বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মিতু মা হারিয়েছে পাঁচ বছর আগে। কাজের লোক আছে, সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে চলে যায়। আব্বুই সব। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও, ঢাকায় আব্বুর ব্যবসা। আব্বুর বিয়ের কথা বলে, তাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ। আব্বু বিরক্ত, বলেন, ‘মানুষের কি আর কোনো কাজ নেই?’
কয়েক দিন ভার্সিটি বন্ধ। সন্ধ্যায় সায়রার ফোন, ‘তুই কি এই শুক্রবার আসতে পারবি, সারপ্রাইজ আছে।’ মিতু একটু চিন্তায় পড়ল।
‘তোর আব্বুর সঙ্গে আসতে পারিস।’
মিতু পৌঁছে বেল দিল, দরজা খুলে দিল একজন দাড়িওয়ালা যুবক, সোফায় বসা একজন বয়স্ক মহিলা। সায়রা এগিয়ে এসে বলল, ‘বস।’
-তোর আব্বু এলেন না?
-পরে নিতে আসবেন। যুবকের দিকে তাকাতে, সায়রা পরিচয় করিয়ে দিল, আমার ভাই জাহিদ, খালার একমাত্র ছেলে। মিতু সালাম দিল, খালার পাশে গিয়ে বসল। খালা বললেন, ‘তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে চেয়েছিলাম, শুনেছি অনেক।’ মিতু জানে, এ ফ্ল্যাট খালার, আর খালুর চাকরি সিঙ্গাপুরে। ‘আচ্ছা, আপনারা কিছুদিন পর আবার চলে যাবেন?’ খালার জবাব দেওয়ার আগে, জাহিদ হাসি দিয়ে বলল, ‘সামিয়াকে আপুর কাছে রাখতে এসেছি।’ মিতু একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘সামিয়া কে?’ সায়রা, একটি ছোট্ট মেয়ের হাত ধরে ঢুকল, ‘আমার মেয়ে রে।’

খালা বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম, সায়রার পরীক্ষা শেষ হলেই আমি আর জাহিদ ফিরে যাব।’
মিতু আসলে জানতে চাইছে...সায়রা হাসি দিয়ে বলল, ‘আমার ছোট বয়সে বিয়ে, তালাক আর বাচ্চা, তোকে এখন বললাম।’ মিতু অবাক চোখে তাকিয়ে ভাবছে, কী রকম বন্ধুত্ব?
খালা সামিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত আর সায়রা খাবার টেবিলে প্লেট রাখতে লাগল।
জাহিদ খুব আস্তে গলায় বলল, ‘আপুর ক্লাস নাইনে বিয়ে হয়ে যায়। খালুর দেশের বাড়ি পাবনা, ওখানে চেনাশোনা এক পরিবারের ছেলে ঢাকায় এক ভার্সিটিতে লেকচারার, তার সঙ্গে। বিয়ের পর আপু ঢাকায় আসে তার কাছে, তখন সামিয়া মাত্র এক বছর। একদিন দুপুরে আপু বাচ্চা নিয়ে হঠাৎ এখানে আসে। কারণ আমি জানি, কিন্তু এটা আপুর কাছে শুনতে পারেন।’
আসলে মিতুর কষ্ট হচ্ছে আর কিছু জানতে। এই সায়রা এত স্মার্ট, হাসিখুশি, অথচ কত বড় আঘাত পেয়েছে এই বয়সে।
-খালা, মিতু, টেবিলে আসো। জাহিদ উঠে গিয়ে চা ঢেলে মায়ের দিকে কাপ দিল। সামিয়ার পাশে গিয়ে ওর প্লেটে সমুচা উঠিয়ে দিয়ে মিতুকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি নেবেন?’
মিতুর আজকে আসলে শুধু অবাক হওয়ার দিন। ও তো দাড়ি দেখে ভেবেছিল, মেয়েদের সাথে তাকিয়ে এরা কথা বলে না। নিজের এই চিন্তাধারা নিয়ে ভেতরে–ভেতরে খুব লজ্জা পেল।

default-image

সায়রা এসে মিতুর পাশে বসে বলল, ‘ভার্সিটিতে আমি সবাইকে কী করে বলতাম, আমি আগে বিবাহিত ছিলাম, আমার মেয়ে আছে ইত্যাদি। আমার মা–বাবা আমার বিয়ে দিয়ে একজন শিক্ষক ছেলের হাতে তুলে দিলেন। তাঁরা নিশ্চিন্ত। আমি তখন ক্লাস নাইনে, বাসায় ফিরলাম, বিকেলে বান্ধবী এসেছে, তাকে আমার মা বললেন, একে শাড়ি পরিয়ে দাও, কিছু মেহমান আসবে। আমি কিছু বোঝার আগেই সবকিছু শেষ। আমি লেখাপড়া বন্ধ করিনি, তারপর সামিয়া হলো। ম্যাট্রিকের পর ঢাকায় আসি। কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা, আর সামিয়ার জন্য একজন আয়া রাখা হলো। আমি গিয়েছিলাম ভর্তির আবেদন ফরম আনতে। কলেজ বন্ধ, বদমাইশটা বাসায় আর অন্য এক নারীর সঙ্গে। আমি সামিয়াকে নিয়ে কোনো রকম এক রিকশায় খালার এখানে চলে আসি। জাহিদ ছোট হলেও বলেছে, “আপু যদি না চায়, কেন জোর দিচ্ছেন।” আমার আব্বা মনে হয় তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছেন, আম্মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকবার বলেছেন, “সামাজিক নিরাপত্তা নেই, তাই অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলাম। এখন বল তুই, তোর আব্বু সব সময় ভার্সিটিতে তোকে গাড়ি নিয়ে তুলতে আসেন, সবার পক্ষে এটা সম্ভব না।” কিন্তু পরিবারের সাপোর্ট দরকার। অথবা স্কুল–কলেজ, বাস, ছেলেমেয়েদের ট্রান্সপোর্ট।’
জাহিদ সায় দিল, ‘গরিবের সমস্যা কিন্তু থেকেই যায়, যদি ফ্রি না হয়।’
কলবেল বেজে উঠল, ‘আব্বু এসেছেন।’ সায়রা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে বলল, ‘আপনাকে কিন্তু চা না খেয়ে যেতে দেব না।’

আব্বু এসে সোফায় বসলেন। খালা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে উঠে গেলেন আব্বুর সঙ্গে কথা বলতে। মিতু যাওয়ার জন্য উঠতে গেলে জাহিদ বলে উঠল, ‘আমাদের সবার জন্য একটু বসুন। মিতু বসে পড়ল।’ আচ্ছা এই দাড়ি নিয়ে তার ভেতরে একটা ভয় কাজ করত, সেটা আর নেই। কিছু মিডিয়া আমার ভেতরে ভালোমন্দের পার্থক্য আর অজান্তেই আমার ধর্মকে প্ররোচিত করে, আজকে ব্যাপারটা পরিষ্কার।
জাহিদকে অনেক জ্ঞানী মানুষ মনে হলো।
-আপনারা আর কত দিন সিঙ্গাপুর থাকবেন? মিতু জিজ্ঞেস করল।
-আমি ওখানে ট্রেনিং করব, আর আব্বু–আম্মু ফিরে আসবেন, তবে কয়েক বছর পর। এখানে কিছুদিন থাকব। আপুর পরীক্ষা।
-কিসের ট্রেনিং?
- আমি কেবল ডাক্তারি পাস করে একটা হাসপাতালে কাজ শুরু করার আগে এখানে একটু সময় কাটাতে চাই।
মিতুর এত আগ্রহ নিজের কাছে খারাপ লাগল। আব্বু উঠে না কেন।
বাসায় ফেরার পথে আব্বু জানালেন, ‘বেশ অবাক হলাম, সায়রা বেশ সাহসী মেয়ে।

default-image

একা একা সবকিছু করছে। আর ওর খালা তো আমার সঙ্গে এক স্কুলে পড়ত। দেখ, কী ছোট পৃথিবী। আমি বলেছি যোগাযোগ রাখতে।’
মিতু খুব খুশি হলো শুনে। বাসায় ফিরে অন্যমনস্ক মিতু, কোথাও কি তার মনটা হারিয়ে এসেছে?
পরীক্ষার শেষ দিন, অপেক্ষা করছিল মিতু বাইরে। সায়রা কাছে এসে বলল, ‘খালা কিন্তু তোকে আমার ভাবি করতে চান।’
- আর তুই কী বলিস?
- আমিও তোর কথা ভাবি। আর আমার জীবনে এ মুহূর্তে চাই, মেয়ে মানুষ করতে যেন পুরুষের কাছে নিরাপত্তা না খুঁজে বেরাতে হয়।
- তার জন্য স্কুলবাসের ব্যবস্থা? মিতু হাসতে হাসতে বলল।
- হ্যাঁ, তা–ই ধরে নে। চাকরিটা এখন সারা দিনের, ব্যাংকের মাধ্যমে অনেক সুযোগ, আর স্কুলের কিছু মাকে একত্র করেছি।
আমি ধাক্কা খেয়ে দৌড়াতে শিখেছি রে, পড়তে নয়।
মিতুর আজ মনে হলো, নিজের এখনো অনেক শেখা বাকি, শিক্ষা অসম্পূর্ণ।

দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন