default-image

একটি নির্মল আনন্দঘন দিনে যখন খবর পেলাম আমাকে মায়ের আসনে বসানো মানুষটি আর এই বিশ্বলোকে নেই, তখন দুনিয়ার সব আলো যেন এক নিমেষে আমার চোখের সামনে নিভে গেল। আমি ক্রমেই তলিয়ে যেতে থাকলাম এক অতলগহ্বরে। একটা কথাই মনের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছে, আমাকে আর কেউ কোনো দিন কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলবেন না—‘আমার কন্যাসম মা’।

খুব করে আল্লাহর কাছে চেয়েছিলাম, আর মাত্র কয়েকটা দিন যেন ভালোভাবে চলে যায়। আমার মাথার ওপর ২০ বছর ধরে ছায়া ছিল, আরও একবার সেই ছায়ার তলায় যেন শীতল হতে পারি। একজন নামকরা শিক্ষাবিদ, জ্ঞানতাপস মানুষেরও যে একটা সহজ–সরল জীবনযাপন থাকতে পারে, তা হয়তো আমরা কেউ কখনো ভেবে দেখি না। আমি পরম সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছি বলেই হয়তো এমন একজন মানুষের খুব কাছাকাছি থেকে তাঁর জীবনের একটা অধ্যায়ের অদ্যোপান্ত নিখুঁতভাবে অবলোকন করতে পেরেছি। সেই মহান মানুষটি হলেন প্রাক্তন ডিন (কলা অনুষদ) অধ্যাপক ড. কে এম মোহসীন, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বশেষে ছিল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য। এ ছাড়া স্যারের আরও কত কত উপাধি ছিল।

বিজ্ঞাপন

এমন একজন মানুষের মধ্যে আমি যে মানুষটিকে আবিষ্কার করেছিলাম, তা হলো, সদ্য ঢাকা শহরে পা ফেলা অভিভাবকহীন এক অষ্টাদশী আনাড়ি মেয়ের অভিভাবক হিসেবে। আমি তাঁকে দেখেছিলাম একমাত্র কন্যা হারানোর কষ্ট লুকাতে গিয়ে চোখের কোণের পানিকে হিরের মতো চিকচিক করা অবস্থায় হারানো মেয়েকে খুঁজে ফিরতে।

সব অনাড়ম্বর দিনগুলোর কোনো একদিনে হয়তো আমরা অলিখিতভাবেই বাবা–মেয়ের সম্পর্কে উপনীত হয়েছিলাম। ইতিহাস বিভাগের অধিকাংশ সভা-সেমিনারের আমি নিয়মিত একনিষ্ঠ দর্শক–শ্রোতা। তত দিনে ইতিহাস বিভাগ তথা তাঁর পরিচিত অনেক স্যারই জেনে গেছেন, আমি তাঁর হঠাৎ ঝড়ে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে। আমাদের কতশত স্মৃতি আছে এ কলাভবন ঘিরে। আমি রোকেয়া হলে থাকায় সুবিধা ছিল এটাই যে ঘাড় ঘুরালেই কলাভবন। আর কলাভবন মানেই ইতিহাস বিভাগ। আমি রান্না করে খাই শুনে স্যার বললেন, ‘তুই আবার রান্নাও পারিস নাকি!’ এমন কথার মোক্ষম জবাব হিসেবে যেদিন করলা ভাজি, শুটকি আর ডিম রান্না করে নিয়ে গেলাম, তখন স্যার তাঁর এমফিল ছাত্র বাহার ভাইয়াকে বললেন, ‘রান্না তো ভালোই করে, কি বলো বাহার।’ বাহার ভাইয়াও গদগদ মুখে বললেন, ‘ঠিক বলেছেন স্যার’। এমন অমায়িক একজন মানুষ আজ আর বেঁচে নেই।

মাসখানেক আগেও আমার সঙ্গে ফোনে কথা হলো। কেমন অভিমানের সুরে বললেন, ‘তুই আমাকে ভুলে গেছিস।’ স্যারকে বলা হলো না, আমার চরিত্রের দু–একটা ভালো গুণ আমি তাঁর কাছ থেকে রপ্ত করার চেষ্টায় আজও বদ্ধপরিকর। তার মধ্যে একটা হলো ধৈর্যশীল হওয়া। স্যারের সঙ্গে ২০ বছরের পরিচয়ে আমি একটা মুহূর্তের জন্যও কখনো তাঁকে রাগতে দেখিনি। আর অন্যটা হলো উদারতা। কাউকে না চিনে, না জেনে কীভাবে মুক্তহস্তে দান করতে হয়, এই নিগূঢ় সত্য আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। একবার আমার এক পরিচিত ভাইয়া বললেন, তাঁর এলাকার এক ছেলে কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত। আমি যা পারি, তাই যেন সাহায্য করি। ঠিক সেই মুহূর্তে দু–এক শ টাকার বেশি সাহায্য করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। হঠাৎ মনে হলো, স্যারকে বলে দেখি, স্যার যদি কিছু সহযোগিতা করেন। আমি ছেলেটার কথা স্যারকে বলতেই স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই চিনিস ছেলেটাকে?’ আমি ছোট করে বললাম—‘না’। আমি মনে মনে ভাবলাম, যেহেতু আমি চিনি না, স্যার হয়তো ছেলেটাকে সাহায্য করবে না। আমার ভাবনা শেষ না হতেই স্যার আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, ‘তুই ছেলেটার খোঁজ নিয়ে দেখ, ছেলেটার কী অবস্থা, কত টাকা লাগবে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ঠিক বুঝে পেলাম না ছেলেটার কত টাকা লাগা দিয়ে স্যার কী করবেন, পুরো টাকা কী স্যার দেবেন? বাড়তি প্রশ্ন না করে পরের দিন আমি আমার মাকে নিয়ে চলে গেলাম সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সব খোঁজখবর করে জানতে পারলাম, ৩৫ হাজার টাকা কম আছে। এই টাকা জোগাড় হলে অস্ত্রোপচার হবে। আমি সব জেনে গিয়ে স্যারকে খুব ইতস্তত হয়ে বললাম, ৩৫ হাজার টাকা হলে ছেলেটার অস্ত্রোপচার হবে। খুব নরম গলায় স্যার বললেন, ‘কাল টাকা দিয়ে আসবি আর আমি দিয়েছি বলার দরকার নেই।’ আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে অল্প কয়েকবার চমকেছি। তার মধ্যে একবার এইচএসসিতে কলা অনুষদ থেকে সবোর্চ নম্বর পেয়ে।

আর দ্বিতীয়বারের মতো চমকালাম অচেনা, অজানা এক অসুস্থ ছেলের প্রতি স্যারের এই সহমর্মিতা দেখে। এরপর আমার হাত দিয়ে স্যার আরও চারজনকে সাহায্য করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিল মানসিক প্রতিবন্ধী আর বাকি তিনজন ছিল অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল।

বিজ্ঞাপন

আর হ্যাঁ, প্রতিবার স্যার আমাকে তাঁর নাম বলতে নিষেধ করে দিতেন। খুব ইচ্ছা হতো এই মানুষটার নামটা বলি, কিন্তু তাঁর কথা রাখতে গিয়ে আটকে যেতাম। শুধু বলতাম টাকাটা যে দিয়েছেন, তাঁর জন্য অনেক অনেক দোয়া করবেন। আমার প্রতি স্যারের অপরিসীম ভালোবাসা কতজন কতভাবে ব্যাখ্যা করেছে! আমি কখনো সেসব কথা কানেও তুলিনি। সম্মান দেওয়ার মালিক যেমন আল্লাহ, নেওয়ার মালিকও আল্লাহ।

আমি কারও কাছে জোর করে ভালো হতে সেদিনও চাইনি, আজও চাই না। আজ কথাগুলো বলছি এ জন্য যে আমরা যেখানে ২ টাকা দান করে ১০ টাকার গল্প করে বেড়াই, সেখানে ঠিক কত বড় মাপের একজন মানুষ হলে অচেনা, অজানা মানুষকে সাহায্য করেও অনুরোধ করতেন তাঁর নিজের নাম যেন গোপন রাখি। এমন মহৎ মানুষ হাজারে নয়, লাখে একজন আছে কি না, সন্দেহ। অথচ এই উদাহরণের মানুষটার সঙ্গে আমার ছিল অন্তরাত্মার সম্পর্ক। যে মানুষটা আর কোনো দিন আমার মাথায় হাত রেখে বলবেন না, ‘এত দিন পর মনে পড়ল আমার কথা।’ কী করে আজ বোঝাব, আমার মস্তিষ্ক অকার্যকর না হলে, তাঁকে ভোলা আমার সম্ভব নয়। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনের পুরো সময়টা স্যারের ব্যবস্থা করে দেওয়া বৃত্তির টাকায় চলেছি। তা না হলে আমার আব্বার পক্ষে আমাকে ঢাকায় রেখে পড়ানো দুষ্কর বললে ভুল হবে, অসম্ভব হয়ে যেত। এত এত ভালোবাসা পেলাম যে মানুষটার কাছ থেকে, তাঁকে একবার বলতেও পারলাম না, তুমি মানুষ নও, মানুষরূপী ফেরেশতা। পরম করুনাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার পিতৃতুল্য স্যারকে জান্নাতের মেহমান হিসেবে কবুল করে নেন। আমীন।

*লাভলী ইয়াসমীন, গজফোর্ড, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন