বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সেদিন ছিল ভীষণ ঠান্ডায় জমে যাওয়া বিষণ্ণ বিকেল। কখন দিন হয়, কখন রাত হয়, বোঝা যায় না। বিছানায় শুয়েই থাকি সারাক্ষণ। শরীর এতই দুর্বল, বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। দুচোখে প্রচণ্ড অন্ধকার দেখছি। বাঁ হাতটা দেবে গেল বিছানায়। আমি আর উঠতে পারছিলাম না। এজাজকে ডাকলাম মৃদু স্বরে, ‘এজাজ, এজাজ কোথায় তুমি।’
পাশের রুম থেকে কোনো শব্দ এলো না। হয়তো ঘুমাচ্ছে।
হাতে অনেক ব্যথা লাগছে, তবু ওই হাতে ভর করেই উঠে বসলাম। একটু ভয়ও লাগল, হাত ভেঙে গেল না তো?
ডান হাতে বাঁ হাতটা চেপে ধরলাম। না, খুব বেশি ব্যথা না, তার মানে হাত ভাঙেনি।
ফোনটা বিছানার পাশেই পড়ে আছে উল্টো করে। ফোনটা হাতে নিয়ে ফোন করলাম এজাজকে।
ফোন পেয়ে এজাজ দরজা ফাঁক করে দাঁড়াল। ওর মুখেও খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো বসে গেছে ভেতরে। দুচোখে ক্লান্তির ছাপ।
কী হয়েছে তোমার?
ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।
আমারও।
দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলাম। এজাজ এসে রুমের কোনায় রাখা চেয়ারটায় বসল।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, আমাদের মনে হয় স্যুপ খাওয়া দরকার। শরীরে শক্তি বাড়াতে হবে।
দোকানে অর্ডার দাও।
দোকানের স্যুপে কি শরীরে কাজ দেবে?
তুমি ঠিকমতো বসতে পারো না, রান্নাঘরে যাবে কীভাবে।

আমি আবারও হাসলাম। শুকনা হাসি। মনে হচ্ছিল হাসতেও কষ্ট হচ্ছে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হলো আমার পাশে বসা এই মানুষটা আমার জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের ব্যবধানে মধ্য বয়সে পৌঁছানো আমরা দুজন একে অপরকে যক্ষের ধনের মতো আঁকড়ে ধরতে চাইছি। প্রায় রাতেই টের পাই এজাজ এসে আমার গায়ের কম্বলটা ঠিক করে দিচ্ছে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমি চুপচাপ শুয়ে থাকি, টের না পাওয়ার ভান করে। সেই মুহূর্তে মনে হয় দুজন দুজনের জীবনের জন্য কত অপরিহার্য। আগে এসব টের পাইনি। টের পেলেও গুরুত্ব দিইনি। করোনাকালীন এ মুহূর্তে মনে হলো সঙ্গীহারা জীবন বয়ে বেড়ানোর মতো কঠিন এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই। নিঃসঙ্গ জীবন তো অভিশাপের মতো। আমি এমন অভিশপ্ত জীবনের কথা চিন্তাও করতে পারি না। মানুষ বেশিক্ষণ দুশ্চিন্তায় ডুবে যেতে পারে না। একেবারে ডুবে যায় তলানিতে। আমি ডুবতে ডুবতে ভেসে উঠলাম। এজাজের দিকে তাকিয়ে ভগ্ন কণ্ঠে বললাম, দেখি ইয়াসমিনকে ফোন করে। ইয়াসমিন হচ্ছে এজাজের ভাগিনাবউ। বিপদে–আপদে সারাক্ষণই পাশে থাকে।

ওখানে বসেই ফোন করে বললাম, স্যুপ খেতে মন চায়।
তাই? আমি এখনি বানাচ্ছি মামি। চিকেন স্যুপ করি?
আচ্ছা।

সেদিন রাতেই সে পাঠিয়ে দিল রাজ্যের খাবার। অবস্থা এমন মুখ ফুটে বলার আগেই খাবার ভর্তি বাটি পাঠাল সে। আমাকে যে বিষয়টি মুগ্ধ করে তা হচ্ছে এরা জানে, আমি কী খেতে ভালোবাসি। আমার ভালো লাগার খাবারই এসেছে বাটি ভর্তি। এল স্যুপ, চিংড়ি ভুনা, ছোট মাছের চচ্চড়ি, সবজি চিংড়ি আর গরুর ভুঁড়ি। কোনটা রেখে কোনটা খাই। সবই খাচ্ছি অল্প অল্প।

default-image

এই দুর্যোগে একটি জিনিস উপলব্ধি করতে পারলাম, তা হচ্ছে কিছু মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকাটা এবং রাখাটা অনেক জরুরি, সেটা কঠিন হলেও।

বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো মানুষের কাজ। যে প্রয়োজনের সময় পাশে এসে দাঁড়ায়, সে–ই তো পরম বন্ধু। বন্ধুর সঙ্গে স্বার্থের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি নির্মল ও আনন্দময়। তেমনি আরেকজন, নাসিমা আহমেদ টুটু। ভীষণ পাগলাটে ছেলেমানুষিতে ভরা একজন চমৎকার মনের মানুষ। সে–ও রান্না করে খাবার পাঠিয়ে, ফোন করে মনে সাহস জুগিয়ে আমার ভয়ংকর মানসিক বিপর্যস্ততা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। বন্ধুত্বের নির্মল সম্পর্কও জীবনে ভীষণ প্রয়োজন। কখনো রাগ, অভিমান, দুঃখ–কষ্ট ভাগ করার জন্য কিছু মানুষ প্রয়োজন। যার সামনে বসে অনর্গল সবকিছু খুলে বলে একদম হালকা হওয়া যায়।

চমৎকার কিছু মানুষ, ভালোবাসারা চারদিকে ঘিরে আছে জানতে পারাও জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জীবন তো শুধু চ্যালেঞ্জ, রোগ-শোক নয়, জীবন মায়াময়ও। এই মায়াময় জীবনকে এ কারণেই তো ছেড়ে যাওয়া কঠিন, এত কষ্ট হয়, এত বেদনাদায়ক।

করোনা ভীষণ উপকার করল আমার জীবনে, নতুন এক উপলব্ধি তৈরি হলো সম্পর্কের ব্যাপারে। করোনাকালীন আমার মনে হলো হঠাৎ করে আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক অনেক গুরুত্বপূর্ণ জীবনে। হতে পারে অনেক সম্পর্কে স্বার্থপরতা ঢুকে পড়ে, সেটি এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। সবারই উচিত ছোটখাটো ভুলত্রুটি অগ্রাহ্য করা। এই জীবন আর কদিনের?

ছোট্ট জীবন ভরে উঠুক ভালোবাসায়, মানুষের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্কে, পশুপাখির জন্য মায়ায় আর নিবিড়তায়। চলবে...

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন