দেশে না ফেরা উহানের ৩০ বাংলাদেশির ভাগ্যে কী ঘটেছিল

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনা ভাইরাসের মূল কেন্দ্র ছিল চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান। শহরটিকে বলা হয় সেন্ট্রাল চীনের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও যাতায়াতের কেন্দ্র। আয়তনে ঢাকার তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বড় এই মেগা সিটিতে বসবাস ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের। সেখানে অন্তত পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি, যাদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষার্থী।

এ বছরের শুরুতে উহানের সেই রহস্যময় ভাইরাসের খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে গোটা বিশ্বে। জানুয়ারির মাঝামাঝি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে মৃত আর আক্রান্ত। অদৃশ্য শত্রুকে রুখতে বেশ উঠেপড়ে লাগে সি চিন পিংয়ের প্রাদেশিক সরকার। করোনার লাগাম টানতে নেওয়া হয় দফায় দফায় তড়িৎ সিদ্ধান্ত। যার বাস্তবায়ন দেখা যায় ২৩ জানুয়ারির লকডাউনে, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় প্রকাণ্ড উহান নগরীকে।

চীনা নববর্ষের ছুটিতে এর আগেভাগে অনেকে দেশে পাড়ি জমালেও উহান-লকডাউনে অবরুদ্ধ হয় প্রায় ৩৫০ বাংলাদেশি। এদের অনেকের পরিবার পরিজন থাকায় নারী এবং শিশুরাও আটকে পড়ে ঘাতক ভাইরাসের নগরীতে। দেশে ফিরে আসার অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক দুর্ভোগের মাঝে কেটে যায় ভয়াবহ একটি সপ্তাহ। তবে বাংলাদেশ দূতাবাসের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দূর হয় তাদের সব শঙ্কা। খুব কম সময়ের নোটিশে উহান ছুটে যায় বিমানের একটি বিশেষ উদ্ধারকারী ফ্লাইট।

১ ফেব্রুয়ারি এই ফ্লাইটে ৩১৪ বাংলাদেশি ফিরে আসলেও শেষমেশ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন অনেকে। মৃত্যুপুরী হলেও এদের উহান ছেড়ে না আসার ব্যাপারটা বেশ বিস্ময় জাগানিয়া। কেবল তরুণ বাংলাদেশি নন কারও কারও পরিবার আর স্ত্রী-সন্তান মিলিয়ে ৩০ বাংলাদেশি, দিব্যি থেকে গেছেন মহামারির এপিসেন্টারে। জানুয়ারি থেকে জুলাই, পাক্কা ছয় মাস। এই দীর্ঘ সময় তাদের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছিল! করোনার কেন্দ্রে কেমনই বা কেটেছে এই বাংলাদেশিদের জীবন!

default-image

এসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতেই তাদের কারও কারও সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা। উইচ্যাটে (চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) কথা হল উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। জানালেন প্রথমদিকের সময়গুলোতে বেশ মানসিক চাপ গেলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছেন পরিস্থিতির সঙ্গে। ‘প্রথম কয়েক সপ্তাহ কেটেছে বেশ ভীতি আর আতঙ্ক নিয়েই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তরিক সহায়তা আর চীন সরকারের প্রস্তুতির মহাযজ্ঞ দেখে ধীরে ধীরে মনে স্বস্তি পেয়েছি’ বললেন তিনি।

শাখাওয়াত জানালেন, ‘বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রচেষ্টায় এত অল্প সময়ে আমাদের জন্য উদ্ধারকারী বিমান ছুটে আসবে তা ভাবিনি। তাই হুটহাট দেশে ফেরার সিদ্ধান্তটা নেওয়াটা বেশ কঠিনই ছিল। তা ছাড়া দেশে যেতে যেতে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া অথবা সেখানে গিয়ে তা ছড়ানোর আশঙ্কাও মাথায় কাজ করেছে। সব ভেবে শেষমেশ থেকে যাওয়ার ইচ্ছেটাই জয়ী হল।’

