default-image

গত ১১ মাসে কোভিড সময়ে আমার একমাত্র বিনোদন ছিল ক্যালিফোর্নিয়া ঘুরে দেখা। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময়কার বন্ধু রহিম বাদশাহ থাকে ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে। ওখানে সে একটা জটিল স্টার্ট আপ মেডিকেল ডিভাইস কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করে।

আগে সে ছিল মিনেসোটাতে। ইউনিভার্সিটির পাট চুকিয়ে সিলিকন ভ্যালিতে একটা ভালো চাকরি পেয়ে চলে যায়। আমি থেকে যাই মিনেসোটাতেই। ঢাকার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল, ঢাকা কলেজ, ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমরা দুজনে একসঙ্গে একই বিষয়ে পড়ালেখা করেছি। আমেরিকাতেও মিনেসোটার সেইন্ট ক্লাউড স্টেট ইউনিভার্সিটি নামক স্কুল থেকে একই বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছি। তবে সে অনেক বেশি মেধাবী। বিশেষ করে গণিতে। এসএসসির গণিতে পুরো এক শতে এক শ পাওয়া ছাত্র।

আইডিয়াল স্কুলে ক্লাস সিক্সে রহিম বাদশার সঙ্গে পরিচয়, সেই থেকে শুরু। আমাদের স্কুলে টিফিনের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই লাইন ধরে নামাজের জন্য অজু করতে হতো।

বিজ্ঞাপন

বন্ধু রহিম বেশির ভাগ সময় আমার জন্য অজুর জায়গা বের করে দিত। অজুর পর নামাজ। নামাজের পরপরই ক্লাসের সময় হয়ে যেত। টিফিন বা বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করার ফুরসত থাকত না। তাই বেশির ভাগ সময় নামাজ ফাঁকি দিয়ে মতিঝিল কলোনির এদিক-ওদিক দ্রুত ঘুরে আসতাম। যথারীতি স্কুল কর্তৃপক্ষ নামাজ ফাঁকির খবর জেনে যায়। এই খবরের জন্য দায়ী ছিল কিছু সত্যিকারের আদর্শ বা ভালো ছাত্র আর মতিঝিলের কঠোর ও নিষ্ঠুর কলোনিবাসী অভিভাবক। স্কুলের ব্যাজ পরে আমাদের এই ঘুরে বেড়ানো তাদের সহ্য হয়নি। স্কুল তখন নতুন নিয়ম জারি করল যে নামাজের শেষে মসজিদের মধ্যেই রোল কল করা হবে। সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা হতো সেদিন কোন ক্লাসের কোন সেকশনের নাম ডাকা হবে। সেই ক্লাসের ছাত্ররা বাদে সবাই মসজিদ ছেড়ে ক্লাসে যেত। এভাবেই চিরুনি অভিযান দিয়ে বের করা হতো কোন ছাত্র নামাজ ফাঁকি দিয়েছে। ক্লাস শুরু হওয়ার পর স্কুলের মাঠ থেকে ধৃত ছাত্রদের ‘মাইরের’ চিৎকার শোনা যেত। কপাল ভালো আমি আর রহিম বাদশাহ কোনো দিনও ধরা পড়িনি। আমরা রিস্ক মিনিমাইজ করার জন্য নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে মসজিদে ঢুকে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে মিশে যেতাম। দৈবক্রমে সেদিন আমাদের ক্লাসের নামাজ রোল কল থাকলে ‘হাজির স্যার’ বলে চিৎকার করে আওয়াজ দিতাম।

যা–ই হোক, রহিম বাদশার ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার আগে কোভিডবিষয়ক সতর্কতা নিয়ে আলাপ–আলোচনা ও ট্যুর প্ল্যান সেরে নিলাম। ভ্রমণের উদ্দেশ্য ঠিক করলাম কোথায় বেড়াতে যাব আর পুরোনো কার সঙ্গে দেখা করব। মোটামুটি ঠিক করলাম সান ফ্রান্সিসকোর বে এরিয়াতে দুই কি তিন দিন যেখানটায় গোল্ডেন ব্রিজ আছে, তার আশপাশে ও লোম্বার্ড স্ট্রিট। লস অ্যাঞ্জেলেসে বন্ধুর বাসায় দুই দিন থেকে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় ঘোরাফেরা, হলিউড দেখা ইত্যাদি। হুভার ড্যাম দেখতে একদিন।

লাস ভেগাসে হোটেলে দুই দিন, নেভাদার লেক টাহো ও তার মরু ও পার্বত্য শহর রেনোতে ইত্যাদি সব মিলিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহের প্ল্যান। এতগুলো জায়গায় দূরত্বের হিসাবে প্রায় আড়াই হাজার মাইলের ড্রাইভ।

রহিম বাদশাহ জন্মসূত্রে একজন ড্রাইভার, যে কিনা ড্রাইভ করতে খুবই ভালোবাসে। মিনেসোটায় থাকতেও দেখতাম সে কখনোই গাড়ি চালাতে ক্লান্তবোধ করত না। বন্ধুদের মধ্যে হার্ড ওয়ার্কিং ড্রাইভার হিসেবেই সুনাম কেড়েছিল। শুধু একবার এক তুষারঝড়ের সময় হাইওয়ে চুরানব্বইয়ের ওপর বিশালাকৃতির ট্রাকের নিচে গাড়ি নিয়ে ঢুকে গিয়েছিল। ভাগ্যিস আমাদের কিছুই হয়নি, তবে ওই গাড়ির ওখানেই জীবন শেষ।

ক্যালিফোর্নিয়াতে গিয়েও দেখি সে আগের মতোই। সার্বক্ষণিক ড্রাইভ করতে ভালোবাসে। ড্রাইভ করতে সে খাওয়াদাওয়া, শার্ট বদল, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া, পেছনের সিটে বসা, সন্তানকে সুশিক্ষা, দেশের কারও সঙ্গে—যে নিজের সঙ্গে কথা বলা থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রায় বেশির ভাগ কাজই সেরে ফেলে। আমার বিশ্বাস গোসল করার ব্যবস্থা থাকলে সে ড্রাইভ করতে তাই করত। পৃথিবীতে মানুষ কত কিছু করে রেকর্ড করে ফেলে। তাকে বললাম যে সে জীবনে বিরাট এক ভুল করে ফেলেছে। আমার বন্ধু রহিম বাদশাহ গভীর আগ্রহে জানতে চাইল, কী সেই ভুল? আমি বললাম, ড্রাইভ করতে সে বিয়ে করে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করতে পারত। কনে ঘোমটা পরে পেছনের সিটে তার বোনের পাশে বসে থাকত। সামনের প্যাসেঞ্জার সিটে কাজি সাহেব সুরা পড়তেন। বর গাড়ি চালাতে চালাতে সুরা শেষে তিন কবুল বলে বিয়ে সেরে ফেলত। তখন গাড়ির স্পিড থাকত ঘণ্টায় উননব্বই মাইল। কনের আত্মীয়স্বজন কনেকে গর্ব করে বলতেন, মা, আল্লাহ তোমার কপালে বাবা জামাই একখান জুটাইছেন। সর্বকালের সেরা, দোয়া করি সুখী হও।

আমি খুবই সতর্কতা অবলম্বনে মিনেসোটা থেকে প্লেনে উঠে বসলাম। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। আড়াই হাজার মাইল। নামলাম সান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে।

বিজ্ঞাপন
default-image

মিনেসোটা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সময়ে পার্থক্য দুই ঘণ্টার। অর্থাৎ ওখানে দুই ঘণ্টা পর সূর্য ডোবে। পরদিন দেরি করে ঘুম থেকে উঠলাম। দুপুরের দিকে বন্ধু রহিম বলল যে সান ফ্রান্সিসকো শহর দেখতে যাওয়া যায়। এক ঘণ্টার কম সময়ের ড্রাইভ। রাজি হলাম। যথারীতি রহিম বাদশাহ ড্রাইভিং সিটে। প্রথমেই গেলাম সান ফ্রান্সিসকোর বে এরিয়াতে। কিন্তু সেদিন ছিল ঘন কুয়াশা। বে এরিয়াতে সবকিছুই আবছা। এই শহর আবার দেখতে আসব প্ল্যান করে এদিক-ওদিক ঘুরেফিরে রাতের মধ্যেই চলে এলাম।

পরের দিন গেলাম নাপা ভ্যালিতে। এটি ক্যালিফোর্নিয়ায় সান ফ্রান্সিসকোর উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সান ফ্রান্সিসকো শহর থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। নাপাভ্যালিকে আমেরিকার ওয়াইনারি বা মদের স্বর্গ বলা হয়ে থাকে।

হাজার না হলেও কয়েক শ ওয়াইনারি পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথের দুপাশে উঁকিঝুঁকি মারে। পাশাপাশি সুন্দর গ্রামাঞ্চল এবং বছরজুড়ে অপূর্ব আবহাওয়ার জন্য খুবই পরিচিত। সম্প্রতি এ জায়গাটাও ওয়াইল্ড ফায়ার বা বন্য আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনাবৃষ্টি, অতিরিক্ত শুষ্কতা কিংবা মানুষের অসাবধানতাই যার মূল কারণ। কেউ ভুল করে গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে সিগারেট ছুড়ে ফেললেও ওখান থেকে শুরু হতে পারে ভয়াবহ বন্য আগুন।

একটা ব্যস্ত দিনে অসংখ্য পর্যটক ওই সব ওয়াইনারিগুলোতে ঢুঁ মারে। বিভিন্ন ধরনের ওয়াইনের স্বাদ টেস্ট করে। পাহাড়ঘেরা ফুলে-ফলে ভরপুর পরিবেশে একটা অভূতপূর্ব সময় কাটায় তারা। কেউ তিন ঘণ্টা কেউ আবার পাঁচ কি ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত। পুরোটা সময় ওয়াইন স্টুয়ার্ড বা ওয়াইনারির ওয়েটার বা ওয়েট্রেসরা অতিথিদের সঙ্গে গালগল্প করে তাদের আপ্যায়ন করে। গল্পের বিষয় কাজকর্ম থেকে শুরু করে বিশ্ব রাজনীতি, সম্পর্ক বা পরিবার সম্পর্ক পর্যন্ত চলে যেতে পারে। সঙ্গে চলে গ্লাসে ভিন্ন স্বাদের পানীয় পান।

স্বাদ ভালো লাগলে অনেকে কিনেও নিয়ে যায়। একেকটা বোতলের দাম পঞ্চাশ ডলার থেকে শুরু করে পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত। আমেরিকান ছাড়াও ইউরোপ বা ভিনদেশের পর্যটকদের দেখা মেলে এখানে। অধিকাংশই দুই বা ততোধিক দল বেঁধে আসে। কেউ স্বামী-স্ত্রী, কেউ বন্ধুবান্ধব বা আপনজনদের সঙ্গে নিয়ে। ক্যালিফোর্নিয়ায় কেউ বেড়াতে এলে ওখানে যাওয়াটা অনেকের জীবনের একটা স্বপ্ন।

পানীয় পানের সঙ্গে ওখানকার ওয়েটার ও ওয়েট্রেসদের সঙ্গে পর্যটকদের মধ্যে দ্রুতই সখ্য গড়ে ওঠে। নামধাম থেকে শুরু করে কে কোথা থেকে এসেছে, কে কী করে, সম্পর্ক, পরিবার ইত্যাদি অনেক বিষয় নিয়ে কথা হয়।

দিন বাড়ার সঙ্গে ন্যাপভ্যালির অসংখ্য পাহাড় চূড়ায় সূর্য উঁকিঝুঁকি মারে। নেতিয়ে পড়া রশ্মি ক্রমাগতভাবেই জানান দেয় দিন শেষ হয়। তারপর অতিথিদের একটা সময় হয় উঠে দাঁড়ানোর। ব্যতিব্যস্ত হয়ে পার্টস বা মানিব্যাগ খুলে ক্রেডিট কার্ড বের করে স্টুয়ার্ডের হাতে দেয়। সেবা পছন্দ হলে টিপসের ঘরে অনেকে বড় অঙ্ক বসিয়ে দেয়।

সেল ফোন বের করে তাদের সঙ্গে হাসিমুখে ছবি তোলে। অসংখ্য ধন্যবাদ আর বিদায় নিয়ে দ্রুত গেটের বাইরে পার্ক করা গাড়িতে গিয়ে বসে। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই পাহাড়ের পা ঘেঁষে গাড়িগুলো মিটমিট আলো জ্বেলে চলে যায় যার গন্তব্যে। সারা দিন অলস বসে থাকা ওয়াইনারি কর্মীদের গাড়িগুলোর হেডলাইট জ্বলে ওঠে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ ধরে সবাই যার যার মতো ব্যস্ত হয়ে বাড়ি ফেরে।

তারপর হঠাৎ করেই যেন ব্যস্ত পাহাড়ে অন্ধকার নেমে আসে। অসংখ্য পর্যটকে কোলাহলমুখর নাপাভ্যালি নিস্তব্ধতার আড়ালে চলে যায়। অপেক্ষার প্রহরে থাকে আরেকটি ভোরের, আরেকটি সূর্যোদয়ের। চলবে...

*লেখক: জামাল সৈয়দ, মিনেসোটা, যুক্তরাষ্ট্র

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন