বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সাইপ্রাস দেশটি ব্রিটিশ উপনিবেশ দ্বারা ১৯১৪ সাল থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত শাসিত ছিল৷ ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ শাসনের পতন ঘটিয়ে প্রথম স্বাধীনতা লাভ করে সাইপ্রাস। সাইপ্রাস যখন ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন সাইপ্রাসের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ লোক ছিল তুরস্ক থেকে আসা তুর্কিশ সিপ্রিয়ট। বাকি ৭০ শতাংশ জনসংখ্যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি ছিল এখানকার স্থানীয় সিপ্রিয়ট এবং বাকিরা গ্রিস থেকে আসা গ্রিক সিপ্রিয়ট। যদিও তুর্কিশরা ছাড়া বাকিরা গ্রিক সিপ্রিয়ট বলেই পরিচিত। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর এখানে চলে গ্রিস ও তুরস্কের একক আধিপত্য। গ্রিক সাইপ্রাসে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়া তুর্কিশরা একসময় নিজেরাই সাইপ্রাসে আলাদা রাষ্ট্র দাবি করে বসে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালে তুরস্কের সঙ্গে গ্রিসের যুদ্ধ লেগে সাইপ্রাসের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সাইপ্রাস থেকে একটি অংশ তুরস্ক কেড়ে নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করে। যদিও এ দেশটিকে এখনো কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। এটি একটি অবৈধ রাষ্ট্র হিসেবেই পরিচিত এবং পৃথিবীর মানচিত্রেও এ দেশটির কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে সাইপ্রাসের বাকি অংশ ২০০৪ সালে গ্রিসের সহায়তায় ইউরোপ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রিক সিপ্রিয়টরা এখনো পুরো দেশকে সাইপ্রাস বলে দাবি করলেও তুর্কিরা এটাকে তুর্কি সাইপ্রাস নামে জানে। এটা সাইপ্রাস এর উত্তর অংশ হওয়ায় এটাকে নর্থ সাইপ্রাসও বলা হয়। নর্থ সাইপ্রাস ও গ্রিক সাইপ্রাস একই সঙ্গে হলেও দুই দেশের সবকিছুই আলাদা। এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের কোনো কিছুরই মিল নেই।

নর্থ সাইপ্রাসে যে কাজের বেতন ৪০০ ইউরো, গ্রিক সাইপ্রাসে সে কাজের বেতন ৮০০ ইউরো। তবে নর্থ সাইপ্রাসে কাজের যে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এশিয়ানদের জন্য তা গ্রিক সাইপ্রাসে নেই। গ্রিক সাইপ্রাসে কাজ পাওয়া অনেক কষ্ট, কিন্তু নর্থ সাইপ্রাসের ক্ষেত্রে সেটা অনেক সহজ। গ্রিক সাইপ্রাসে কাজের ভিসায় এলেও এক–দুই বছরের বেশি লিগ্যাল থাকতে পারে না, সেটার অনেক কারণ আছে, কিন্তু নর্থ সাইপ্রাসে কাজের ভিসায় এলে যত দিন ইচ্ছা লিগ্যালভাবে থাকা যায়। কিন্তু বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে তারা নর্থ সাইপ্রাসে কখনোই স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চিন্তা করেনি। তারা নর্থ সাইপ্রাসকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহার করেছে। নর্থ সাইপ্রাসে এসে পরে সেখান থেকে অবৈধভাবে গ্রিক সাইপ্রাস চলে যায়। পরে গ্রিক সাইপ্রাসে শরণার্থী আবেদন করে কিছুদিন সেখানে থেকে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজের মাধ্যমে সেন্ট্রাল ইউরোপে চলে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশেই অনেক কিছু নিয়মের পরিবর্তন এসেছে। গ্রিক সাইপ্রাসে এখন আগের মতো রিফিউজি ফাইল গ্রহণ করে না, করলেও অল্প দিন থাকার অনুমতি দেয় এবং কন্ট্রাক্ট বিয়েও এখন বন্ধ হয়ে যায়। আগে নর্থ সাইপ্রাস থেকে গ্রিক সাইপ্রাস পার হওয়ার পথে ধরা খেলে কিছুদিন ক্যাম্পে রেখে ছেড়ে দিত। কিন্তু বর্তমানে কেউ বর্ডার পার হওয়ার সময় ধরা খেলে ৬ মাস জেলে রেখে নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেয়।

default-image

একদিকে গ্রিক সাইপ্রাসে যেমন বেড়েছে আইনের কঠোরতা তেমনি নর্থ সাইপ্রাসেও বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি সরকারের নজরদারিতে। নর্থ সাইপ্রাসে বর্তমানে প্রায় ৬-৮ হাজার বাংলাদেশি রয়েছে। তার ভেতর অধিকাংশ লোকই দালালির সঙ্গে জড়িত। এর পেছনে অনেক কারণও আছে। ২০১৭ সালের পর নর্থ সাইপ্রাসে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক ধস নামে। যেখানে তুর্কিশ ১ লিরার মান বাংলাদেশের ৩০ টাকার ওপরে ছিল, সেটা এখন দশ টাকায় পরিণত হয়। কিন্তু সে হারে বাড়েনি মানুষের বেতন, বেড়েছে আরও সেখানকার খরচ। ২ হাজার লিরায় যেখানে আগে ৫০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া যেত সেখানে এখন ২০ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। যার ফলে যারা আগে কাজ করত তারাও কাজ ছেড়ে দিয়ে দালালি পেশায় জড়িয়ে পড়েছে। বাঙালিরা মনে করে লাখোপতি–কোটিপতি হওয়ার একমাত্র সহজ উপায় দালালি পেশা। কিন্তু এই দালালি পেশায় এসে তারা অধিকাংশ মানুষের জীবনের সর্বনাশ ঘটাচ্ছে।

মানুষকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। বাংলাদেশের সহজ–সরল মানুষ যারা নর্থ সাইপ্রাস সম্পর্কে কোনো কিছুই জানে না তাদের ইউরোপ বলে এবং লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে এখানে এনে সর্বস্বান্ত করছে। বর্তমানে নর্থ সাইপ্রাসে কোনোভাবেই বাংলাদেশি ২০-৩০ হাজার টাকার বেশি আয় করা সম্ভব নয়। দালালেরা লাখ টাকা আয়ের গল্পগুজব দিলেও এসব মিথ্যা। অথচ একেকটা ভিসার দাম নিচ্ছে তারা ৬-৮ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এখানে আসতে লাগে বেশি হলেও ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি। মধ্যখানে নর্থ সাইপ্রাসের এজেন্সি এবং এখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি দালাল সেই সঙ্গে বাংলাদেশের এজেন্সিগুলো সম্মিলিতভাবে জনপ্রতি ১-২ লাখ টাকা লাভ করতে গিয়ে একেকটা ভিসার দাম ৭-৮ লাখ টাকা পড়ে যায়। তার সঙ্গে ঢাকায় এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট তো আছেই।

কয়েকজন দালালের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, আগে যেখানে দেড় লাখ টাকায় এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট করা যেত, সেটা এখন আড়াই লাখে পৌঁছেছে। কিন্তু এ টাকা তুলতে নর্থ সাইপ্রাসে ৩-৪ বছর চলে যাবে। অনেকেই তার ভেতরেই দেশে চলে যায়।

এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে আসা প্রবাসীদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এখানে এসে। দালালেরা তাদের এখানে এনে বিপদে ফেলে দেয়। ৫০ হাজার ১ লাখ টাকা বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে এখানে আসার পর দেখে যে সব ভুয়া। কোনো কাজই তারা দেয় না। উল্টো নানা রকম ব্ল্যাকমেল করে, পাসপোর্ট আটকিয়ে রাখে, অতিরিক্ত টাকা দাবি করে। দালালেরা এমনভাবে লেনদেন করে কোনো সাক্ষী–প্রমাণও রাখে না তারা যে আইনের আশ্রয় নেবে, সে সুযোগও কারও থাকে না। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নর্থ সাইপ্রাস সরকার বাংলাদেশিদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট ভিসা দেওয়া তিন মাস ধরে বন্ধ রেখেছে, আর চালু করবে কি না, সেটাও বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে ভিসা বন্ধ হলেও থেমে নেই দালালেরা, নর্থ সাইপ্রাস এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট–এর মাধ্যমে লোক নিয়ে আসার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। প্রথমে বাংলাদেশ থেকে দুবাই আনে, পরে দুবাই থেকে ফেইক ওয়ার্ক পারমিটের কাগজ দেখিয়ে ফ্লাই করে এয়ারপোর্ট থেকে বের করে নিয়ে যায়। তবে এই অভিযোগ সত্য কি না, তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ইতিমধ্যে নর্থ সাইপ্রাস সরকার সবকিছু কঠোর নজরদারিতে রেখেছে। যদি নর্থ সাইপ্রাসের ভিসা আর চালু না হয়, একদিকে বেকার হয়ে যাবে সেখানকার দালালেরা, অন্যদিকে নিঃস্ব হওয়া থেকে বেঁচে যাবে হাজার হাজার বাংলাদেশি। সাধারণত কোনো দেশের ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়া এটা মোটেও সুখবর নয়, কিন্তু নর্থ সাইপ্রাসের ক্ষেত্রে এটা সুখবর হওয়ার পেছনে একমাত্র দালালদের প্রতারণা–প্ররোচনাই দায়ী।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন