default-image

সবুজ বিপ্লবের জনক ড. নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগের মৃত্যুবার্ষিকী ১২ সেপ্টেম্বর। ১৯১৪ সালের ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া রাজ্যের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষুধামুক্তির এই স্বপ্নকারিগর। এই কালজয়ী বিপ্লবী মৃত্যুবরণ করেন ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে। ক্ষুধামুক্তির লড়াইয়ে অতিমানবীয় ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রকফেলর ফাউন্ডেশনের এই স্বপ্নদ্রষ্টা কৃষিবিজ্ঞানী নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৭০ সালে।

সারা বিশ্বে কৃষি বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী এই মহান বিপ্লবী এক অবিশ্বাস্য স্বপ্নের পিছে ছুটেছিলেন প্রযুক্তি, স্বপ্ন আর সাহস নিয়ে। মিনোসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসলিং ক্লাবের কুস্তিগির প্রযুক্তি, স্বপ্ন আর প্রত্যয় দিয়ে পরাভূত করেছিলেন ক্ষুধা নামের অতিকায় এক দানবকে। তাঁর উদ্ভাবিত ‘মিরাকল হুইট’ মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন ম্যালথাসের নৈরাশ্যবাদী ‘ওরাকল’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীজুড়ে যখন চরম খাদ্যাভাব, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য যখন সর্বব্যাপী, এমন নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে নরম্যান বোরলগের উদ্ভাবিত ‘মিরাকল হুইট’ নৈরাশ্যের পৃথিবীতে ছিল আশার আলো। তাঁর এই কালজয়ী আবিষ্কার ও সাহসী নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ থেকে বেঁচে যায় এক বিলিয়ন ক্ষুধার্ত মানুষ।

ক্ষুধামুক্ত বিশ্বের যে স্বপ্নের বীজ তিনি বপন করেছিলেন মেক্সিকোর গমখেতে, তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল দশ দিগন্তে, ক্ষুধার নৈরাজ্য থেকে মুক্তি পেয়েছিল বিশ্ব মানবতা। যুগান্তকরী অবদানের কারণে বোরলগ হয়ে গেলেন ‘গ্লোবাল হিরো’। তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের পাশাপাশি পেয়েছেন অত্যন্ত সম্মানজনক ‘কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল’, ভারতের ‘পদ্মভূষণ’, ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’সহ অনেকগুলো পুরস্কার, সম্মাননা ও অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি।

বিজ্ঞাপন

১৯০১ সাল থেকে চালু হয়ে এ পর্যন্ত ১০৮ জন ব্যক্তি ও ২৪ সংস্থা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে। এর মধ্যে ফসলের মাঠ থেকে মাটির গন্ধ মেখে উঠে আসা একমাত্র নোবেল লরিয়েট হচ্ছেন নরম্যান বোরলগ। তৎকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বোরলগের অবদান এত অসামান্য, আশা জাগানিয়া ও বিশ্বজনীন ছিল যে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিতান্তই ছোট মনে হচ্ছিল তাঁর জন্য। ক্ষুধার্ত পেটে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বিশ্বায়ন অথবা পুঁজিবাদ—কোনো ফর্মুলাই ভালো কাজ করে না, বিশ্বশান্তির কোনো বাণীই মধুর লাগে না। ক্ষুধামুক্তির সংগ্রামই বিশ্বে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।

default-image

ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে এখনো গণতন্ত্র মানে একথালা ভাত, সমৃদ্ধি মানে নিরবচ্ছিন্ন খাদ্যনিরাপত্তা। যখন বিশ্বে প্রতি হেক্টর ফসলি জমির উৎপাদনশীলতা এক টনের নিচে, তখন ড. বোরলগ তাঁর নিরলস পরিশ্রমে উদ্ভাবন করেন ৫-৬ টন ফলন সম্ভাবনার খাটো জাতের রোগপ্রতিরোধী গমের জাত। সবচেয়ে বড় বিপ্লব রচিত হয় ভারত ও পাকিস্তানে। ১৯৬৬ সালে ভারত ১৮০০০ টন উচ্চফলনশীল গমবীজ আমদানি করে মেক্সিকো থেকে। ১৯৬৮ সালে ভারতের গম উৎপাদন ১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বেড়ে দাঁড়াল ১৭ মিলিয়ন মেট্রিক টনে। উৎপাদন বিপ্লবের এই বৈশ্বিক ঘটনাকে নাম দেওয়া হলো ‘সবুজ বিপ্লব’। সবুজ বিপ্লবের চেতনা ও সাহস বুকে নিয়ে কৃষিবিজ্ঞানীরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন সংকরায়নের মাধ্যমে ফসলের উচ্চফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী ও ঘাতসহিষ্ণু জাত উৎপাদনের। উচ্চফলনশীল জাতের সঙ্গে সার, সেচ ও রোগ ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে সবুজ বিপ্লবের বর্ণালি ছড়িয়ে পড়ল দশ দিগন্তে। সারা বিশ্বে কৃষি গবেষণা পেল নতুন গতি, খাদ্যনিরাপত্তা পেল নতুন মাত্রা। সবুজ বিপ্লবের সোনালি রোদ্দুর বাংলাদেশের ফসলের মাঠে আসতে বেশি সময় লাগেনি।

বিজ্ঞাপন

সফল বিপ্লবী বোরলগের দর্শন বুকে ধারণ করে বাংলাদেশে কৃষি বিপ্লবের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু সরকার কৃষি ও কৃষককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেন। ধান ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, তুলা উন্নয়ন বোর্ড, হর্টিকালচার বোর্ড স্থাপনসহ কৃষিনীতিতে আনা হয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। গবেষণা, সম্প্রসারণ ও শিক্ষা সমন্বয় করে এগোতে থাকে বাংলাদেশের কৃষি, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সোনালি হয়ে ওঠে বাংলার মাঠ-প্রান্তর। বাংলাদেশের কৃষিতে ঘটে যায় নীরব এক বিপ্লব।

পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের ধারা অব্যাহতভাবে বিবর্ণ করেছে সবুজ বিপ্লবের রং। কিংবদন্তি বোরলগ জীবনের বেলা শেষে কৃষি ও কৃষক নিয়ে, নানা রকম নীতিবিবর্জিত বাণিজ্য নিয়ে, ট্রেড সন্ত্রাস ও কসমেটিক পলিসি দেখে চরম হতাশ হয়েছেন।

সবুজ বিপ্লব অবশ্য কপাল খুলে দিয়েছিল বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যবসায়ী ও মুনাফালোভীদের। যেকোনো বিপ্লব, মহামারি, সংকটের মধ্যেই পুঁজিবাদ মওকা খুঁজে পায়, পেয়ে যায় মুনাফার নতুন সম্ভাবনা। সবুজ বিপ্লবের ফলে বহুজাতিক কোম্পানি, উপকরণ ব্যবসায়ীর ভাগ্য যতটা সমৃদ্ধ হয়েছিল, ততটা সমৃদ্ধি আসেনি কৃষকের জীবনে। পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের ধারা অব্যাহতভাবে বিবর্ণ করেছে সবুজ বিপ্লবের রং। কিংবদন্তি বোরলগ জীবনের বেলা শেষে কৃষি ও কৃষক নিয়ে, নানা রকম নীতিবিবর্জিত বাণিজ্য নিয়ে, ট্রেড সন্ত্রাস ও কসমেটিক পলিসি দেখে চরম হতাশ হয়েছেন। স্বার্থান্বেষী বাণিজ্যনীতি, বিকৃত বাজারব্যবস্থা ও বঞ্চনার অর্থনীতি তাঁকে মর্মাহত করেছে। তিনি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও কৃষকের অধিকার সমন্বয় করে চিরসবুজ বিপ্লব ও চিরসাম্যের ডাক দিয়ে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব আবার খাদ্যনিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ধনীর বিলাসিতার কার্বনে আজ বিপন্ন কৃষি, বিপন্ন সভ্যতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নয়া সাম্রাজ্যবাদ, বাজার দখলের নগ্ন প্রতিযোগিতা আর বিশ্বায়নেরে প্রক্রিয়া। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানিনিরাপত্তা, লাগসই উন্নয়নের জন্য বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে বিশ্বব্যাংক, এফএও, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, রকফেলর ফাউন্ডেশন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, ফোর্ড ফাউন্ডেশনসহ বিশ্বের অনেক সংস্থা ও ট্রাস্ট। কিন্তু সব দেশের স্বার্থ সমন্বয় করে কার্যকর হচ্ছে না কোনো টেকসই বৈশ্বিক নীতি। নানা কারণে আগামীর খাদ্যনিরাপত্তা হয়ে উঠছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের নাজুক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আজ আমাদের বড় প্রয়োজন নরম্যান বোরলগের মতো একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী, স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক ও সাহসী নেতা। আজ খুব প্রয়োজন বোরলগের মতো স্বপ্নদ্রষ্টা ও চেঞ্জমেকারের, যিনি স্বপ্নের সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়ে রচনা করবেন নতুন কোনো টেকসই চিরসবুজ কৃষি বিপ্লব।

নানা কারণে আগামীর খাদ্যনিরাপত্তা হয়ে উঠছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের নাজুক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আজ আমাদের বড় প্রয়োজন নরম্যান বোরলগের মতো একজন দূরদর্শী বিজ্ঞানী, স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক ও সাহসী নেতা।

মহান বোরলগ তাঁর বর্ণময় জীবনের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে কৃষি, কৃষক ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি আজ নেই কিন্তু তাঁর চেতনা, মানবতাবোধ ও অঙ্গীকার বুকে ধারণ করে কৃষিবিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি পৃথিবীর স্বপ্নে। প্রযুক্তিনির্ভর ‘প্রেসিশন অ্যাগ্রিকালচার’ ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যুগেও ড. বোরলগ এক চিরন্তন প্রেরণার নাম।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য নানা বর্ণের গ্লোবাল সেলিব্রিটির ভিড়ে হারিয়ে যায় নরম্যান বোরলগের মতো সফল বিপ্লবীর চেতনা, অঙ্গীকার ও সভ্যতার জন্য আত্মত্যাগের গল্পগাথা। বর্তমান প্রজন্ম অনেকের কথাই হয়তো জানে, কিন্তু জানে না সবচেয়ে সফল বিপ্লবী বোরলগের নাম। স্টিভ জবস, মার্ক জাকারবার্গ, আলবার্ট আইনস্টাইন কিংবা স্টিফেন হকিংরা ক্যারেসমেটিক আইডল হয়ে উঠলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে কালজয়ী কৃষিবিজ্ঞানী বোরলগের নাম থেকে যায় কৃষকের মতোই নিভৃতে।

‘এ লং ওয়ে টু ফ্রিডম, মাই লাইফ, অডাসিটি অব হোপ’ ব্যাপক বিক্রি হলেও কোথাও চোখে পড়ে না বোরলগের অনবদ্য সৃষ্টি ‘এন্ডিং ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার’, অথবা ‘ফিডিং আ ওয়ার্ল্ড অব টেন বিলিয়ন পিপল’। ক্ষুধামুক্তির এই মহান নেতার জীবনী স্থান পায় না আমাদের কোনো পাঠ্যবইতে।

‘এ লং ওয়ে টু ফ্রিডম, মাই লাইফ, অডাসিটি অব হোপ’ ব্যাপক বিক্রি হলেও কোথাও চোখে পড়ে না বোরলগের অনবদ্য সৃষ্টি ‘এন্ডিং ওয়ার্ল্ড হাঙ্গার’, অথবা ‘ফিডিং আ ওয়ার্ল্ড অব টেন বিলিয়ন পিপল’। ক্ষুধামুক্তির এই মহান নেতার জীবনী স্থান পায় না আমাদের কোনো পাঠ্যবইতে। বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীরাও বেমালুম ভুলে যান তাঁদের মহাগুরু, মহাবিজ্ঞানী বোরলগকে। তাঁর জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকীতে আয়োজিত হয় না কোনো আলোচনা সভা, স্মরণের বেদিতে অর্পিত হয় না কোনো পুষ্পমাল্য। একজন ব্যক্তি বোরলগের স্বপ্ন, দূরদর্শিতা, বৈজ্ঞানিক প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব ও মানবতার জন্য ভালোবাসা বিশ্বশান্তি ও সমৃদ্ধির ইতিহাসে চির অম্লান। নরম্যান বোরলগ বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন সারা বিশ্বের গমের খেতে, ধানের শিষে, দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে। সবুজ বিপ্লবের চেতনার সঙ্গে নতুন নতুন প্রযুক্তির সংমিশ্রণে দিকে দিকে রচিত হবে তৃতীয়-চতুর্থ প্রজম্মের কৃষি বিপ্লব, উৎপাদনের বিপ্লব।

বহুজাতিক কোম্পানি ও পুঁজিবাদের বর্ণিল মোড়ক থেকে বেরিয়ে কৃষি হয়ে উঠবে বিশ্বশান্তি আর খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার। ড. বোরলগের স্বপ্ন ও চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কোনো স্বপ্নদ্রষ্টা তরুণ কৃষিবিজ্ঞানীর হাত ধরে উন্মোচিত হবে কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের নতুন দিকের, রচিত হবে কৃষি উন্নয়ন ও খাদ্যনিরাপত্তার নতুন অধ্যায়। আগামীর পৃথিবী হবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনামুক্ত। ড. বোরলগকে জানাই শ্রদ্ধা।

লেখক: পিএইচডি ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া; কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

মন্তব্য পড়ুন 0