default-image

নদীর পাড়টা সবুজ পাতায় ছেয়ে সবুজারণ্য হয়ে আছে। বিকেলের রোদ আগুনের গোলার মতো তপ্ত। সূর্যটা এসে সরাসরি চোখ বরাবর তিরের মতো ধেয়ে আগুনের গোলা দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। এরই মাঝেই অনেকে বেরিয়েছেন বৈকালিক ভ্রমণে। তবে ভীষণ সতর্কভাবে। অনেকেরই মুখে মাস্ক। বেশ দূরত্ব বজায় রেখে হেঁটে চলেছেন। আমিও এসেছি ছোট বোন শীলার সঙ্গে। নদীর ওপর ব্রিজটা শহরকে দুভাগই করেনি। এটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য চমৎকারভাবে শ্বাস নেওয়ার জায়গাও। ওপরে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলারা যখন নেচে বেড়ায়, তখন নিচের সাদা হাঁসের নীল জলে অবগাহন যেন দক্ষ ডুবুরির ভাসা-ডোবার দুষ্ট খেলা।

যে ছোট শহরে আমদের বাস, তার নাম সাসকাতুন। এই শহরে করোনার প্রকোপ অন্য শহরের তুলনায় বরাবরই কম ছিল। কখনো কমে শূন্যতেও নেমে এসেছে। আস্তে আস্তে খুলে দেওয়া হচ্ছে শহরের দোকান, শপিং মল, ডাক্তারখানা, ব্যাংক, অফিস—সবকিছু। কীভাবে এ শহরের মানুষ করোনা ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেল। বলা যায় করোনার ভয়াবহতা বুঝতে পারা এবং নিয়মনীতি মেনে চলা।

default-image

প্রথমত, যখন হাহাকার চলছে পৃথিবীজুড়ে, যখন চারদিকে মৃত্যুর মিছিল, তখন সাসকাতুনে কোভিড রোগী ছিল না। সেই সময়ে সাসকাতুনবাসী দু–তিন মাসের খাবার কিনে ফেলল। প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে বাসায় থিতু হয়ে বসল। এর যেমন কিছু বাজে ফলাফল ছিল আবার ভালো দিকও ছিল। মানুষের ঘরের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল না। এদিকে সরকার ঘোষণা দিল ঘরে বসেই আর্থিক সুবিধাসহ অন্যান্য সহযোগিতা পাবে সরকারের কাছ থেকে। বিনিময়ে সবাইকে বাসায় থাকতে হবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ২০ মার্চ থেকে জুন অর্থাৎ তিন মাসের বেশি সময় লকডাউনে ছিল। লকডাউনের নিয়ম বেশির ভাগ মানুষই পরিপূর্ণভাবে পালনের চেষ্টা করেছে।

বাসায় থাকাটাই সবাই সঠিকভাবে করেছে। বাড়িগুলোর সামনে সুনসান নীরবতা। অপ্রয়োজনে কেউই বাসার বাইরে বের হয়নি। খুব বেশি খারাপ লাগলে নিজের ড্রাইভওয়েতে বের হয়ে একটু নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া, এটুকুই। বাইরে বেরিয়ে আড্ডা, ঘোরাঘুরি, অপ্রয়োজনে ভিড়—সবই বন্ধ ছিল। মাঝেমধ্যে গাড়ি নিয়ে বের হলে মনে হতো কোনো এক জাদুকর এসে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে এ এলাকার সব লোকজনকে। এখন অপেক্ষা ঘোড়ায় চড়ে আসা সেই রাজকুমারের। যে সুন্দর রাজ্যপাটের ঘুমন্ত মানুষদের জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুম ভাঙাবে। আবার জেগে উঠবে রাজ্য, মানুষের কোলাহলে মুখরিত হবে। জানি না সে কত দূর।

সরকার জনগণের থাকা-খাওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। সে কারণে সবাই নিশ্চিন্তে ঘরে থেকেছে। বাসায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। একজন আরেকজনকে সাহায্য করেছে। মানসিক শক্তি জুগিয়েছে। কেউ কেউ পছন্দের রান্না করেছে। পছন্দের টিভি শো দেখেছে। আর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাচ্চাদের কোয়ালিটি সময় দেওয়া। ল্যাপটপ, টিভির বাইরে অন্য অ্যাক্টিভিটি করা। এর মধ্যে বাগান করা, ভলিবল খেলা, পরিবার নিয়ে সাইকেল চালানো ছিল অন্যতম। মায়েরা সুযোগ পেয়েছিল বাচ্চাদের ঘরের কাজ শেখাতে। এ দেশের মানুষ ঘরে তেমন কাউকে আমন্ত্রণ জানায় না। তাদের সামাজিকতা চলে বাসার বাইরে। তারা বন্ধুবান্ধব নিয়ে হয় যায় বারে, নয়তো রেস্তোরাঁয় বসে। করোনায় সব বন্ধ। সে কারণে ঘরে থাকা অনেক কঠিন কাজ তাদের জন্য। কারণ, তারা বাসার বাইরে সামাজিকতা রক্ষা করে বা একঘেয়েমি কাটায়। এই কঠিন কাজটিই তারা করেছে সুচারুভাবে।

default-image

অন্যদিকে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান যেমন গ্রোসারিগুলো নিয়ম মেনেছে। দোকানে ঢোকার আগে হলুদ দাগ কাটা ছয় ফুট দূরত্বের লাইনে সবাই দাঁড়িয়েছে। গেটে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে ঢোকানো হয়েছে। গেটে একজন কর্মী আইপ্যাডে সংখ্যা লিখে হিসাব রেখেছে কয়জন ঠুকল আর কয়জন বেরিয়েছে। দোকানের ক্যাশবাক্সের সামনে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মতো শক্ত আবরণ দিয়ে ঢেকে স্পর্শ বাঁচানো হয়েছে ক্যাশিয়ার আর ক্রেতার মাঝে। কোনো কোনো দোকান এগুলোর সঙ্গে ক্রেতার জন্য মাস্ক এবং গ্লাভসেরও ব্যবস্থা করেছে। কাস্টমাররা ছয় ফুট দূরে দাঁড়িয়ে জিনিসপত্র কেনাকাটা করেছেন, শেলফে রাখা জিনিসপত্র না নড়াচাড়া করে প্রয়োজনীয় বাজার সেরেছেন। কোনো লাইনে দুজন থাকলে অন্যজন ভূত দেখার মতো চমকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

ডাক্তাররা অনলাইনে চিকিৎসা সেবে দিয়ে যাচ্ছেন। কোভিড পরীক্ষা সবার জন্য ফ্রি ছিল। যখনই একটু ঠান্ডা-কাশি বা জ্বর সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা। দুই-তিন দিনের মধ্যেই ফলাফল। পজিটিভ হলে তার সংস্পর্শে আসা সবার আইসোলেশনে থাকা বাধ্যতামূলক। একটি রেস্তোরাঁ দুজন কর্মী পজিটিভ ধরা পড়ার পর তাদের দুজনের কাজের সময়সীমা বের করে জনগণকে জানানোর ব্যবস্থা হলো। রেডিওতে ঘোষণা করল কিছুক্ষণ পরপর। সময় এবং তারিখ বলে জনগণকে সতর্ক করা হলো। যারা ওই সময়ে ওখানে গিয়েছিল, তাদের অনুরোধ করা হলো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নম্বরে ফোন করার জন্য। খবরের কাগজ, টিভিতে সংবাদ প্রচার হলো। তবে অবশ্যই করোনা রোগীর পরিচয় গোপন করে।

default-image

ছোট্ট একটা অপারেশনের জন্য আমাকে যেতে হলো ক্লিনিকে। আমার এক মাসের সামাজিক যোগাযোগের বৃত্তান্ত নেওয়া হলো। যখন বললাম, আমি বেশ কয়বার পার্কে গিয়েছি, তখন আমার বিভিন্ন রকম পরীক্ষা শুরু হলো। আমাকে কোথাও দৌড়াতে হলো না, সেখান বসেই সব পরীক্ষা হলো। আমাকে পরদিন সার্জারির সময় দেওয়া হলো, কারণ আমার করোনা নেই। সার্জারির সময় আমাকে অক্সিজেন দেওয়া নৌকার মতো মাস্ক পরানো হলো। পায়ের নিচে বালিশ দেওয়া হলো। পরম যত্নে চমৎকার গরম কম্বল দেওয়া হলো। সবকিছুই করা হলো আমাকে কত কমফোর্ট দেওয়া যায়, কত টুকু যত্ন নিলে আমি আশ্বস্ত হব সে কথা ভেবেই। আর ডাক্তার–নার্সের সুরক্ষার জন্য করোনা পরীক্ষা, বিশেষ মাস্ক পরিয়ে সার্জারি টেবিলে পাঠানো হলো। যেহেতু করোনার জন্য ভিজিটর ঠোকার অনুমতি নেই, সে জন্য ফোনেই সব যোগাযোগ হলো আমার স্বামীর সঙ্গে। আমরা গাড়িতে অপেক্ষা করলাম। নার্স ফোন করলেন ভেতরে যেতে। এজাজ আমাকে ক্লিনিকে পৌঁছে দিলেন। তাঁরা এজাজকে বললেন, নার্স ফোন করলে তখনই আসবেন এবং আমাকে এসে নিয়ে যাবেন। এখন চলে যেতে পারেন। করোনাকে প্রতিহত করার জন্য তাঁরা এ রকম অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। যাতে মানুষের অযথা ভিড় না হয় হাসপাতালে, রোগীরাও হয়রানি না হয়। সব সিস্টেম সঠিকভাবে চলার জন্য সাধারণ মানুষেরও সহযোগিতা এবং যে দায়িত্ব বর্তায়। এই শহরের বেশির ভাগ নাগরিক সেটি পালন করেছি।

আমার মতোই এই শহরের মানুষেরা তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করেছে যথাযথভাবে। সরকারও তার দায়িত্বে কোনো অনিয়ম করেনি। যখন মানুষ যার যার অবস্থান থেকে নিজেদের কাজ সঠিকভাবে পালন করে, তখন অনেক বড় দুর্যোগ থেকেই রক্ষা পাওয়া যায়। সাসকাতুনের শহরের মানুষগুলো এখন করোনার ভয়াবহতা থেকে কিছুটা মুক্ত। পৃথিবীতে মহামারির সময় কিছু মানুষ ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। আবার কিছু মানুষ মানবিকতার দৃষ্টান্ত রাখে। দুঃসময়ে মানুষ যার যার জায়গায় থেকে সৎভাবে যতটুকু করতে পারে ততটুকুই মানবিকতা। যা মানুষের ধর্ম। এখন মানুষকেই ভাবতে হবে সে কি করবে। সে কি সত্যিকার মানুষের মতো কাজ করবে, নাকি অমানুষের কাতারে নিজের নাম লিখাবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0