শুরু থেকেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের ডরমিটরিগুলোতেই অবস্থান করেছে জানিয়ে শাখাওয়াত বলেন, ‘এই সময় খাদ্যের সংকটে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে টানা দুই মাস আমাদের বিনা মূল্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। নিয়মিত সাত আট ঘণ্টার ক্লাসও হয়েছে অনলাইনে। এসব কারণে আমাদের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না আর লকডাউনও ছিল কঠোর। তাই এখানে থেকেও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা কেউ আক্রান্ত হইনি।’ 
এখন ধীরে ধীরে উহানে লকডাউন শিথিল হয়েছে জীবনযাত্রায় ফিরে আসছে আগের রেশ। তবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে যাওয়া নিয়ে কড়াকড়ি এখনো রয়েছে বলে জানান তিনি।

উহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ‘এক অঞ্চল এক পথ’ গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক ড. মোস্তাক আহমেদ গালিব। পড়াশোনা আর পেশার সুবাদে, উহানে আছেন দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ। ১৭ বছর আগের সার্স আর এবারের মহামারি দুটোর বিরুদ্ধে চীনাদের লড়াই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে এই বাংলাদেশির। জানালেন, তাৎক্ষণিক লকডাউনে প্রথমদিকে এখানেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ছিল খাদ্যঘাটতি, দুর্ভোগ আর নানা অনিশ্চয়তা। তবে সময় যতই গড়িয়েছে চীনারা সেই সব পাহাড় সমান চ্যালেঞ্জকে পরাভূত করেছে দাঁতে দাঁত চেপে। করোনার উৎপত্তিস্থল হলেও উহান প্রশাসনের কঠোর লকডাউন নীতির কারণে এই ছয় মাসে বাংলাদেশিদের কেউ আক্রান্ত হননি বলেও জানান তিনি।

ড. মোস্তাক আহমেদ গালিব বলেন, ‘চীনারা সরকারিভাবেই করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সর্বশক্তি দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদন ও বণ্টন অব্যাহত রেখেছিল। বাজার বন্ধ থাকলেও গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটি মানুষ অ্যাপের মাধ্যমে খাবার ডেলিভারি পেয়েছে। সরকার কম আক্রান্ত অন্য এলাকাগুলো থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যেরও জোগান দিয়েছে। এসব কারণে আমাদের খাদ্য ও দ্রব্য নিয়ে তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।’

অর্থনীতি ও দেশের স্বার্থে চীন মানুষের জীবনকে সবার আগে প্রাধান্য দিয়ে করোনা চিকিৎসায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল। তাই সেসময় চিকিৎসা না পাওয়া নিয়েও বড় কোনো শঙ্কা ছিলো না বলে জানান মোস্তাক আহমেদ গালিব। উহান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে এখানে পুরো শিক্ষা কার্যক্রম চলেছে অনলাইনে। চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ২২০ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থীকে বাড়িতে বসে ক্লাস করার সুযোগ করে দিয়েছিল। তা ছাড়া এবারই প্রথমবারের মতো সব দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা অনলাইনেই তাদের গবেষণা নিবন্ধ উপস্থাপন করেছেন, অংশ নিয়েছেন পরীক্ষায়। ধরতে গেলে তাদের গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ার পুরোটাই হয়েছে অনলাইনে। এ কারণে ঘরে থেকেই নিরাপদে সেমিস্টারের পাঠদান এবং গ্র্যাজুয়েশন কার্যক্রম আমরা সম্পাদন করতে পেরেছি।’

উহানে রয়েছেন আরেক বাংলাদেশি মোস্তফা জামান। লকডাউন থেকে এখানে রয়ে গেছেন স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। এ সময়ের অর্জন করেছেন জীবনের অনন্য কিছু অভিজ্ঞতা। মহামারির কেন্দ্রে পরিবার নিয়ে থাকায় অন্যদের থেকে দুশ্চিন্তাটা একটু বেশিই ছিল বলে জানালেন তিনি। চায়না ইউনিভার্সিটি অব জিওসায়েন্সের কন্ট্রোল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘ল্যাবের কিছু কাজ জমে থাকা, দেশে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আর পরিস্থিতি কিছুদিনের মধ্যে ভালো হয়ে যাবে এমন আশায় ফিরে না যাওয়াটাই শ্রেয় মনে হয়েছিল। তা ছাড়া কিছু হলে এখানে অন্তত ভালো চিকিৎসা পাব এমনও একটি বিশ্বাস কাজ করেছে। এই দীর্ঘ সময় কেবল দেশে প্রিয়জনদের কাছে যেতে না পারার আফসোস ছাড়া সামগ্রিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ভালোই ছিল।’

মোস্তফা জামান আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল এই মহামারির সময়ে চীনারা যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পাবেন সবক্ষেত্রে আমাদেরও সেভাবে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। প্রথম থেকেই আমাদের আবাসিক এলাকার কমিউনিটি কর্তৃপক্ষ থেকে সবার তালিকা করে খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছে। কমিউনিটির একজন প্রতিনিধি আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যেতেন। তা ছাড়া চীন সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং উহান পুলিশের পক্ষ থেকেও আমাদের বিভিন্ন সময় তরিতরকারি, চাল ডালসহ নানা খাদ্য সরবরাহ বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে। ভিনদেশে সংকটের সময়ে এমন সহায়তা সত্যিই আমাদের বেশ মুগ্ধ করেছে।

মে মাসের শুরু থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জানিয়ে মোস্তফা জামান বলেন, ‘মে থেকে আমাদের শঙ্কা দূর হতে শুরু করে, আমরা যেন খুঁজে পাই নতুন জীবনের স্বাদ। তবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম অনলাইনে হচ্ছে।’ সুপারশপগুলোতে কেনাকাটায় কিংবা গণপরিবহন ব্যবহারে এখানে সবার জন্য একটি বিশেষ স্বাস্থ্য অ্যাপ চালু করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

default-image

উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো ড. মোহাম্মদ এনামুল হকও পরিবার নিয়ে থেকে গিয়েছিলেন উহানে। জানালেন দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য একদিকে ছিল পিতার অনুরোধ অন্যদিকে সন্তানের বিমানে চড়ে দেশে যাওয়ার উচ্ছ্বাস। তবে এসব আবেগকে উপেক্ষা করে সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা আর পরিবারের ভ্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় উহানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ‘প্রথমদিকে আমাদের না ফেরা নিয়ে অনেকে নানা কথা বললেও এখন আমাদের সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন। এখানে করোনার সময়গুলোতে নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকলেও পুরো সময়টাতে আমাদের কাউকে কোনো ধরনের অসুস্থতায় পড়তে হয়নি।’ বলেন এনামুল।

‘আগের দুই শীতে এই সময়টাতে আমাদের সন্তান ঠান্ডাজনিত রোগে ভুগে খুব কষ্ট পেয়েছিল। তবে সৌভাগ্যবশত কোনো অসুস্থতা ছাড়াই এমন কঠিন সময়ে সে কোনো জটিলতা ছাড়াই পার করেছে।’ যোগ করেন তিনি।

এই বাংলাদেশি আরও জানান, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ক্যাম্পাসে সীমিত আকারে চলাচল করতে পারলেও দ্বিতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ অবস্থা হয়। তখন নানা দিক থেকে ভেসে আসতে থাকে মৃত্যু আর আক্রান্তের খবর। সেই থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেবল ডরমিটরিতে অবস্থানের নির্দেশনা দেয়। কঠোর হয় অভ্যন্তরীণ লকডাউন।

এনামুল বলেন, ‘ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আমাদের খুব কাছেরই একটি ভবনে কারও করোনা আক্রান্ত হওয়ার খবর পাই। এই সময়টা খুব আতঙ্কের ছিল আমার ও পরিবারের জন্য। তবে ডরমিটরি থাকলেও আমাদের খাবার আর প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উইচ্যাট গ্রুপ খোলা হয়েছিল। এখান থেকে সমন্বয় করে আমাদের কাছে খাদ্যপণ্যসহ সব সহায়তা দেওয়া হতো। সব মিলিয়ে দুর্যোগে চীনাদের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আর সমন্বয় সত্যি প্রশংসার দাবিদার।’

লেখক: চীনের উহানের সেন্ট্রাল চায়না বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী। বর্তমানে বাংলাদেশে আটকে পড়া।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন