বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

আমি একটা খাবারই ভালো রাঁধতে পারি, তা হচ্ছে গরুর মাংসের ভুনা। এজাজও বলে আমার গরুর মাংস ভালো হয়। এসব কথা ভেবেই তাই রাতে আবার মাংস রাঁধা। মাংস চুলায় বসিয়ে বেডরুমে এসে বিছানায় বসতেই কাশি শুরু হলো। ভীষণ ক্লান্তি এসে ভর করেছে। শীত শীত লাগছে। উঠে একটা নীল রঙের সোয়েটার পরে নিলাম। ঘরের হিটিং বাড়িয়ে দিলাম। শরীরে মাংসের গন্ধ, মসলার গন্ধ। তরকারির ঝোল মাখা জামা আর এসব গন্ধ নিয়েই চট করে ঢুকে গেলাম কম্বলের ভেতর। আমার ভালোই জ্বর আসছে শরীরে। মাথাও ব্যথা। অনেক কষ্টে উঠে এজাজকে খাবার দিলাম।
এজাজকে খাবার দেওয়ার পর সে বলল, ‘মাংস ভালো হয়নি, কোনো স্বাদ নাই। কিছু কি কম পরেছে?’
আমি কিছু না বলে বেডরুমে ঢুকে গেলাম। বুঝে উঠে পারছিলাম না, আর কি খাবার ওকে দেব? এ কয়েক দিনের পরিশ্রমে আমি ভীষণ ক্লান্ত। রুমে ফিরে এসে হতাশ লাগছিল।

এদিকে নিজের শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। মার খাওয়ার পর শরীর থেঁতলে গেলে যেমন ব্যথা, এই ব্যথার এর চেয়ে ভালো উদাহারণ আর নেই। আমি বিছানায় শুয়ে সারারাত ব্যথায় কাতরাতে লাগলাম। দুটো প্যারাসিটামল খাওয়ার পর ভোররাতে একটু ঘুম এল। সকালে কাশি আর জ্বর নিয়ে ঘুম ভাঙল। দৌড়ে রান্নাঘরে গেলাম। আদা চা বসিয়ে নাশতা তৈরি করে ট্রেতে করে এজাজের দরজার এপাশে রাখলাম। আমি সরে গেলে সে দরজা খুলে সিরিয়ালের বাটি ঘরে ঢুকাল।

নিজের রুমে এসে সোফায় বসে জানালায় চোখ রাখলাম। সবে সকাল হয়েছে। চোখে এসে পড়ছে রোদের আলোর ছটা। সেই আলোয় কোনো আনন্দ নেই। কেমন ম্লান, আর ফ্যাকাসে। এজাজ তিন দিন ধরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আমি সে যুদ্ধের সঙ্গী। কিন্তু আমাদের মুখ দেখাদেখি নেই, ফোনে কথা বলতে হয়, সে রুমে বসে কোকায়, কিন্তু আমার তার কাছে যাওয়া নিষেধ।

default-image

এতদিন গল্পে শুনেছি, ফেসবুকে দেখেছি করোনায় অসুস্থ লোকজনের করুণ বিচ্ছেদ। কিন্তু তখনও বুঝিনি, বাস্তবে তা কত কঠিন। এখন নিজের জীবনকে মুভির দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছে। যে দৃশ্যকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে মানসিক ও শারীরিক দুভাবেই। শরীরের কষ্ট ওষুধ দিয়ে প্রশমন করা যায়, কিন্তু মনের কষ্ট? এর ওষুধ নেই, অন্তত এই সময়। সময় পরিবর্তনের মতো জীবনের রং পরিবর্তন হয়। ভালো সময় আসে, খারাপ সময়ও আসে। মানুষই তো পারে জীবনের বিবর্তনে টিকে থাকতে। আমরাও হয়তো টিকে যাব। জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকাতেই জীবনের স্বার্থকতা।

শরৎচন্দ্রের গল্পের বইয়ে কলেরা মহামারির ভয়াবহতা পড়েছিলাম, কিন্তু সেরকমই মহামারি এ একবিংশ শতাব্দীতে এসে এমন করে পৃথিবীকে তছনছ করে দেবে, কে জানত।

default-image

এরা কোনো অসুখের ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে কিছু বলে না। প্রতিদিনই নার্স ফোন করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছিল, আমি ভালো আছি কি না। কাল রাতে জ্বর জ্বর লাগছে শুনে বলল, ‘তুমি তাড়াতাড়ি কোভিড টেস্ট করো।’
আমি বললাম, ‘দরকার কি? আমারও করোনা হয়েছে, আমি বুঝতে পারছি।’
‘কিন্তু তোমাকে টেস্টে যেতে হবে।’ বেশ শক্তই ফোনের ওপাশের কোভিড নার্স।
মাঝেমধ্যে এসব দেশের ডাক্তার-নার্সদের ব্যবহার ভীষণ বিরক্তিকর লাগে। এরা নিয়মের বাইরে কিছু করবে না। রোগীর সমস্যা সরাসরি রোগীকে জানাবে, রোগীই সিদ্ধান্ত নেবে সে কি করবে। মাথা কুটে মরে গেলেও ভুয়া কিছু বের করা যাবে না। অপ্রয়োজনে কোনো ওষুধ দেবে না। ১৫ বছরে আমাকে দুবার মাত্র অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। তা–ও ভীষণ রকম অসুস্থ হওয়ার পর। এ দেশে আছে এক টাইনোরেল বাংলাদেশে যাকে প্যারাসিটামল বলে। জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথাসহ সব ব্যথারই এই এক বড়ি ‘টাইনোরেল’। এটি হয়তো কম ক্ষতিকারক। অথবা রোগীকে মানসিকভাবে কিছু একটা বুঝ দেওয়া।

default-image

আমি গাঁইগুঁই করছিলাম, যাতে না যেতে হয়। কারণ, এ দেশে কোভিড রোগীকে বাসায় রেখেই চিকিৎসা করানো হয়। প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো চিকিৎসাপত্র দেওয়া হয় না। মনে হচ্ছিল তাহলে আর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টেস্ট করিয়ে কি করব? এমনিও আইসোলেশনে থাকতে হবে, ওমনিও থাকতে হবে। কিন্তু না, কোভিড নার্স এটি মানবে না। আমাকে যেতেই হবে।

আমি পা বাড়ালাম অদৃশ্য শত্রুকে মোকাবিলা করতে। হয় জিতব, নয়তো মরব।
আমি তৈরি হলাম কোভিড টেস্ট দিতে যাওয়ার জন্য। গাড়ি ছুটছে বরফে ঢাকা রাস্তায়। বাইরের রোদেরা বরফে আছড়ে পড়ছে বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো। চকচক করছে চারদিক। কিন্তু দুপুরের কটকটা রোদও বিহ্বল। অদৃশ্য কালো আঁধারে ছেয়ে গেছে পৃথিবী, যা মানুষ নিজের হাত ধরে বয়ে এনেছে অভিশাপের মতো। এই অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ পৃথিবীর কাছে, এই প্রকৃতির কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাওয়া, দোষ স্বীকার করা। পৃথিবীর অহংকারী মানুষেরা আর কি তা চাইবে? চলবে...

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন