব নিয়া মা খুব চিন্তায় আছে।

: বেশ তো, তোর মায়ের তো খায়াদায়া কাম নাই। তাই চিন্তা করা ছাড়া তার আর আছে কী?

গুলফান ভেতরে গেল বাবার জন্য শরবত আনতে। বাপ আর মেয়ের সব কথা শুনে গুলেজান বেগম তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল।

: কী, আপনে এত দূর কথা কইবার পারলেন। মুখে যাই আসতেছে তাই কইতেছেন! আপনের সংসারের ঘানি টানতে টানতে এতডা বছর পার করলাম। আর আপনে কিনা?

: শোনো গুলেজান বেগম, মন খারাপ কইর না। ভুল হইছে। আমার আজকাল মনমিজাজ ভালো থাকে না। তাই কী কইতে কী কইয়া ফালাই! শোনো, তুমি ওই সমস্ত পুরানা বাসনকোসন ফালাইয়া দেও। আমি তোমারে সব নতুন কইরা কিনা দিব।

কথা বলতে বলতে মোবারক নামের ছেলেটি ভ্যানগাড়ি বোঝাই করে নতুন মালসামান এনে হাজির হলো। তালেব আলী তার বউকে বলল, নাও, এখন থিক্যা ওই পুরানা জিনিসপত্র জানি আমার চোখে আর না পড়ে। গুলেজান বেগমের চোখ ছানাবড়া। হায় আল্লাহ! মানুষটা কী সত্যি সত্যি পাগল হয়া গেল নাকি? হায় আল্লাহ! এই পাগলের মাইয়ারে কিডা বিয়া করব? হায় আল্লাহ! ইডা আবার কোন বিপদ আসতেছে! একমাত্র তুমিই জানো আল্লাহ!

মেয়ে গুলফান খুশিতে অস্থির। মা, ওমা দেখছ, বাবা কত নতুন হাঁড়িপাতিল থালাবাসন কিনছে। মা বলল, হ, হেইডাই আমার বড় চিন্তা! যে মানুষ একটা কিছু আনতে কইলে খরচপত্রের ভয়ে ভুইলা যায়। আর সেই মানুষ কিনা হাত খুইল্যা সমানে খরচ করতেছে। ওই গুলফান তোর বাবার দিক খেয়াল রাখিস। মতিগতি আমার একদম ভালো ঠেকতেছে না!

: মা, তুমি অযথাই চিন্তা করতেছ! মানুষ কী চিরজীবন এক রকম থাকে। আমার মনে হয় বাবা বদলাইছে। এত কিপটামি কইরা আর হবি কী?

: তুই তোর বাবারে নিয়া যাই কস, আমার কাছে সমস্ত কিছুই কেমন এলোমেলো মনে হইতেছে। তোর বাবা নাকি এ বাড়িতে আর থাকব না। সে নাকি নতুন করে বাড়ি বানাইব। এত সুন্দর বাড়ি কত শখ কইরা তোর বাবা ফলের গাছ গুলান লাগাইছে। বাড়িতে দুই দুইডা পুকুর ভরা মাছ। এই গ্রামের মধ্যে এই রকম একখান বাড়ি নাই।

তালেব আলী তার বউকে বলল, পুরোনো খাট পালং বাসনকোসন, সেই আমলের যা কিছু আছে, সব গরিব মানুষের দিয়ে দিতে। বিশেষ করে কাঁসার বাসনকোসন দেখলে তার দম বন্ধ হয়ে আসে।

তার বউ বলল, আচ্ছা দিতাছি। আপনে ঘরে যান। গুলেজান স্বামীর মতিগতি দেখে তিনি তার শাশুড়ির আমলের ভালো ভালো কিছু জিনিস আগেই সরিয়ে রেখেছেন। গুলেজান বেগম তার সংসারের সমস্ত শখের জিনিসপত্র মোবারক নামের ছেলেটির ভ্যানগাড়িতে তুলে দিলেন। তিনি মনে মনে বললেন, সেই আমলের জিনিসপত্র এখন বাজারে খুঁজলেও মিলবে না।

স্বামীর প্রতি রাগ–দুঃখ নিজের ভেতরে রেখে বললেন, বাড়ির সবকিছু যায় যাক। মানুষটা জানি ভালো থাকে। মোবারক বলল, চাচি, ওই যে জামবাটি আর অন্য সব দিবেন না?

গুলেজান বলল, তোর চাচারে কিছু কওনের দরকার নাই, বুঝছস?

: হ, চাচি বুঝছি! চাচা জিজ্ঞাসা করলি কবানি, চাচি সব দিয়া দিছেন, তাই তো?

গুলফান বলল, মা–বাবা যহুন ওই সব কাঁসার বাসনকোসন পছন্দ করে না, দেও না ফালাইয়া, সমস্যা কী? গুলেজান মেয়ের ওপর রাগ করে বলল, সমস্যার তুমি কী বুঝবা? তোমার বাপ তো হইছে ক্ষণিকের পাগল। দুই দিন পরেই দেখবা সব ঠিক হইয়া গেছে। কিপটার কিপটা। আমার হইছে যত জ্বালা!

: মা, আমার মনে হয় বাবা ঠিক আছে! একজন ভালো মানুষরে পাগল কওয়া ঠিক না? মা, তুমি খেয়াল করছ! বাবা পরান দাদাগো বাড়ি থিক্যা আসার পর, কেমন বদলায়া গেল! মানুষের দোষ দিয়া তো লাভ নাই। পরান চাচারে আমি খুব ভালো কইরা চিনি। তিনি খুব ভালো একজন মানুষ।

: আসলে তোর বাপের ভিমরতি ধরছে।

: মা, আমি তো শুনছি, পরান দাদা নাকি আমার দাদারে পছন্দ করতেন না। তারা দুইজন ছোটবেলার বন্ধু। তাও উনারা একজন একজনের সাথে কথা কইতো না!

তালেব আলী গেল হারাধন কাকার বাড়ি।

: কিডারে, তালেব নাকি রে! কিমুন আছ বাবা।

তালেব বলল, এই তো কাকা ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন?

: এই তো রে বাবা। ভগবানের আশীর্বাদে চইলা যাইতেছে একরহম।

হারাধনের ছেলে নিমেশ আর তালেব আলী, দুজন ছোটবেলার বন্ধু। তালেব বলল, কাকা, নিমেশ কেমন আছে। ওরে কত দিন দেখি না। ও কি, গাঁওগেরামে আসা ছাইড়া দিছে? হারাধন বলল, নিমেশ তো এখন ম্যালা বড় ডাক্তার হইছে! ফোন করলে সব সময় তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে। বড় ডাক্তার হইছে তো, হাতে সময় খুব কম। তয় কইছে, সামনে পূজায় আসবে। আমাগের ওপর নিমেশ একটু রাগ হইছে। ও চায়, আমি আর তোমার কাকিমা ওর ওখানে গিয়া থাকি। ওই দালানকোঠা ইট-পাথরের বাড়ি কী আর আমাগো পুষায়! বাকি জীবনটা আমি আর তোমার কাকিমা এই খোলামেলা বাড়ি আর পাকপাখালি নিয়েই কাটাবার চাই। আর মরলে, নিজের ভিটেমাটিতেই মরতে চাই।

: কাকা, নিমেশের কয় ছেলেমেয়ে?

: ওই তোমার মতন তারও একটিমাত্র মাইয়া! তুমরা ছোটবেলা কত ভালো বন্ধু ছিলা! দুইজন একসঙ্গে ইসকুলে যাইতা! তুমি আমাগো বাড়ি, নয়তো নিমেশ তোমাগো বাড়ি যাইয়া থাকত।

: কাকা, আমার সব মনে আছে। নিমেশের ফোন নম্বরটা আমারে দিয়েন। আমি ওর সাথে দেখি কথা কব। কাকা বাড়ি আইসেন। আর নিমেশ দূরে থাকে, তাতে কি? আমি তো আছি। যেকোনো কিছুর দরকার হইলে আমারে জানাবেন। আর কাকিমারে দেখতেছি না যে!

হারাধন মনে মনে বলে, দুগ্গা, দুগ্গা! সবি ভগবানের ইচ্ছা। কী বাপ আর কী তার ছাওয়াল! বাপ আছিল একটা জালিম। ছেলেডার আদবকায়দা কত ভালো। এমন কইরা ডাক দেয় মনডা ভইরা যায়। মনে হয় তালেব আর নিমেশের মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই!

গুলফান তার বাবাকে খেতে ডাকল। ও বাবা, খাইতে আসো। মা ডাকতেছে। গুলেজান পুকুরের বড় রুই মাছ, গুঁড়া মাছ, আরও অনেক কিছু রান্না করেছেন। পুকুরের মাছই তাদের বিক্রি হয় লাখ লাখ টাকা। আজকে জেলেরা এসেছিল মাছ তুলে নিতে। তালেব মিয়া বরাবরই একটু কৃপণ স্বভাবের। কিন্তু খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে সব সময় উদার। জেলেরা মাছ ধরতে এলে তা থেকে সবচেয়ে সরেস মাছখানা বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। খেতে বসে তালেব তার মেয়েকে বলল, ও মা গুলফান! তোমার মায়রে বল, তোমার হারাধন দাদারে আর পরান দাদারে বড় মাছের তরকারি পাঠাইতে। বাড়িতে ভালো কিছু রান্নাবান্না হলেই তালেব আলী তার বাপের বয়সী গ্রামের দুজন চাচাকে রেখে খান না। মেয়ে গুলফান তার বাবাকে বলল, বাবা–মা আগেই বাটিতে তুইলা রাখছে। মা জানে তুমি দাদাগো রাইখা ভালো কোনো কিছু খাও না! গুলেজান বেগম মেয়ের হাতে তরকারি দিয়ে বলল, যা, তোর দিদিমার হাতে দিয়ে আয়।

গুলফান তরকারি নিয়ে গেল হারাধনের বাড়ি। দিদিমা, ও দিদিমা! মা তরকারি পাঠাইছে।

: ওই দিদি, তোর মারে কত কইরা কইলাম এত তরকারি না পাঠাইতে। আমরা মোটে দুইজন মানুষ। তা ছাড়া আমিও মাছের তরকারি রানছি।

: দিদিমা, তুমি প্রতিদিন একই প্যাচাল পাড়ো ক্যান? তুমি তো ভালো কইরাই জানো, বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হইলে বাবা দাদারে ছাড়া খায় না!

: হরে দিদিভাই। তা তো জানি, তোর বাবা আমাগো তার মা–বাবার মতন ভক্তি করে! তোর মায় তরকারি পাঠাইলে তোর দাদা খালি হেইডাই খায়। আর আমার রান্না তরকারি নষ্ট হয়। তোর মায়ের হাতের রান্না খুব ভালো।

হারাধন বাড়িতে ঢুকতেই গুলফানের সঙ্গে দেখা!

: কিডারে আমার দিদিভাই নাকি! ও দিদি তুমি কেমন আছ?

: এই দেখ গুলেজান তোমার দিদির হাতে তরকারি পাঠাইছে।

: কী পাঠাইছে? বড় মাছের তরকারি?

হারাধন বউকে বললেন, নিমেশ আর তালেবের জন্যি যে আচার বানাইছ সেইডা দিতে ভুইল না কিন্তু! ও দিদি গুলফান, তোমার দিদিমার কাছ থিকা আচারের বয়োম নিতি ভুইল না। তার আবার ইদানীং কোনো কিছু মনে থাকে না। দেখি দুই একদিনের মধ্যে নিমেশের কাছে আচার পাঠাবার ব্যবস্থা করা লাগবি।

নিমেশের মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, আহারে ছোটবেলা নিমেশ আর তালেব দুইজন কত কাড়াকাড়ি কইরা আচার খাইত। তার স্বামীকে বলল, তোমার মনে আছে গো, নিমেশের বাবা? হারাধন বললেন, মনে নাই, আবার সব মনে আছে! নিমেশের মা আবার বললেন, মনে হয় এই তো সেই দিনের কথা। সময় কত তাড়াতাড়ি পার হইয়া যায়!

গুলফান বলল, দিদিমা নিমিতা কেমন আছে? ওরা বেড়াতে আসবি না? ওগের কত দিন দেখি না!

: ভালো আছে তোমার মতোই ডাঙর হইছে! ফোনে কথা হইলেই নিমিতা খালি তোমার কথা জিজ্ঞাসা করে! ভাবছি আবার যখন শহরে ওগের বাসায় যাব, তোমারে সাথে কইরা নিয়া যাব।

এখন আর তালেব আলীর বাড়িতে কাশার বাসনকোসন দেখা যায় না। পুরোনো চেয়ার সরিয়ে নতুন চেয়ার বসেছে। ঘরের খাটপালংয়ের পরিবর্তে নতুন খাটপালং বসেছে। এখন শুধু এই বাড়িটা তার মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। বাড়ি তো আর চেয়ার–টেবিল নয়, চাইলেই সরিয়ে নতুন বসিয়ে দিবেন। কেন সে এ বাড়িতে থাকতে চান না​, সেটা তিনি তার নিজের বউ গুলেজান বেগমকে খুলে বলতে পারছেন না। নিজের ইতিহাস গুলেজানকে কোন মুখে বললেন। গুলেজানের বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা! তার কাছে নিজের বাবার এসব কথা তালেব কী করে তার বউ গুলেজানকে বলবে। তা সে কোনো দিন বলতে পারবে না! কারও সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ না করলে শিগগিরই তিনি দম ফেটে মরে যাবেন! তাই তিনি ঠিক করলেন হারাধন কাকা আর পরান কাকার সঙ্গে আলাপ–আলোচনা করতে হবে! উনারা তার বাবার একসময় খুব ভালো বন্ধু ছিলেন।

এদিকে গুলেজান তার স্বামীর আচার–আচরণ দেখে খুব চিন্তিত। ভেবে কুল পাচ্ছেন না, তিনি কোথায় যাবেন, কী করবেন বা কার সাথে আলাপ করবেন! বাপ–দাদার আমলের কত ভালো ভালো জিনিসপত্র ফেলে দিয়েও মানুষটার মন ভরে নাই। মানুষটা পাগল হয়ে যাচ্ছে কিনা কে জানে? সবকিছু ফেলে দিয়েও সাধ মিটে নাই। এখন এই বাড়িটির পেছনে লেগেছে। কি এমন হলো মানুষটার। গুলেজান কোনো কিছুই ভাবতে পারছেন না। গুলেজানের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মানুষটা কত দিন হয়ে গেল একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে। কত হইহুল্লোড় করতে পছন্দ করত। মাঝেমধ্যেই দেখা যেত হারাধন কাকা, কাকিমা আর ওদিকে পরান চাচা আর চাচি আম্মাকে দাওয়াত করতেন আর বলতেন গুলফানের মা ভালোমন্দ রান্নাবান্না কর, আজকে হারাধন কাকা আর পরান চাচাকে দাওয়াত করেছি। গুলেজানের মাথায় একমাত্র হারাধন কাকা আর পরান চাচার কথাই ঘুরপাক করছে। গুলফানের বাপ একমাত্র এই দুইজন মানুষের কথাই শোনেন। গুলফানের দাদি মারা যাওয়ার পর থেকে এরাই মানুষটার অভিভাবক। এনারাও গুলফানের বাপকে ছেলের মতন স্নেহ করেন। গুলেজান তার মেয়ে গুলফানকে বাড়িতে রেখে হারাধন কাকার বাড়ির উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল! মেয়ে গুলফান বলল, মা আমিও তোমার সাথে যাব! গুলেজান মেয়েকে সঙ্গে নিলেন না! মেয়ের সামনে তিনি অনেক কিছুই আলাপ করতে পারবেন না তাই। মেয়েকে বললেন, তোমার বাবা যেকোনো সময় বাড়ি ফিরবেন, তাই তুমি থাক!

গুলেজান বেরিয়ে পড়লেন। কাকিমা ও কাকিমা বাড়ি আছেন?

: কিডারে, মা গুলেজান নাকি? আইসো মা, বুড়া মানুষের ঘরে না থাইকা আর যাব কই। তুমি তো অনেক দিন আমাগের দেখতি আসো না মা? তোমার হাতের তরকারি খাইতেছি সব সময়। কতবার ভাবি যে তোমারে একবার দেইখা আসি। আজ যাই, কাল যাই কইরা আর হয়া ওঠে না! তা ভালো আছ তো মা? তোমার মুখখানা কেমুন শুকনা মনে হইতেছে। তোমার মুখ দেইখা মনে হইতেছে তুমি কিছু কইবা। তালেব বুঝি তোমারে কিছু কইছে?

: না কাকিমা, সে রকম কিছু না! কাকিমা, কাকা মশাই বাড়ি নাই?

: তোমার কাকা তো বাড়ি নাই, ক্যান? তারে কিছু কইবা? গুলেজান তোমারে খুব অস্থির অস্থির মনে হইতেছে।

কাকিমার পীড়াপিড়িতে গুলেজান তার স্বামীর সমস্ত কিছু খুলে বললেন।

: না মা, যা শুনলাম, এডা তো খুবই চিন্তার কথা! তোমার কাকা বাড়ি আসুক, আমি বলবনি তালেবের সাথে কথা বলতি। তুমি বাড়ি যাও, কোনো চিন্তা কইর না! তালেব তোমার কাকার কথা খুব মানে।

এরপর গুলেজান ছুটে গেলেন পরান চাচার বাড়ি। তিনি বাড়ি না থাকায় গুলেজানকে বাড়ি ফিরে আসতে হলো। গুলেজানের খুব কষ্ট হচ্ছে তার গোছানো সংসার, তার শখের কত কিছু ঘর থেকে নেমে গেছে। গুলেজান যেদিন প্রথম এই বাড়িতে বউ হয়ে আসে, তার শাশুড়ি তাকে ঘর দেখিয়ে বলেছিলেন, বউমা, এইটা তোমার ঘর। ঘরের মধ্যে যে পালংখানা ছিল, দেখার মতো। শাল কাঠের কারুকার্য করা। এই যুগে ওই রকম পালং কেউ বানাতেই পারবে না। সেই পালংয়ে তার বাসর হয়েছিল। আজকে সেই পালংখানাও ঘর থেকে নেমে গেছে। গুলেজান রাগে, দুঃখে, ভয়ে এখন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। চিন্তায় তার দম বন্ধ হওয়ার দশা! মানুষটার হঠাৎ কইরা কী যে হইল? শাশুড়ির আমলের লেপ–কাঁথা রাখার বাক্সটাও ঘর থেকে বের করে বাইরে ফেলে রেখেছে। ওটাও সে রাখবে না। গুলেজান কিছু কিছু ছোটখাটো জিনিসপত্র সামলে রেখেছেন। ওগুলো হঠাৎ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারির আর সীমা থাকবে না। তাই গুলেজান তার বাপের বাড়ি খবর পাঠিয়েছেন, তার ছোট ভাইকে আসতে। পারলে কিছু জিনিসপত্র তার বাপের বাড়ি পাঠাবেন তিনি। কিন্তু ছোট ভাই না এসে এসেছেন তার বড় ভাই। গুলেজান তার বড় ভাইকে দেখে খুশি হওয়ার পাশাপাশি, কিছুটা চমকেও গেলেন। গেলবার বড় ভাইয়ের কারণে গুলেজানের সংসারে অনেক অশান্তি হয়েছিল। ওদিকে মামাকে পেয়ে গুলফান মহাখুশি!

: কীরে, খবর দিছস ক্যান? তোর মুখ দেখে তো ভালো ঠেকতেছে না? গুলেজানের ভাই ঠাট্টা করে বলল, তালেব কি এখনো আধা পাগল আছে, নাকি ফুল পাগল হয়ে গেছে? কীরে গুলফান, কেমন আছ, মা। তোমার বাবা নাকি কিসব পাগলামি শুরু করছে?

: মামা, কী যে কন? বাবা পাগল হবি ক্যান?

: তোমার আব্বাজানের কাণ্ডকারখানায় তোমার আম্মা জানের ধারণা, তোমার আব্বাজান আধা পাগল থেকে এখন আস্তে আস্তে ফুল পাগলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমি আসার সময় তো তালেবের সাথে দেখা হলো, আমার তো সে রকম কিছুই মনে হলো না? তবে আমি যখন এসেই পড়েছি, তোমাদের আর কোনো চিন্তা নাই। সমস্ত কিছু আমার ওপর ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাক বুঝলা।

: মামা, আমার বাবার কিছুই হয় নাই। আপনার বোন অযথাই চিন্তা করে। আমার বাবা পুরাপুরি সুস্থ একজন ভালো মানুষ, তাকে পাগল বলা ঠিক না!

: চিন্তা নাই মানে? চিন্তা অবশ্যই আছে। চিন্তা না থাকলে আমি শুধু শুধু এখানে এলাম কেন?

গুলেজান ভাইকে দেখে তার আবেগ ধরে রাখতে পারল না। ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে মুখ ভাসিয়ে ফেলল!

: ভাইজান, আমি কী করব? কিছুই বুঝতে পারতেছি না! ঘরের খাটপালং, ঘটিবাটি, চেয়ার–টেবিল—সবকিছু গুলফানের বাবা বিলায়া দিছে। আমার সংসারে কত শখের জিনিসপত্র ছিল, এখন কিছুই নাই। আমার কাছে সবকিছু কেমন যেন উল্টাপাল্টা মনে হইতেছে।

: গুলেজান তুমি চিন্তা কর না বোন? আমার কাছেও কিছুটা খটকা মনে হচ্ছে। তালেবের ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে কবে না জানি তোকেও বদলে ফেলে!

গুলেজানের কান্নাকাটি আরও দুই গুণ বেড়ে যায়। হায় আল্লাহ, ভাইজান আমার কী হইব! ভাইজান আপনের কি সত্যি সত্যি তাই মনে হইতেছে? ভাইজান, এইডা আপনে কী শুনাইলেন! আমি তো কোনো দিন ভাইবা দেখিনি, আমার এই পরিণতির কথা!

(বাকি অংশ আগামীকাল দেখুন)

ডিনা চৌধুরী: মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া। 

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন