নবাবজাদা

বিজ্ঞাপন
default-image

আহাদ ফ্লাইট ইনফরমেশন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বোর্ডিং গেট নম্বরটা দেখে নিলেন, বিজি ০১ ফ্লাইট ছাড়ার সময় ছয়টা ত্রিশ। সময়টা জানাই ছিল, তবুও আবারও দেখে নিলেন, কী জানি আবার লেইট টেইট হয় কি না। এখন পাঁচটা পনের, ঘণ্টাখানেক সময় আছে। এদিক–ওদিক হেঁটে সময় কাটাতে হবে মনে করে আহাদ একটি ডিউটি ফ্রি দোকানে ঢুকে পড়লেন। উইন্ড শপিং বলতে একটা কথা আছে, এসব দেশে দোকানে ঢুকে জিনিসপত্র দেখলে, দামটাম দেখলে ওরা কিছু মনে করে না।

আহাদ ঢুকেছেন বারবারি নামের একটি দোকানে। আনমনে একটি লেডিস ওভার কোটে হাত দেন, প্রাইস ট্যাগে চোখ আটকে থাকে ক্ষণিকের জন্য। মূল্য এক হাজার নয় শ পঁচান্নবই, অর্থাৎ দুই হাজার পাউন্ড। না, কেনার কোনো চিন্তা তাঁর মাথায় ছিল না, তিনি অন্য হিসেবে অন্য ভাবনায় ডুবে যান। তিন বছর আগে তাঁর ছোট বোন সুমাইয়ার বিয়েতে চার হাজার পাউন্ড পাঠিয়ে ছিলেন, চার লাখ টাকার কিছু বেশি হয়েছিল। মা ও ছোট ভাই জানিয়েছিল, ভালোভাবেই সম্পন্ন হয়েছিল সবকিছু, খরচপাতির কোনো সমস্যা হয়নি। মাত্র দুটি কোটের দামে তাঁর বোনের সম্পূর্ণ বিয়ের খরচ চলেছে।

সুমাইয়ার একটি মেয়ে হয়েছে কিছুদিন হলো। দেশ ছাড়ার সময় এ সুমাইয়াই তো এতটুকন ছিল, ক্লাস এইটে পড়ত আর আজ সে এক সন্তানের মা। কেমন হয়েছে ভাগনিটি, সেই এতটুকুন সুমাইয়াই বা এখন দেখতে কেমন? সুমাইয়ার স্বামী ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে তাঁকে নিতে আসবে, এমনই কথা আছে। দোকানটি থেকে বেরোতেই দেখেন নীল ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক যাচ্ছেন, চেনা চেনা মনে হচ্ছে আহাদের। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখেন, হায়দার হোসেন।

আরে হায়দার ভাই, কেমন আছেন?

আহাদ ভাই দেখি, কী খবর? দেশে যাইতাছেন, এই সময়?

হায়দার হোসেনের সঙ্গে আহাদের পরিচয় বন্ধুত্ব প্রায় আট বছরের, সেই পর্তুগাল থেকে। দুজনে একই সময়ে দেশ ছেড়েছিলেন। চার বছর আগে দুজন প্রায় একই সময়ে ইংলান্ডে আসেন। পশ্চিম লন্ডনে সাউথ হলে দুজনে বসবাস শুরু করলেও দুই পেশায় থাকার কারণে দেখা–সাক্ষাৎ তেমন হয় না আজকাল। আহাদ একটি বাঙালি মালিকানার ফাস্ট ফুডে কাজ করতে করতে সম্প্রতি পঁচিশ পারসেন্টের অংশীদারত্ব কিনেছেন। আহাদ জানতেন হায়দার এয়ারপোর্টে একটি ভালো কাজ পেয়েছে, এর মধ্যে আর দেখা হয়নি।

হায়দার আবারও জিজ্ঞাস করেন, এই সময় দেশে যাইতাছেন ভাই? এখন কি দেশে যাওয়া ঠিক হইতাছে? করোনাভাইরাসের ...

জানি হায়দার ভাই, সবই জানি, কিন্তু কী করব, মায়ের শরীর খুব খারাপ...।

কথা শেষ করতে পারেন না আহাদ।

কী হইছে, কেমন আছেন এখন?

উদগ্রীব কণ্ঠে জানতে চান হায়দার।

আহাদ দেশ ছেড়েছেন আট বছর হলো। অবৈধভাবে পর্তুগালে চার বছর থেকে ইংল্যান্ড এসে একটি উপায় হয়েছে। তবে এখনো পুরোপুরি গুছিয়ে উঠতে পারেননি। একদিকে অবৈধভাবে বসবাস করতে হয়েছে অনেক দিন। দুটো–তিনটা কাজ করা, পেট চালানো, দেশে টাকা পাঠানো, টাকা জমানো, এমন ক্লান্তিহীন যুদ্ধে আটটি বছর কীভাবে গেছে, তা হায়দারকে বোঝানোর কোনো প্রয়োজন নেই। হায়দারের নিজেও একইভাবে..., একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দেন।

ভালো না রে ভাই। আপনি বুঝবেন ভাই, প্রথমবার দেশে যাইতাছি শুধু একটা হ্যান্ড ব্যাগ নিয়ে। একটা ভাগনি হয়েছে ওই দিন, নুতন ছোট বোনজামাই কারও জন্য কিছু নিতে পারি নাই। পাঁচ দিন আগে খবর পাইছি মায়ের শরীর খারাপ, শেষ বয়সের অসুখ, আমারে দেখতে চান, হুইনা মাথাটা আউলাইয়া গেছে হায়দার ভাই। নাইলে অহন আমার যাওয়ার সময়, আপনি নিজে বোঝেন না।

চলেন একটু বইসা কথা কই, আপনার ফ্লাইট কয়টায়, আমি এখন ব্রেকে আছি।

হায়দারের সঙ্গে দুই পা এগোতেই আহাদের ফোন বেজে ওঠে। মোবাইলে কলারের নাম দেখেই, খুশি খুশি মুখে আহাদ বলেন,
দাঁড়ান, বোন ফোন করেছে।

কথা বলতে বলতে আহাদের চেহারা মলিন হয়ে যায়, আহাদকে বলতে শোনা যায় ‘কী কছ তুই, অহন তো আমি এয়ারপোর্টেই আইয়া পড়ছি, অহন আর না আই কেমনে...।’

আহাদ মোবাইলটা পকেটে রেখে আবার হায়দারের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন।

দেখেন তো ভাই, কী মুশকিল, আমাকে দেশে যাইতে মানা করে। হায়দার ভাই, ঢাকা এয়ারপোর্ট থাইকা নাকি আটক কইরা ফালায়, কন তো দেখি কী করি, কী বিপদ ভাই।

আহাদকে নিয়ে হায়দার একটু সামনে এগোতেই একটি কষ্টা কফি দেখেন।

চলেন ভাই, কফি খাইতে খাইতে কথা বলি।

দুকাপ কফির অর্ডার করেন হায়দার। কফির কাপ সামনে নিয়ে দুই বন্ধু সামান্য সলাপরামর্শ করেন। আহাদের যাওয়াই চূড়ান্ত হয়, এ মুহূর্তে ফিরে যাওয়ার কোনোই মানে নেই। ঢাকায় পৌঁছেই দেখা যাক, কী হয়।

একটা উপায় হবেই, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। আহাদকে এমন আশ্বাস দিয়ে বিদায় নেন হায়দার। বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকান আহাদ, ফ্লাইট ছাড়ার আধঘণ্টা বাকি, তিনি গেটের দিকে পা বাড়ান।

সন্ধ্যা হয় হয়, রামপাশা গ্রামের খাঁ বাড়িতে একটি স্বল্প আয়োজনের কুলখানি শেষ হতে চলেছে। বিলেতফেরত আহাদের মায়ের কুলখানিতে এসে গায়ের কিছু আমন্ত্রিত অতিথি হতাশ হয়েছেন। একটি ছোট জটলায় সিগারেট টানতে টানতে দু–তিন জন সমালোচনায় মুখর। এত বছর বিদেশ কাটিয়ে মায়ের শিরনিও যদি দু–চারটি গরু দিয়ে না করা যায়, কী জন্য অর্থ উপার্জন? টাকাপয়সা কী কবরে নেবে আহাদ? এমন আলোচনা–সমালোচনায় কিছু মানুষ যখন বাহির বাড়িতে ব্যস্ত, তখন ভিতর বাড়িতে কান্নার রোল, কিছুক্ষণ আগে লন্ডনপ্রবাসী আহাদ বাড়ি এসেছেন। সাত দিন হলো আহাদের মা ইন্তেকাল করেছেন, সাত দিনের মধ্যে একটি শিরনি-সালাতের আয়োজন করা এ এলাকার একটি রেওয়াজ। সাত দিনের ভেতর আহাদ আসতে পারছেন না দেখে আহাদের ছোট ভাই সাহেদ আজ এ আয়োজন করেছেন।

১৮ মার্চ মারা যান আহাদের মা। আহাদ ১২ মার্চ এয়ারপোর্ট নেমে কীভাবে যেন ইতালিফেরত একদল যাত্রীর সঙ্গে মিশে যান। কয়েক শ যাত্রীর সঙ্গে আহাদেরও স্থান হয় একটি বিশাল ভবনে, আহাদ অনুমান করেন ঢাকা শহরের কাছেই কোথাও হবে। আহাদের বিশ্বাস ছিল নিজের মায়ের গুরুতর অসুস্থতার বিষয়টি বলতে পারলে হয়তো বেরিয়ে যেতে দেবে। কিন্তু দেশে আসার কারণ ব্যাখ্যার বা বোঝানোর জন্য কাউকেই তিনি পাচ্ছিলেন না। না পাওয়ার কারণও ছিল। এ ভবনে না থাকার জন্য কিছু যাত্রী চেঁচামেচি শুরু করছিলেন। অনেক দিন পর দেশে ফেরা আহাদ এসব হট্টগোলে কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে হাল ছেড়ে দেন। পরে বহু কষ্টে একজনের ফোনে সুমাইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর পৌঁছার খবরটা শুধু দিতে পেরেছিলেন। তার সঙ্গে পরে বাড়ির আর কেউ যোগাযোগ করতে পারেনি, তিনিও না। তাই মায়ের মৃত্যু সংবাদটাও তাঁকে কেউ জানাতে পারেননি। আজ সকালে কোয়ারেন্টিন থেকে ছাড়া পেয়ে সন্ধ্যায় গ্রামে পৌঁছে মায়ের মৃত্যু সংবাদ পান তিনি। মায়ের মৃত্যু, মাকে শেষ দেখাটা না দেখতে পারার শোকে আহাদ বাক্‌–বিহব্বল-বাক্‌রুদ্ধ। সদ্য মা হারানো সুমাইয়া ভাইকে পেয়ে অঝোরে কাঁদছেন। ঘরে আছেন কিছু নিকট আত্মীয়, মাতৃহারা ভাইবোনের সঙ্গে কাঁদছেন তাঁরাও। পাড়াপ্রতিবেশী বউ-ঝিরাও ছুটে এসেছেন। তৈরি হয়েছে একটি শোকাতুর পরিবেশ।

বাইরের অতিথিরা বসে আছেন, অপেক্ষা করছেন, আহাদ একটু স্থিতু হলে দুটো সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বিদায় নেবেন। জাগতিক নিয়মেই একসময় আহাদের শোকাচ্ছন্নতা কিছুটা ম্লান হয়ে আসে। তিন মাস বয়সী ভাগনিটিকে কে জানি তার কোলে দিয়ে গিয়েছিল। ভাগনিকে কোলে নিয়েই আহাদ মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে ঢোকেন। চায়ের টেবিলে পড়ে থাকা একটি পুরোনো পত্রিকায় আহাদের চোখ আটকে যায়। তিনি নিঃশব্দে শিরোনামটা পড়তে থাকেন, প্রবাসীরা দেশে এলে নিজেদের নবাবজাদা মনে করেন।

*লেখক: নিরাপত্তাকর্মী, হিথরো বিমানবন্দর, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন