default-image

একবিংশ শতাব্দীর নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে নারীরা সমাজে মর্যাদার স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে সর্বদা সচেষ্ট। তবে এ জন্য নারীদের স্বাবলম্বী হতে হবে, হতে হবে আত্মনির্ভরশীল। আর স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অনেক নারী আজ তাঁদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সৃষ্টিশীল কর্মের সর্বোত্তম প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

বর্তমান বিশ্ব ও মানব সম্প্রদায় আজ এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত। কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) নামক রোগের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মযজ্ঞে স্থবিরতা বিরাজ করছে। অদ্যাবধি এই রোগের কোনো ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার না হওয়ায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং ঘরবদ্ধ (লকডাউন) থাকাই নিজেকে রক্ষার অন্যতম উপায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই লকডাউন মানুষের, বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের নানাবিধ মানসিক সমস্যা তৈরির আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি কর্মহীনতার জন্য পরিবারের আর্থিক উপার্জন কমে যাচ্ছে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের খাপ খাওয়াতে হবে, করোনার তৈরি হুমকি থেকে কর্মের নতুন সুযোগ খুঁজতে হবে। লকডাউনের সময়টা কাজে লাগিয়ে ঘরে ঘরে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে, আর এ ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। তাঁরা নিজেদের শিক্ষা, প্রতিভা ও মননশীলতা কাজে লাগিয়ে একেকজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন।

আশার কথা হলো এখন অনেক নারীই নিজে কিছু করার প্রেরণা থেকে কখনো এককভাবে, কখনো দলবদ্ধ হয়ে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্য নিয়ে অনলাইন ব্যবসা করছেন, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুগোপযোগী এবং বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে।

আমি ঢাকার মেয়ে হলেও স্বামীর চাকরিসূত্রে জাপানের টোকিওতে আছি। শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করায় বরাবরই আমার নিজের জন্য কিছু করার ইচ্ছা জাগে। সেই ইচ্ছাসূত্রেই আমি সহজ সোর্সিংয়ের কথা চিন্তা করে দেশীয় উপকরণ দিয়ে গয়না বানানোর কাজ শুরু করি। আমার উদ্যোগের নাম কাব্যে ষড়ঋতু (Kabbe Shororitu)।

প্রথমে শখের বশে করলেও বিভিন্ন অনুপ্রেরণায় একে ক্ষুদ্র উদ্যোগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা মাথায় আসে। আর এ ক্ষেত্রে Women and e-Commerce forum (WE) নামের পেজটা আমাকে আরও বেশি আগ্রহী করে তুলেছে। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে জানলাম, এটি বাংলাদেশের ৬৪ জেলার উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সবাই নিজ জেলার পণ্য বা তাঁদের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। ফলে প্রতিটি জেলার প্রায় হারানো পণ্যগুলোও নতুনভাবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ ছাড়া আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এখানে সদস্যদের ই-কমার্স সম্পর্কে বিশদভাবে শেখানো হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সেমিনার, ওয়েবিনার ও প্রশিক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

default-image

নারীদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে বিকশিত করার উদ্দেশ্য নিয়ে এই Women and e-Commerce forum (WE)-এর ফাউন্ডার ও প্রেসিডেন্ট হলেন নাসিমা আক্তার নিশা। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ‘একটা সময় ফেসবুক শুধুই একটা যোগাযোগমাধ্যম ছিল, যেখানে অনেক পুরোনো বন্ধু খুঁজে পাওয়া যেতে। দেশের বাইরের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা হতো। কিন্তু বর্তমানে ফেসবুক একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্যোক্তাদের জন্য। ফেসবুকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা পণ্য কেনাবেচা করতে পারছেন, যাকে আমরা এফ-কমার্স নামে জানি। সেই এফ-কমার্সের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে আমাদের উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, যাকে আমরা উই বলে জানি। উই হচ্ছে দেশীয় পণ্যের একমাত্র জায়গা, যেখানে আমরা হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তাকে একত্র করতে পেরেছি। তাঁরা তাঁদের পণ্য কেনাবেচা থেকে শুরু করে নেটওয়ার্কিং, নানা বিষয়ে কর্মশালা ও ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ পর্যন্ত করতে পারছেন। এই একটিমাত্র প্ল্যাটফর্মে থেকে অনেকেই তাঁদের হতাশা কাটিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও করছেন।’

নাসিমা আক্তার নিশা গর্বের সঙ্গে আরও জানান, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভাইবোনেরা দেশীয় পণ্যের কেনাকাটা করতে পারছেন, নিজেরা ব্যবহার করছেন এবং আপনজনদের উপহারসামগ্রীও পাঠাচ্ছেন। তিনি আশা করেন, বিশ্বব্যাপী নারী উদ্যোক্তাদের এই জোয়ারটা ছড়িয়ে পড়বে।

রাজীব আহমেদ Women and e-Commerce forum ( WE)-এর উপদেষ্টা হিসেবে আছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রায় আড়াই লাখ উই সদস্যের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত। স্টার্টআপ থেকে শুরু করে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া পর্যন্ত কীভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে, তা তিনি হাতে-কলমে ধরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে হেঁটে অনেক উদ্যোক্তাই অনেক এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন উই নিয়ে মন্তব্য করেছেন।
কাকলী রাসেল তালুকদার বলেছেন, ‘উই হচ্ছে আমার জন্য একটা ভার্চ্যুয়াল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি পবিত্র স্থান। আমি খুব লাকি যে জামদানি পণ্য নিয়ে আমার উদ্যোগ “কাকলীস অ্যাটায়ার”-এর পথ চলার শুরুতে উইয়ের মতো প্ল্যাটফর্ম পেয়েছি। যে অবস্থানে যেতে আমার ৫ বছর লেগে যেতে, সেটা আমি ৯ মাসে অর্জন করতে পেরেছি। শুরু থেকে রাজীব স্যারের উপদেশগুলো ফলো করে আসছি। প্রতিদিন শিখছি। সে জন্য স্যারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ নিশা আপুকে দেশি পণ্যের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এমন সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য।’

default-image

নিগার ফাতেমা বলেন, ‘উই হচ্ছে দেশীয় পণ্যের বিশাল প্ল্যাটফর্ম। দেশীয় পণ্যের ক্রেতা ও বিক্রেতার মিলনমেলা। উইতে শিখছি ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সব তথ্য, জানছি বাংলাদেশের ৬৪ জেলার পণ্যের কথা। আর উইয়ের পথ ধরেই হেঁটে যাচ্ছি একজন দেশি পণ্যের উদ্যোক্তা হয়ে। টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে কাজ করছি ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রিতে। আমার অনলাইন পেজের নাম “আরিয়াস কালেকশন”। চিরকৃতজ্ঞ রাজীব স্যার এবং উইয়ের প্রেসিডেন্ট নিশা আপুর কাছে।’

তা ছাড়া রাজীব আহমেদের প্রযুক্তিবিষয়ক ফেসবুক গ্রুপ, ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ আছে, যেখানে বাংলায় আইটির বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট পড়ে আইটি বিষয়ে অনেক কিছু জানা যাবে।

উইয়ে আমি আছি প্রায় দুই মাস হতে চলেছে। এই দুই মাসেই আমি আমার উদ্যোগের অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। জাপানে বসেই বাংলাদেশ থেকে অনেকগুলো অর্ডার পাচ্ছি। তা ছাড়া বাংলাদেশের অনেক ই-কমার্স উদ্যোক্তা আমাকে এখন চিনতে পারছেন, যা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। মোট কথা উইয়ে জয়েন করে আমি অনেক লাভবান হয়েছি এবং তা শুধু আমার পণ্য বিক্রির জন্যই নয়, ই-কমার্স-সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পেরেও আমি আমার উদ্যোগ নিয়ে অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছি।

সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের সাফল্য অর্জনের জন্য উই এক সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে কাজ করছে। এ বিষয়ে রাজীব আহমেদ বলেন, ই-কমার্সে দেশি পণ্যের প্ল্যাটফর্মের খুব দরকার ছিল। উই সেই শূন্যতা পূরণ করতে পেরেছে। এর ফলে অনলাইনে দেশি পণ্যের প্রতি আস্থা ও বিক্রি অনেক বাড়বে আগামী এক বছরের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন