যুগে যুগে দেশে দেশে শিক্ষা মানুষের মনন বিকশিত করে মানুষকে সত্যিকার মানুষ হিসেবে যেখানে গড়ে তুলেছে, সেখানে আমাদের দেশে শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-চাষা, জ্ঞানী-মূর্খের মানদণ্ড। যাঁরা লেখাপড়া জানেন, তাঁরা—যাঁরা লেখাপড়া জানেন না, তাঁদের চরম অবজ্ঞার দৃষ্টিতেই দেখে থাকেন এবং তাঁদের জন্য কিছু বিশেষণও নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এতে অবশ্য লেখাপড়া না জানা ব্যক্তিদের তেমন কিছুই আসে যায় না। শিক্ষিত মানুষগুলো এ শিক্ষাকে পুঁজি করে সমাজের সব ক্ষেত্র নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে নিয়েছেন এবং তাঁদের নিজেদের মতবাদকে সিংহভাগ অশিক্ষিত মানুষের মতবাদ হিসেবে প্রচার করছেন। যেমন একদল বলছে দেশের মানুষ নাস্তিকদের বিপক্ষে, আবার একদল বলছে, না, দেশের মানুষ আস্তিকদের বিপক্ষে। এক দল বলছে, দেশের মানুষ একমুখী শিক্ষার পক্ষে। অন্য দল বলছে, না, দেশের মানুষ বর্তমানে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে। এক দল বলছে, দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। অন্য দল বলছে, না, দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে। এ নিয়ে অবিরাম চলেছে কাদা ছোড়াছুড়ি। কিন্তু কেউ দেশের মানুষের মনের কথাটা আর জানতে চায় না।

দেশের সমাজে শ্রেণিব্যবধানটা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সেটা ভেদ করে অন্য শ্রেণির মানুষের জীবনাচরণ জানার বা দেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। যাঁরা বেশ কয়েক পুরুষ ধরে শিক্ষিত, তাঁদের বংশধরেরা কখনোই জানতে পারবে না যে দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী এখনো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। তাঁদের চিন্তাভাবনা একেবারেই আলাদা। এমনকি যাঁরা মাত্র এক পুরুষ বা দুই পুরুষ ধরে শিক্ষিত, তাঁদের অবস্থা আরও সঙিন। তাঁদের চেষ্টাই থাকে যেন ভদ্র সমাজ কোনোভাবেই বুঝতে না পারে যে তাঁরা এইমাত্র চাষা শ্রেণি থেকে শিক্ষিত শ্রেণিতে উন্নীত হয়েছে। তাই তাঁদের শিক্ষিত জীবনাচরণ কিছুটা দৃষ্টিকটু দেখায়। যা–ই হোক, এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যখন বুঝতে পারে যে দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অংশ এখনো চিন্তাভাবনায় অনেক পিছিয়ে, তখন তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে না, বরং তারা খুশিই হয়। তারা মনে মনে বলে, আমি আগেই বলেছিলাম না, চাষাদের কাছ থেকে কখনোই ভালো কিছু আশা করা যায় না। এরপর শুরু হয় তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এবং চলতে থাকে নতুন কোনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় তৈরি না হওয়া পর্যন্ত। এই যে শিক্ষিত সমাজ অশিক্ষিত বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তুচ্ছ–তাচ্ছিল্য করে, এটাতে কিন্তু চাষাদের তেমন কিছুই যায় আসে না। কারণ, তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের জীবনে এটা নিয়ে ভাবার মতো সময় থাকে না। সারা দিন দিনমজুরি করে কোনোরকমে তিন বেলার আহারের সংস্থান করতেই তাদের নাভিশ্বাস ওঠে।

default-image

এরপর যেখানে কাইত, সেখানে রাইত তাঁদের। তারা সেই ভদ্র সমাজের ভাবনা জানবেই বা কীভাবে! পেপার-পত্রিকা পড়ার মতো শিক্ষা বা আর্থিক সংস্থান থাকলে তো! ছেলেমেয়েরা কোনোমতে এক–দুই ক্লাস পড়ে নিজের নামটা দস্তখত করতে পারে, সেটাই অনেক। আর তারা তাদের জীবনের কষ্টকে নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছে, তাই তারা কখনোই শিক্ষিত লোকদের জিজ্ঞেস করতে আসবে না যে বিদেশ থেকে তাদের গরিবিকে পুঁজি করে যে কোটি কোটি ডলার ঋণ আসে, সেটা যায় কাদের কাছে! এত ঋণের পরও তাদের কেন দারিদ্র্য ঘোচে না! তারা হয়তো জানেও না, তাদের অপুষ্টিজনিত যে শিশু আজ জন্ম নিল, সে–ও জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মাথার ওপর এক বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নিয়েছে।

শিক্ষিত শ্রেণির জীবনাচরণে কত ধরনের সমস্যা। তাদের কোনো কিছুই ভালো লাগে না। তাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো খাচ্ছে না। ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো পড়ছে না। তারা কেন ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে না! এরপর কেন ভালো চাকরি পাচ্ছে না! আরও উন্নতির জন্য কেন দেশের বাইরে যেতে পারছে না! সংগীত, কলা সব শিখতে হবে, তা না হলে ছেলেমেয়ে তো চাষাই থেকে যাবে, পরবর্তী সময়ে গর্ব করবে কী নিয়ে! নিজেদের শরীর দিনে দিনে ভারী হয়ে যাচ্ছে, সেটা ঠিক রাখার জন্য কসরতের শেষ নেই। আর এই সব নিয়ে ভাবতে ভাবতে তাদের মানসিক বিকার দেখা দিচ্ছে। এরপর তারা যাচ্ছে বিভিন্ন মানসিক ডাক্তারের কাছে, ইয়োগার ক্লাসে। কিন্তু কোনো চাষার জীবনে এই সব সমস্যা তৈরি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তার শুধু একটাই চিন্তা—পরের বেলার খাবার জোগাড় করতে হবে। না হলে আগের বেলার মতোই তাদের উপোস করে কাটাতে হবে। দিনে দিনে শিক্ষা এবং তার সরঞ্জামাদি এতই বেশি দামি হয়ে যাচ্ছে যে আগের প্রজন্মের মতো ছেলেমেয়েকে শিক্ষিত করার দুঃসাহস তারা দেখাতেই ভয় পাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোয় রাষ্ট্র নিজে দায়িত্ব নিয়ে ধনী–গরিবের জীবনমানের একটা সাম্যাবস্থা বজায় রাখছে, তাই তাদের তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে গেলেও এর বাস্তব চিত্র কিন্তু ভয়াবহ।

তবে সেই দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যখন পৃথিবীর খেটে খাওয়া মানুষগুলো তাদের এক বেলার অন্নের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, ভেঙে ফেলবে শিক্ষিত সমাজের নিজেদের অহমিকায় তৈরি তাসের ঘর। পথে পথে থাকবে খেটে খাওয়া মানুষের পিঁপড়ার সারি, তার মধ্যে শিক্ষিত মানুষের মতো কোনো নেতা থাকবে না। তাঁদের কোনো নেতার দরকারও হবে না, কারণ তাঁরা সংখ্যায় অনেক অনেক বেশি হবে। সবাই নিজ নিজ তাগিদে, পেটের ভাতের তাগিদে এগিয়ে যাবে সামনের দিকে।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন