default-image

ফেসবুকে লেখালেখি সীমিত করে দিয়েছি বেশ অনেক দিন হলো। তারপরও ইচ্ছা ছিল সোয়া দুই বছর পর দেশভ্রমণ এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইনিংস শুরুর পূর্বাপর সময়টা নিয়ে একটু-আধটু হলেও লিখব। দেশে থাকাকালে একেবারেই সময় করে উঠতে পারিনি বলে ভেবে রেখেছিলাম বিমানে ২৬ ঘণ্টায় দীর্ঘ যাত্রায় যত দূর পারি এগিয়ে রাখব। সে সুযোগ আর দিলেন না ঢাকা এয়ারপোর্টে টার্কিশ এয়ারলাইনসের জনৈক বাংলাদেশি বোর্ডিং এজেন্ট।

দেশ থেকে ফেরার সময় এমনিতেই মনটা ভার হয়ে থাকে ভীষণ। এর মধ্যে একজন কর্তব্যরত এয়ারলাইনস কর্মীর কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত আর চূড়ান্ত মাত্রায় অশোভন আচরণের পর মূল্যবান জিনিসপত্র ডাস্টবিনে ফেলে আসতে হলে পুরো জার্নিটা হয়ে ওঠে ভয়ংকর দুর্বিষহ। নিজের দোষটা এখানে উপেক্ষা করব না। একটু মাথা ঠান্ডা করে উপযুক্ত জায়গায় সাহায্য চাইলেই এই হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে পারতাম। কিন্তু কেন জানি না, ওই সময় মাথা কাজ করছিল না একেবারেই। আর সেটার মাশুল দিয়ে এক চরম লোকের পাল্লায় পড়ে নববিবাহিত স্ত্রীর শখ আর স্মৃতিমাখা কিছু জিনিস ফেলে আসা লাগল, একটা নতুন লাগেজসহ, যেগুলো বোধকরি আর ফিরে পাওয়া হবে না কোনো দিন।

জানি, এখন আর এসব লিখে কিছুই হবে না। আমার হাতে কোনো প্রমাণও নেই ওই ঘটনার। তবে কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে ওই দিন ওই সময়ের সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ ঘাঁটলেই ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত। আর সাক্ষ্য দিতে পারেন ওই দিন ওই বিমানের যাত্রীরা, যাঁরা বোর্ডিংয়ের লাইনে দাঁড়িয়ে আমার এই হেনস্থা হওয়া দেখেছেন। ব্যাপারটা নিয়ে এত গভীর তদন্তে যাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এখন পর্যন্ত হয়ে উঠিনি। তাই নিজেদের বিমানবন্দরে প্রথমবার পাওয়া এই তিক্ত অভিজ্ঞতার বিস্তারিত লিখছি, যদি তাতে সংশ্লিষ্ট কারও নজরে এসে ভবিষ্যতে সাধারণ যাত্রীদের এমন হয়রানির ঘটনা কিছুটা হলেও কমে।

ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুল হয়ে আটলান্টার উদ্দেশে আমার রিটার্ন ফ্লাইট ছিল বাংলাদেশ সময় ১৭ মার্চ, সকাল ৬টা ৫৫ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইনসে। বাড়ির লোকজনকে শেষ রাতে পীড়া দিতে চাইনি বলে আব্বা আর ভাইয়াকে নিয়ে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই রাত ১২টার পরপরই। ১টা বাজার আগেই বিমানবন্দরে পৌঁছাই।

কিন্তু টার্মিনালের প্রধান গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে বাধে প্রথম বিপত্তি। নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, ফ্লাইটের এত আগে ভেতরে ঢোকা যাবে না। বাইরের ড্যাশবোর্ডে আমার ফ্লাইটের তথ্য এলেই কেবল ভেতরে যাওয়া যাবে। ওদিকে বিমানবন্দরের ভেতরে এখন আর বিদায় দিতে আসা কাউকে ঢুকতে দেয় না বলে আব্বা আর ভাইয়াকে বিদায় দিয়ে ফেলেছিলাম আগেই। তাদের আবার কষ্ট দিয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে আনাতে চাইনি বলে সময় কাটানোর জন্য স্মরণ করি এয়ারপোর্টের কাছাকাছি থাকা বন্ধু মুনিমকে। রাতদুপুরে বিমানবন্দরের বাইরে মশার কামড় খেতে খেতে ইমন আর মুনিম এসে সঙ্গ দিয়ে যায় ঘণ্টা দুয়েক। এই অমূল্য সময়টুকুর জন্য ওদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।

বিজ্ঞাপন

রাত তিনটা নাগাদ আমি ভেতরে ঢুকে যাই। টার্কিশ এয়ারলাইনসের কাউন্টারে বড় লাগেজ দুটি চেকইনে দিয়ে দেওয়ার পর আমার সঙ্গে থাকে একটা ব্যাকপ্যাক আর একটা মিনি ট্রলি লাগেজ। ওই দুটি ওজন করে কাউন্টারের ভদ্রলোক জানান যে আমার হ্যান্ড লাগেজের ওজন নির্ধারিত আট কেজির বেশি আছে, তাই আমাকে হ্যান্ড লাগেজের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তিনি আমাকে ব্যাগ দুটি নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং বলেন, যদি বোর্ডিংয়ের সময় ওজন কমাতে বলে, তাহলে কমিয়ে নিতে হবে।
আমি জানতে চাইলাম, বাড়তি ওজনের জন্য জরিমানা দেওয়া যাবে কি না। উনি জানালেন, সে রকম কোনো নিয়ম নেই। ওজন কমাতে বললে কমিয়ে নিতে হবে। অথচ এয়ারলাইনসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে আছে, কেজিপ্রতি বা লাগেজপ্রতি একটা চার্জে অতিরিক্ত ওজন নেওয়ার সুযোগ আছে, যেখানে আবার স্টুডেন্ট ডিসকাউন্টেরও ব্যবস্থা আছে।

তাঁরা এসব কোনো তথ্য না দিলেও কথার ধরনে মনে হচ্ছিল এটা খুব বড় কোনো সমস্যা হবে না। তাই আমিও আর কথা না বাড়িয়ে হ্যান্ড লাগেজের ট্যাগ না নিয়েই চলে আসি। কিন্তু একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবলে বুঝতে পারতাম, এখানে আমাকে ওজন কমাতে না বলে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বোর্ডিংয়ের সময় কমাতে বলার কারণটা খুব সম্ভবত ওখান থেকে কমানো জিনিসগুলো আমি বন্ধু-স্বজন কারও কাছে দিয়ে দিতে পারব না। ফলে ওই অতিরিক্ত জিনিসগুলো তাঁদের ভোগে যাবে। আমি অতিরঞ্জিত ভাবছি কি না জানি না, কিন্তু পুরো ঘটনাটার সারমর্মে এর চেয়ে ভালো আর কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারছি না।

default-image

যা–ই হোক, ইমিগ্রেশন শেষ করে আম্মার হাতের চিকেন বিরিয়ানি উইথ বিফ কাবাবের দুই বক্সের একখানা ভরপেট সাবাড় করে যখন বিমানের নির্ধারিত গেটে পৌঁছালাম, ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর পাঁচটা পেরিয়েছে। তখনো সেখানে লাইন হয়নি তেমন। বোর্ডিং এজেন্ট ভদ্রলোক অনেকটা রুক্ষ মেজাজে প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করে যেই ভেতরে ঢুকতে যাব, অমনি খপ করে আমার সঙ্গে থাকা ট্রলি ব্যাগটা ধরে ফেললেন, ‘এত বড় লাগেজ নিয়ে তো কেবিনে যাওয়া যাবে না। এই ব্যাগ আপনি নিতে পারবেন না। এটা বদলিয়ে নিয়ে আসেন।’ জায়গায় দাঁড়ায়ে বেকুব হয়ে গেলাম! বলেন কি এই লোক! আমি যদিও লাগেজের সাইজ মেপে নিয়ে যাইনি, কিন্তু এই সাইজের লাগেজ আমি একাধিকবার বিমানের কেবিনে বহন করেছি।

সে কথা জানিয়ে কোনো কাজ না হওয়ায় বললাম, ‘আমি তো ইমিগ্রেশন পার হয়ে চলে আসছি। এখন কীভাবে ব্যাগ বদলাব?’ উনি বললেন, ‘এত কিছু আমি জানি না। যেখান থেকে পারেন বদলিয়ে নিয়ে আসেন। এই ব্যাগ নিয়ে আপনি বিমানে উঠতে পারবেন না। আর জরিমানা দিয়ে নিতে চাইলে ২৫০ ডলার দিতে হবে!’

তিনি ব্যাগের সাইজ বা ওজন কোনোটাই না মেপে কীভাবে ২৫০ ডলারের হিসাব দিয়ে ফেললেন বুঝলাম না! টাকাটা কার্ডে দেওয়া যাবে কি না, এমন প্রশ্নেও তাঁর না-সূচক জবাব, ক্যাশ দিতে হবে। ওই সময়েও কেন ঘাপলাটা ধরতে পারলাম না, আল্লাহই ভালো জানেন।

যা–ই হোক, যেহেতু আর বের হতে পারব না, তাই ওখানকার ডিউটি ফ্রি শপগুলোয় ছোট সাইজের ব্যাগ খুঁজতে শুরু করলাম। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের একটা দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেবিনে নেওয়া যাবে এমন সাইজের ব্যাগ আছে কি না। সেলসপারসন ভদ্রমহিলা কিছু ব্যাগ দেখিয়ে দিলেন।

সেখান থেকে একটা খুব সাধারণ মানের কাপড়ের ব্যাগ কিনলাম ১ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে। তারপর ওই ট্রলি ব্যাগ থেকে সব বের করে কিছু ব্যাকপ্যাকে আর কিছু নতুন কেনা ব্যাগে ভরলাম। সেনসিটিভ শোপিস জাতীয় জিনিসপত্র আলাদা আলাদা বক্স আর বাবল র‍্যাপ করা ছিল। সিলভিয়ার শৈশবের স্মৃতিমাখা কার্ড-প্যাডের কালেকশন ছিল, সমাবর্তনের স্মারক ছিল, আমাদের বিয়ের কাবিনে স্বাক্ষর করার কলমটা ছিল। বাধ্য হয়ে সব প্যাকিং খুলে ফেলে কোনো রকমে জিনিসগুলো নতুন করে ঠেসে ভরে নিয়ে গিয়ে দেখি যাত্রীদের লম্বা লাইন হয়ে গেছে।

আমি আর লাইনে না দাঁড়িয়ে সোজা বোর্ডিং গেটে চলে যাই। আমার হাতে নতুন ব্যাগ দেখে ভদ্রলোকের বিরক্তি যেন আরও বেড়ে গেল, ‘আরে আপনি তো দেখি আবার একই সাইজের ব্যাগ নিয়ে আসছেন। আপনি কি কথা বোঝেন না? আপনার কী সমস্যা বলেন তো! ঝামেলা কইরেন না তো আর এখানে! ঠিক সাইজের ব্যাগ নিয়া আসেন যান।’

অথচ ওই ব্যাগটা দৈর্ঘ্যে বড়জোর ফেলে আসা ট্রলি ব্যাগটার মেইন বডির সমান হবে, প্রস্থ আর উচ্চতায় একেবারেই সরু, তুলনাতেই আসবে না। কিন্তু সে কথা ওই নাছোড়বান্দাকে বোঝাবে কে!

আমি তারপরও রীতিমতো অনুনয় করে তাঁকে বলতে থাকলাম যে ‘ভাই একটু বোঝার চেষ্টা করেন যে আমি এখন এই জিনিসগুলো নিয়ে বের হতে পারছি না পরিচিত কারও হাতে দেওয়ার জন্য। এখন এত শখের জিনিসপত্র তো এভাবে ফেলে রেখেও যেতে পারি না। কোনোভাবে একটু কনসিডার করুন প্লিজ!’

আমি যতই নরম হই, তাঁর মেজাজ ততই চড়া হয়, ‘আপনি এখান থেকে যান তো! অন্য যাত্রীদের আসতে দেন।’ আমি তারপর নিরুপায় হয়ে আবার যাই পর্যটন করপোরেশনের ওই শপে আরও ছোট সাইজের ব্যাগ খুঁজতে। এবার সেলসম্যান এক ভদ্রলোক আমাকে ছোট কিছু চটের ব্যাগ দেখিয়ে বলেন, ‘যেহেতু ব্যাগের সাইজে সমস্যা বলছে, আপনি দুটি ছোট ব্যাগ নিয়ে যান।’ আমি বিড়বিড় করলাম, মনে হয় না এই লোক দুই ব্যাগের ব্যাপারটাও মানবে।

সেলসম্যান সাহেব আশ্বস্ত করে বললেন, এভাবে কাজ না হলে তিনি বিকল্প উপায় দেখবেন। তিনিও আমার সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় ব্যাগ বদলানোর কাজে হাত দিলেন। ছোট ছোট দুটি চটের ব্যাগে কোনো রকমে সব জিনিস চাপিয়ে নিয়ে গেলাম। এবার প্রথমে আমার ডাকই না শোনার ভান করলেন তিনি।

বেশ কয়েকবার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টার পর অসম্ভব বিরক্তি নিয়ে আমার হাতের ব্যাগ দুটোর দিকে তাকিয়ে লাইনভর্তি যাত্রীদের সামনে গলা তুলে বলতে লাগলেন, ‘আপনি মিয়া ঠিক আছেন তো? আপনার কি মাথায় সমস্যা আছে? আপনারে আমি এক ব্যাগ নিয়ে যাইতে দিতেসি না আবার দুই ব্যাগ বানায়ে নিয়া আসছেন! যান তো এখান থেকে।’

(অভিজ্ঞতা থেকে যত দূর জানি, বিশ্বের যেকোনো লোকাল বা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসই কেবিনের জন্য এক লাগেজের ওজনে আপত্তি করলে হয় সেটা চেকইনে দিয়ে দিতে বলে অথবা সঙ্গে রাখতে চাইলে দুটি ব্যাগ করে নেওয়ার পরামর্শ দেয় নিজেরাই। কিন্তু বাংলাদেশের বিমানবন্দরে যে দুনিয়াবি কোনো নিয়ম চলে না, সেটা ততক্ষণে বুঝতে আর বাকি নেই।)

বারবার আমাকে বিমানে উঠতে না দেওয়ার হুমকির মধ্যেই তিনি ভেতরে অন্য কারও উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘এই ওনার সব ব্যাগ সিজ করো তো, উনি যেন এই ফ্লাইটে যাইতে না পারেন..।’

একদিকে এহেন অপমানে হতবিহ্বল আমি, অন্যদিকে শখ করে কেনা জিনিসগুলো ফেলে যাওয়ার দুশ্চিন্তা। বিমান ছাড়ার তখন ২০ মিনিটের মতো বাকি। বাধ্য হয়ে হাতের সেই দুটো ব্যাগ নিয়ে আবার ফিরে গেলাম পর্যটন করপোরেশনের শপে। যে সেলসম্যান আমাকে দুটি ব্যাগ বানাতে সাহায্য করেছিলেন এবং কথা দিয়েছিলেন এভাবেও কাজ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা করে দেবেন, সেই তিনি এখন আর কোনো উপায় বলছেন না। তাঁকে বললাম, ‘ভাই আপনি অনুগ্রহ করে একটা ব্যাগ একটু রাখতে পারবেন? আমি কাউকে দিয়ে পরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব।’ উনি অপরাগতা প্রকাশ করে জানালেন, এভাবে ব্যাগ রাখার নিয়ম নেই তাঁদের! শেষ পর্যন্ত অনোন্যপায় হয়ে জিনিস ভর্তি একটা চটের ব্যাগ আর খালি করা নতুন ট্রলি লাগেজটা পর্যটন করপোরেশনের ওই শপের পাশের ময়লার কনটেইনারের সামনে রেখে ভগ্নহৃদয় আর অবনত মস্তকে অর্ধেক ব্যাগের সামান নিয়ে বোর্ডিংয়ের লাইনে দাঁড়াই। এবার হাতে একখানা মাত্র ছোট ব্যাগ দেখে ওই ভদ্রলোক কৌতুক করেই যেন জানতে চাইলেন, ‘সব তাহলে এইটায় আটায়ে ফেলসেন?’ আমার আর জবাব দেওয়ার মতো আগ্রহ বা মুখ কোনোটাই ছিল না। যথাযথ পর্যায়ে যোগাযোগ করে বিষয়টি তাৎক্ষণিক সুরাহা করার ও নির্বিঘ্নে ট্রলি লাগেজটাই নিয়ে যাওয়ার একাধিক বিকল্প সুযোগ ছিল। বিশেষ করে প্রিয় রিপন দুলাভাই এমিরেটসের বোর্ডিংয়ে কাজ করছিলেন মিনিটখানেকের দূরত্বে। তাঁকে সময়মতো স্মরণ করলে বিমানবন্দরের বাইরেও দুই ঘণ্টা দাঁড়ায়ে মশার কামড় খাওয়া লাগে না। জানি না ওই মুহূর্তে কেন সব দরকারি মানুষগুলোর কথা ভুলে গিয়েছিলাম। যদিও দুই বন্ধুর সঙ্গে কাটানো সময়টুকু ওইটুকুন মশার কামড় সহ্য করার দাবি রাখে। কিন্তু আমার এই উর্বর মস্তিষ্কটা কোন দিনের জন্য কিসের দাবি রাখে, সেটাই ভেবে পাই না। যে কথা শুরুতেই বলছিলাম, দেশ ছাড়ার সময় মনটা এমনিতেই ভয়ংকর বিষাদে ভরে থাকে। বাসায় বেশি থাকা হয়নি বলে শেষবিদায়ে আব্বা-আম্মার অভিমান বাঁধ ভাঙে আলিঙ্গনের ফাঁক গলে। বছর দুই বছরে একবার হলেও ভাইবোনদের জড়ায়ে ধরে প্রাণভরে কাঁদা ওই একটা দিন আসে। আবার এক দিনে চার লাগেজ গোছাতে গিয়ে নববিবাহিত বউয়ের সঙ্গেও মেজাজ দেখিয়ে সেটার অনুতাপে নিজেকেই পুড়তে হয় সারাটা পথ। বেচারির শখ করে কেনা জিনিসগুলোই সব ফেলে আসা লাগল! কত করে বলেছিল ওগুলো যেন আগেই গুছিয়ে ফেলি। আমি শুধু আশ্বাস দিচ্ছিলাম, ‘সব নিয়ে যাব...কোনো চিন্তা কোরো না।’ মাসখানেকের বিবাহিত জীবনে ভুল আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এই প্রথম নয়, তবে নিজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর সাহসিকতায় এমন বড় ধাক্কা প্রথমই বলা চলে। আবার সাড়ে তিন বছরের প্রবাসজীবনে জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রকম বিমানে চড়ার কমবেশি অভিজ্ঞতায়ও কোনো বোর্ডিং এজেন্টের কাছ থেকে এমন দুর্ব্যবহার পাওয়া এটাই প্রথম।

পরবর্তী সময়ে রিপন ভাইয়ের মাধ্যমে টার্কিশ এয়ারলাইনসে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ এমন ঘটনার কথা স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করেই দায় সেরেছে। অভিযুক্ত ভদ্রলোকের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বলেছে, আমি তাঁর সঙ্গে কথা–কাটাকাটি করায় ক্ষিপ্ত হয়ে এমনটা করেছেন! ১৭ মার্চের ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুলগামী টিকে-৭১৩ ফ্লাইটের (সকাল ৬টা ৫৫–এর ফ্লাইট ফ্লাই করে সকাল ৭টা ৩৫-এর দিকে) যে কজন যাত্রী ওই সময় আমাকে ওখানে দেখেছেন ওই বোর্ডিং এজেন্টের সঙ্গে কথা বলতে, তাঁদের একজনও যদি বলেন আমি ওই ব্যক্তির সঙ্গে একটিবারের জন্যও উঁচু স্বরে কথা বলেছি, তাহলে আমি সব অভিযোগ তুলে নেব। ওখানে উপস্থিত প্রত্যেকেরই দেখার কথা আমি কতটা নরম সুরে রীতিমতো অনুনয়-বিনয় করে তাঁকে শুধু বোঝাতে চেয়েছি যে এই কথা আমাকে ফার্স্ট চেকইনের সময় বললে আমি বাসা থেকে কাউকে আনিয়ে ব্যাগ বদলে কিছু জিনিস রেখে যেতে পারতাম। কিন্তু এখানে আমি ইমিগ্রেশন পার হয়ে আসায় বের হতে পারব না, সেটা জানা সত্ত্বেও আমাকে এভাবে একাধিকবার ব্যাগ বদলানোর পর সব মালামাল নিয়ে আসতে না দেওয়ার ব্যাপারটা আমি কোনো যুক্তিতেই মেনে নিতে পারছি না। আর একজন যাত্রীর সঙ্গে কীভাবে একজন অফিশিয়াল এমন রূঢ় আচরণ করতে পারেন, সেটাও আমার জানা নেই।

ইস্তাম্বুল ট্রানজিটে সঙ্গের দুটি হ্যান্ডব্যাগ আর ফাইনাল ল্যান্ডিংয়ের পর আটলান্টায় সব কটি ব্যাগ চেক করা হয়। চেকইন লাগেজে কুকড ফুড আছে জেনে ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্ট সরাসরি হাতে না দিয়ে একটা এনভেলপে ভরে ব্যাগেজ সেকশনের এক অফিসারের কাছে আমাকেসহ দিয়ে আসেন। আরও তিন অফিসারের হাত ঘুরে সব লাগেজ নিয়ে যেতে হয় ডিজিটাল এবং ম্যানুয়াল দুই রকম স্ক্যানিংয়ের মধ্য দিয়ে। অথচ পুরো প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবারের জন্যও মনে হয়নি আমাকে কোনোভাবে হেয় করা হচ্ছে। ব্যাগ চেক করা দুই অফিসার একেকটা খাবারের আইটেম বের করেন, বিবরণ শুনে বিস্ময় আর আনন্দসূচক নানা শব্দ করতে থাকেন। ট্রান্সপারেন্ট ব্যাগে আম্মার শুকনো করে রান্না করে দেওয়া চিংড়ি নিয়ে এক অফিসারের আগ্রহ দেখে বলি, সে চাইলে কিছুটা রেখে দিতে পারে। মন খারাপ করার ভান করে তাঁর সরল জবাব, ‘আই উইশ আই কুড বাট আই অ্যাম নট অ্যালাউড টু ডু সো!’ মনে মনে বলি, সাড়ে আট হাজার মাইল দূরের একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাজ করলে নিজেই ঠিক করতে পারতা কোনটা অ্যালাউড, কোনটা না! আম্মা আর শাশুড়ি মায়ের মমতায় মাখা খাবারগুলো যে অবার্নের বাসা পর্যন্ত নিয়ে আসতে পেরেছি, সেটাই দিন শেষে শান্তি। যদিও আম্মার রেঁধে দেওয়া বিরিয়ানির দুই বক্সের আরেকটা ইস্তাম্বুল বসে খাওয়ার কথা থাকলেও রেখে আসতে হয়েছে ঢাকা বিমানবন্দরের ‘...দের’ খাবার হতে।

কথাগুলা অনেক কষ্ট নিয়েই লিখছি। বিশ্বাস করেন, নিজের দেশের এয়ারপোর্টের মতো এমন অসহায় বিদেশের কোনো এয়ারপোর্টে এখনো লাগেনি। অথচ এই জায়গাটাই আমাদের দেশের প্রবাসীদের আবেগ-ভালোবাসায় অবতরণ আর উড্ডয়নের প্রধান কেন্দ্রস্থল। এবার ঢাকা এয়ারপোর্টের ভেতরের সজ্জা আর পরিচ্ছন্নতা দেখে বেশ ভালো লাগছিল, উন্নত দেশের এয়ারপোর্টগুলোর সঙ্গেও তুলনীয় মনে হচ্ছিল। কিন্তু সে ভালোলাগাটুকু বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না। পরিবার-স্বজনদের ছেড়ে দিন-রাতের ব্যবধানে চলে আসার প্রাক্কালে পাক্কা এক দিনের পথের একজন যাত্রীর সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারেন যাঁরা, ওপরওয়ালা তাঁদের হেদায়েত দান করুক। আমজনতাকে এভাবে হয়রানি করা থেকে বিরত রাখুক।

*লেখক: মো. মহিবুল্লাহ (ত্বকি), পিএইচডি গবেষক, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন