বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি সকাল থেকে শুধু ভাবছিলাম ব্যথাটার কারণ কী। মূলত শোবার সময় বালিশে ঘাড়ের অবস্থান এদিক–সেদিক হলে এই ব্যথাটা হয়। তাই ঝাড়ফুঁকের পাশাপাশি মায়েদের দেখতাম বালিশটাও রোদে দিতে। আমি ভাবলাম গতকাল তো ভালোই ঘুম হয়েছে, তার মানে ঘুমানোর সমস্যার কারণে এই ব্যাথা হয়নি। তখন আরও ভাবতে গিয়ে কারণটা আবিষ্কার করলাম।

সকাল–বিকেল বনবাদাড়ে হাঁটাহাঁটির বড় অভ্যাস আছে আমার। একসময় আমাদের মেয়ে তাহিয়া শুধু আমাকে সঙ্গ দিত। এরপর রায়ান হাঁটাচলা শিখলে সেও আমাদের দলে যোগ দিয়েছিল। আর এখন শুধু রায়ান, অবশ্য মাঝেমধ্যে তাহিয়াও যোগ দেয় যদি মেজাজ মর্জি ঠিক থাকে। তাহিয়া এখন টিনএজে পদার্পণের ঠিক আগের সময়টা পার করছে। আমি বুঝতে পারি ওর আলাদা ব্যক্তিত্ব, আলাদা মতামত তৈরি হচ্ছে, তাই আর আমি বেশি চাপাচাপি করিও না।

আমার মনে আছে আমি কবে শেষবার তাহিয়াকে কাঁধে নিয়েছিলাম। কয়েক বছর আগে আমাদের বাসায় গিন্নির বান্ধবী প্রণতি সপরিবারে বেড়াতে এসেছিলেন। আমি আর তাহিয়া তাঁদের নিয়ে ক্যাটারাক্ট ড্যামে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন রাস্তাঘাট অতটা চিনতাম না, তাই গাড়িটা ওপরে পার্ক করে আমরা নিচে নেমেছিলাম। বেড়ানো শেষ করে ফেরার পথে তাহিয়া ক্লান্ত হয়ে আবদার করল ওকে কাঁধে নিতে। আমিও একঝটকায় ওকে কাঁধে উঠিয়ে নিয়েছিলাম। এরপর টের পেয়েছিলাম আমার কোমরে অনেক ব্যথা এবং বেশ কিছুদিন সেই ব্যথা ছিল।

রায়ানকে নিয়ে হাটতে বের হলে রায়ানও ইদানীং বায়না ধরে, বাবা কোয়ালা। আমি শুরুর দিকে মনে করতাম ও হয়তোবা কোলে নেওয়ার কথা বলতে গিয়ে এটা বলছে। পরে বুঝলাম ও আসলে আমার পিঠে চড়তে চাইছে কোয়ালাদের বাচ্চার মতো। তাই ও আবদার করলেই আমি ওকে পিঠে উঠিয়ে নিই আর চিৎকার করি বলি, রায়ান ফর সেল, কোয়ালা ফর সেল, অনলি টেন ডলার। রায়ান এগুলো শুনে হেসে খুন হয়। গত শনিবার হাটতে গিয়েও একই আবদার করল। পিঠে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে একঝটকায় ওকে কাঁধে তুলে নিলাম। তখন টের পাচ্ছিলাম যে ওকেও আর কাঁধে নিতে পারব না।

গতকাল বিকেলে বাসার পাশের পার্কে সাইক্লিং শেষ করে ওদের গাছে চড়তে বললাম। রায়ানকে সহজেই গাছের ডালের ফাঁকে বসিয়ে দিলাম। তাহিয়াকে বললাম, তুমি নিজে নিজে উঠো কিন্তু ও কোনোভাবেই পারছিল না কারণ ইউক্যালিপটাসগাছের এমনিতেই ডালপালা কম উপরন্তু আবার তেলতেলে, তাই আমাদের শৈশবের আমগাছে চড়ার মতো অত সহজে চড়া যায় না। এটা দেখে আমি ওকে কাঁধে নিয়ে ডালে বসিয়ে দিলাম। তখন বুঝিনি, সেটা এখন টের পাচ্ছি। এটা করতে গিয়েই কাঁধে টান লেগেছিল।
মেয়েটাকে কাঁধে না নিতে পারার দুঃখ রায়ানকে কাঁধে নিয়ে ভুলতাম। গত দুই দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছি রায়ানকেও আর কাঁধে নিতে পারব না। কারণ, রায়ানের বয়স পাঁচ পার করে ছয় চলছে। এটা মাথায় খেলার পর থেকেই নিজেকে কেন জানি বৃদ্ধ মনে হচ্ছে। মনের মধ্যে একধরনের অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হচ্ছে আর ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনের মাঝে বেজে চলেছে কবির সুমনের সেই গান-
তিনি বৃদ্ধ হলেন...বৃদ্ধ হলেন...
বনস্পতির ছায়া দিলেন সারা জীবন।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন