বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যেমন কয়েক দিন আগে ফুটবল খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রেস কনফারেন্সের টেবিল থেকে কোকাকোলার দুটি বোতল সরিয়ে পানি টেনে নিয়েছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে বিশাল অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলে কোকাকোলা কোম্পানির ওপর। রোনালদোর এমন কাণ্ডের পর কোকাকোলার বোতলের পাশাপাশি সেভেনআপের বোতল সরিয়ে রাখার অনুরোধ করেছে অনেকে।

এ ঘটনার পর পরিষ্কার বোঝা গেল, একজন ব্যক্তির ক্ষমতা কত হতে পারে। একবার আমার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফ্রেড হাসান শেয়ারবাজারের একটি কনফারেন্সে কিছু বলতে হঠাৎ হাঁচি দেন, সঙ্গে সঙ্গে ফাইজার স্টক ফল করে, (ফ্রেড আমেরিকা থেকে সরাসরি ফ্লাই করে সুইডেনে এসেছেন, হঠাৎ প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে তাঁর সর্দি–কাশি হয়। ফলে তিনি কিছুটা অসুস্থ হন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হঠাৎ হাঁচি দেন)। ক্ষমতা কাকে বলে বা নামের মূল্য কত! আবার অনেক নাম রয়েছে, যাঁরা সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন, তা সত্ত্বেও তাঁদের মানুষ বলে গণ্য করতে অনেকে অস্বীকার করে—এমন নজিরও রয়েছে। ব্যক্তির ক্ষমতা নির্ভর করে তার কর্মের ওপর। এখন সব সময় উচ্চশিক্ষার কারণে ক্ষমতা পাওয়া সম্তব, তা–ও সঠিক নয়। তবে অঢেল শিক্ষা থাকলে সমাজের বড় বড় পোস্ট দখল করা সম্ভব। বড় বড় পোস্টে কাজ করা মানে অনেক দায়িত্ব, অনেক সুযোগ-সুবিধা। এসব দায়িত্ববান ব্যক্তির পক্ষে ভালো–মন্দ সবই করা সম্ভব। ভালো কাজে খ্যাতি, মন্দ কাজে বদনাম—এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—এমনটি ধারণা নিয়ে সমাজে বসবাস করছি।

কিন্তু শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ডকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে বা ফেলে, সেটা কখনো ভেবে দেখিনি। সমাজের সব ধরনের গুরুদায়িত্বে যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁদের ব্র্যান্ড নেম রয়েছে, যেমন ধরুন, অর্থমন্ত্রী বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইত্যাদি। তাঁদের শিক্ষার অভাব নেই, অথচ যদি কর্মের ফলাফল দুর্নীতিযুক্ত হয়, তাহলে কী দাঁড়াল বিষয়টি? আবার ধরুন, সমাজে অতি সামান্য শিক্ষায় শিক্ষিত বা পুথিগত বিদ্যা নেই বললেই চলে, এমন লোক রয়েছে, যাঁর তেমন খ্যাতি নেই। সে হতে পারে মুচি বা মেথর অথচ সমাজের ছোট কাজটি সঠিকভাবে পালন করে সমাজকে দূষণমুক্ত করে এবং সুন্দর পরিবেশ দিচ্ছেন। তাহলে শিক্ষা হচ্ছে জেনেশুনে বিষ পান করার মতো। সে ক্ষেত্রে শিক্ষিত লোকের নৈতিকতার অধঃপতনের পেছনে তাঁর শিক্ষা দায়ী।

আমার কাছে কী কাজ, সেটা বড় কথা নয়, কীভাবে কাজকে বিবেচনা করা হয়, কীভাবে কর্মীদের ট্রিট করা হয়, কী তাদের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা, অসুস্থ হলে কে তাঁদের দায়ভার নেবে, রিটায়ারমেন্টে গেলে কী হবে, সমাজের চোখে তাঁদের মর্যাদা কোথায়, এসব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নিজেকে ব্র্যান্ড নামে প্রভাবিত করে কী লাভ যদি সমাজকে নোংরায় ভরে রাখা হয়। সমাজে যে নোংরা পরিবেশ প্রতিদিন তৈরি করা হয়, কে পরিষ্কার করে? যদি বলি, সুইপার সমাজের একটি বড় ব্র্যান্ড নেম, সবাই হঠাৎ চমকে উঠবে, এমনকি রেগে আমাকে গালিগালাজ করবে। পরে বলবে, আমার মাথায় সমস্যা আছে ইত্যাদি। ভাবুন নিজের পেট ভরা বর্জ্য অথচ সমস্যা নেই। পেট থেকে বর্জ্য বের হওয়ার পর নিজের বর্জ্যের পাশে কেউ থাকতে চাইবে না। কারণ, যে দুর্গন্ধ হঠাৎ নাকে ঢুকবে, সেটা সহ্য করা কঠিন। ঠিক তেমনি সমাজের বড় বড় দায়িত্বে থাকা কর্মীর ফলাফল যখন দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তখন সমাজ তাঁকে ঘৃণা করে ঠিক বর্জ্যের মতো। তাহলে কী লাভ হলো নিজেকে নামীদামি বলে দাবি করে, যদি সমাজের এই মহৎ ব্যক্তিরা সারাক্ষণ ডাস্টবিনে পড়ে থাকে তাঁদের ধ্যানে ও জ্ঞানে? যদি মনের ময়লা–আবর্জনাগুলো পরিষ্কার না করে, তাহলে কী হবে ব্র্যান্ড নেম দিয়ে?
বাংলাদেশ হয়তো মনে করে, তারা বিশ্বের উন্নত দেশে ধাবিত হতে চলেছে। কোন কোন দিক বিবেচনা করলে হয়তোবা কিছুটা সত্য। কিন্তু সত্যিকারভাবে গর্বিত জাতি হিসেবে নিজেদের দাবি করার আগে আসুন জেনে নেই কিছু অপ্রিয় সত্য তথ্য।

default-image

কী ঝুঁকিপূর্ণ জীবন তাঁর, দেখুন, কী তাঁর নিরাপত্তা, কী পুথিগত শিক্ষা রয়েছে তাঁর? কী পরিমাণ অর্থ তিনি মাসে রোজগার করেন? সমাজের চোখে তাঁকে কীভাবে দেখা হয় ইত্যাদি। ঢাকায় সুয়ারেজ লাইন পরিষ্কারের কাজ করছেন ১৫ বছর ধরে, তিনি মাসে আয় করেন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ঝুঁকিপূর্ণ এ কাজ করে তিনি প্রায়ই আহত হন, জ্বরসহ শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন প্রতিনিয়ত। নেই ভালো বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা, তবুও তিনি সমাজের নোংরা পরিষ্কার করে চলছেন।

একই সঙ্গে আসুন জেনে নেই, ঠিক একই কাজের অন্য আরেক দেশ যেমন সুইডেনের মেথর, ঝাড়ুদার বা ডাস্টম্যান যা–ই বলি না কেন, তাঁর জীবনব্যবস্থা। সুইডিশ ভাষায় এই ডাস্টম্যানদেরই আমরা বলি প্রত্যয়িত আবর্জনা সংগ্রহকারী বা সংগ্রাহক, যাঁদের এমন একটি কাজ প্রতিদিন করতে হয়। বর্জ্য সংগ্রহকারী হিসেবে একটি মেয়ে সমাজের বর্জ্য ট্রাকে করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে চলছে। কাজের পরিবেশ, গুণমান, পরিষেবা, গ্রাহক পরিষেবা এবং আরও অনেক কিছু সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান রয়েছে। ভালো জ্ঞানের সঙ্গে কাজটি আরও দক্ষ ও আরও আনন্দের সঙ্গে করছেন। তাঁরা নবম শ্রেণি শেষ করে এর ওপর প্রশিক্ষণ শেষে এ কাজ করেন। নিজের গতিতে প্রশিক্ষণ পুনরায় শুরু করতে পারেন এবং যেকোনো সময় বাতিল করতে পারেন। কোর্সটি শেষ করার পর একটি ডিপ্লোমা মুদ্রণ করতে পারে। তাঁদের পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে সেফটি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বেতন, ছুটি, ভাতাসহ সব রকমের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

ছবি নিজেই তাঁর প্রমাণ। একই কাজে দুটি ভিন্ন দেশে রয়েছে কর্মের ধরন ও বেতনে বিশাল পার্থক্য। ভাবতেই গা শিউরে ওঠে! একই সঙ্গে সুইডেনের একজন অর্থ বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের অর্থ বা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দিকটা দেখুন, বলতে গেলে সম্পূর্ণ উল্টো। কারণ কী? কারণ, দরিদ্র দেশের সাধারণ মানুষ নির্যাতিত, নিপীড়িত ও বিতাড়িত সেই দেশেরই খ্যাতনামা শিক্ষাধারীদের দ্বারা। সবাইকে সুন্দর নাগরিকের অধিকার দিতে হবে। সেটা কি সম্ভব হয়েছে আজও? তাহলে কী দরকার আছে এ শিক্ষার, যদি শিক্ষা শুধু শ্রেণি সৃষ্টি করে? We don't need no education, We don't need no thought control, we need humanity.
লেখক: রহমান মৃধা, সুইডেন

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন