default-image

নায়িকা হারিয়ে গেছে, সঙ্গে মুঠোফোন নেই। খুঁজে পেতে ত্রাহি অবস্থা নায়কের। এই ‘ত্রাহি অবস্থা’-র মধ্যে কী কী ছিল, সেই গল্প দিয়ে একটি সিনেমা তৈরি করলে গল্প শেষ হওয়ার কথা নয়। হ্যাঁ, বলছিলাম কেপটাউন বোটানিক্যাল গার্ডেনের কথা।

নিচে পানি নেই, দুধারে গাড়ি চলাচল নেই। হঠাৎ অজান্তে দেখা একটা ব্রিজ। ব্রিজটা বেশ দোল খায়। বাচ্চারা ভয় পায়, কেঁপে ওঠে, সামনে পা ফেলতে সাহসের ঘাটতি দেখা দেয়, বড়রা শক্তি শেয়ার করছে বাচ্চাদের সঙ্গে।

আর যদি সঙ্গে একটা স্বয়ংক্রিয় উদ্বেলিত মন থাকে, তাহলে ওপরের দিকে তাকালে জগৎ ভোলা সহজ। রঙিন তুলি আছে অন্তর ভরা, বিশ্বসেরা শিল্পী উপস্থিত মস্তিষ্কে, সাদা কাগজের ভালোবাসার ওপর অঙ্কিত হয় বর্তমান প্রকৃতি, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তুলিকে চালাতে হয় না, চোখের নরম ও মসৃণ চাহনি চালিয়ে নিচ্ছে তুলি, আর এই তুলি যা যা দেখা হচ্ছে, সে সব নিপুণভাবে মসৃণ করে অন্তরে গেঁথে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে, চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রাকৃতিক দর্শনে তলিয়ে যেতে হচ্ছে, অথচ ডানে কে ছিল সঙ্গী, ভুলতে হচ্ছে তার কথা, কে ছিল বাঁয়ে ভুলতে হচ্ছে তার কথা।

দেখা যাচ্ছে, বাচ্চারা মা-বাবার পা ধরে চলো চলো করে ধাক্কাচ্ছে, তবু পা নড়ে না।

কেপটাউনের বোটানিক্যাল গার্ডেনের ব্রিজে উঠলে আসলেই পা নড়ে না। সেখানকার পাহাড় সংযুক্ত জঙ্গল ও তার ভঙ্গিমা যদি পরখ করা যায়, তবে মনের সাগরে ঢেউয়ের সঙ্গে ঢেউয়ে আঘাত লেগে ক্লান্তির প্রাচীর ভাঙবেই ভাঙবে। উপভোগের অন্তরালে মজাদার ও আকর্ষণীয় উপভোগ এখানে।

ব্রিজ না হয় গেল, রাস্তা নিয়ে কী ভাবতে পারি? মানুষের শরীরে কতগুলো রক্ত চলাচলের জন্য রগ বা শিরা-উপশিরা আছে জানি না। ঠিক তেমনই এই বোটানিক্যাল গার্ডেনে মানুষ চলাচলের জন্য কতগুলো রাস্তা আছে জানা নেই। আঁকাবাঁকা রাস্তা, সোজাসুজি রাস্তা। মনে হতে পারে, এই রাস্তায় হয়তো কেউ নেই, সেখান দিয়ে একটু একাকিত্ব হাঁটতে ইচ্ছা করতে পারে। তবে রেহাই পাওয়ার যোগ্য নেই, সে পথেও মানুষের অভাব নেই।

default-image

সিদ্ধান্ত নিতে বড়ই বিদঘুটে চিন্তায় যেতে হয় যে এখন কোন পথে ঢুকব। ডান রাস্তা নেব, নাকি বাঁয়ের রাস্তা নেব, নাকি ওপরের রাস্তায় উঠব, নাকি নিচের দিকে যাব। যখন এমন চতুর্ভুজাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবতে হয়, ঠিক তখন যদি নরম নরম ঘাস বিছানো একটুকরো রৌদ্রছায়ামিশ্রিত সবুজে ঘেরা জায়গা নজরে আসে, তখন চতুর্ভুজাকার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ঘাসের ওপর বসতে চাওয়া আনচান করা মনের সাংঘর্ষিক নিশ্চিত।
জঙ্গলে জঙ্গলে ভরপুর। জঙ্গল শব্দটি শুনলেই গায়ে বিরক্তি ধরার কথা। কেমন যেন ভিতু ভালোবাসা লাগে। জঙ্গলের বদলে যদি উদ্ভিদ লেখা হয়, তাহলে আলিশান আলিশান ভাব মনে হয়, আরাম আরাম লাগে। হাজারো উদ্ভিদ। বোটানিক্যাল গার্ডেনের দেহে উদ্ভিদের ভঙ্গিমা রীতিমতো ধাঁধায় ফেলে দেয়।

শব্দে শব্দে কবিতা হয়, তাহলে তো উদ্ভিদে উদ্ভিদে জঙ্গল হয়। ভালো ভালো শব্দে ভালো ভালো কবিতা হয়। ভালো কবিতায় পাঠক বেশি। হাজারো ধরনের উদ্ভিদ দিয়ে অদ্ভুত একটা জঙ্গল হয়। দর্শনার্থীদের ভিড়ও বেশি হয়। ছবির মতো সাজানো বিশ্বের প্রথম এই বোটানিক্যাল গার্ডেন। প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপচে পড়া ঢল।

ঘাসের ওপর বসার জন্য বেশ কয়েকটি জায়গা আছে। বসলে মনে হয় কম্বলের ওপর বসে আছি। চারদিকে তাকালে সৌন্দর্যের চেহারা দেখলে হতভম্ব হয়ে যেতে হয়।

বাক্‌শক্তি নিচু হয়ে আসে জঙ্গলের সাজসজ্জা দেখলে। ভাষা দিয়ে একে অলংকৃত করা লাগে না। ভেতরে ঢুকলেই এই গার্ডেন নিজেই ভাষা সৃষ্টি করে।

বিজ্ঞাপন

যদি জঙ্গলের মধ্যে এক বুড়ো মানুষকে খুব নিরিবিলি স্থানে একটা বেঞ্চের ওপর শুয়ে থাকতে দেখা যায়, তবে নির্ঘাত হিংসা হবে। গার্ডেনটি দক্ষিণ আফ্রিকার অসাধারণভাবে সমৃদ্ধ আর বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদজগৎকে প্রদর্শন ভঙ্গি দেয়। হিয়াত, সাইকাড, সুগারবুসেসের নিচেই মোড়ে মোড়ে বেঞ্চ রাখা। যদি ক্লান্তি দূর করতে সেখানে একটু শুয়ে পড়েন, তবে নিজেই প্রদর্শনের বিষয় বস্তু হয়ে যাবেন। কেপ কোবরা, কচ্ছপ, শজারু, বেজি, ইগল, হাঁস প্রভৃতি প্রাণী বসবাস করলেও মানুষের ভিড়ে এদের দেখা পাওয়া ভার।

২০০ থেকে ৩০০ বছর আগের গাছের টুকরো প্রদর্শনের জন্য সাজিয়ে রাখা আছে। যে টুকরাগুলো দেখতে অবিকল পাথরের মতো এবং পাথরের মতো শক্ত। এমনভাবে সাজিয়ে রাখা আছে, যেখান থেকে চোখ ফেরানো সহজ নয়।

বিশাল এলাকাজুড়ে এই গার্ডেনের অবস্থান। দু-এক ঘণ্টা প্রদর্শনে কিছু হবে না। শুধু ঘুরতে মন চাইবে। সারা দিন ঘুরলেও এর রূপ দেখার সাধ মিটবে না। একদম ছবির মতো সাজানো প্রকৃতি। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয় এটা ঠিক। একটু বসুন। ঘাসের ওপর, বেঞ্চে অথবা একটি গাছের ডালের ওপর।

default-image

কতক্ষণ বসতে পারবেন? বেশিক্ষণ নয়। কারণ, মনের মধ্যে দেখার যে বাসনা জাগে, সেই বাসনা পরাভূত করে আপনার ক্লান্তিকে। তৃপ্তি মেটে না দেখে। এই প্রকৃতির ভেতরে ঘুরতে বেশ মজা লেগে যায়। বের হতে মন চায় না। যদি শুধু একটি লাইফ ট্রির দিকেই তাকানো যায়, তবে দিনের ঘণ্টা খানেক শেষ।

এই লাইফ ট্রি যে ফল দেয়, তা খেয়ে হাতি, হনুমান, উটপাখি, এমন আরও অনেক প্রাণী জীবন বাঁচাতে পারে। যদি ঘুরতে ঘুরতে ওই গাছের নিচেই যাওয়া হয়, তবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে হয়। গাছের যে যৌবন, গাছের যে রূপ, গাছের যে চারিত্রিক জাহির, গাছের যে অঙ্গবিক্ষেপ, আর গাছের যে সৌন্দর্য, সেই গাছের দিকে তাকালে এর যে মহিমা বা যশের বিন্যাসে বিস্তৃত, তা মনের মধ্যে অঙ্গন হয়ে থাকে বহু দিন।

কেপটাউনের মহিমান্বিত বোটানিক্যাল গার্ডেনের হাজার হাজার উদ্ভিদের বর্ণনা, শত শত রাস্তার চলনগতি, বিষাক্ত প্রতিরোধক ঘাসের রূপায়ণ ইত্যাদি বিষয়ে লিখে শেষ করা মুশকিল। শুধু দীর্ঘ সময় ধরে চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে তা মস্তিষ্কের ক্যামেরায় সেলফি করে রেখে এই দুরূহ কাজ করা সহনসাধ্য।

এখানে এককালে ডাইনোসরের বসবাস ছিল। জঙ্গলের মধ্যে ডাইনোসরের ছোট বড় ভাস্কর্য আছে বেশ কয়েকটি। এগুলোকে ঘিরে রেখেছে চোখধাঁধানো গাছপালা। যেসব গাছপালা উপহার দিচ্ছে নয়নজুড়ানো বিভিন্ন প্রজাতির হরেক রকমের ফুল। যেখানে গেলে সেখান থেকে সরে যেতে মহাধন্দে পড়তে হয়।

পাহাড়ের ওপর গার্ডেন, গার্ডেনের সঙ্গে পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে সুবিস্তৃত জঙ্গল, পাহাড়ের মাথায় নীল আকাশ, ঝিরঝির বাতাস, মাথার চুল মৃদু নড়ে, বহুপক্ষীয় চোখ, বা! কী সুন্দর, কী মনোহরে ভরপুর প্রণয়োদ্দীপক দেহভঙ্গি তোমার, তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি।

* লেখক: মাহফুজার রহমান, কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন