default-image

১.
আবির ছোঁয়া পূর্বাকাশ। দিগন্তের সীমারেখায় সকালের সূর্যের মিলন। পৃথিবীর যেখান থেকেই দেখা হোক না কেন একই রূপের একই প্রকাশ। হোক সে আমেরিকার শহর সান্তা বারবারা বা বাংলাদেশের কোনো এক গ্রাম পাথরসি।

ভোরের এই সময়ে ভালো না লাগার কোনো কারণই থাকতে পারে না। বাসাসংলগ্ন পূর্ব দিকটা সম্পূর্ণ মুক্ত, তাই সকালের আলো ঘরে প্রবেশ করামাত্র সব আলোকিত হয়ে যায়। একই সঙ্গে ছোট্ট বাগানটায় খেলে যায় আলোর নাচন।

দিন শুরুর এই সুন্দর মুহূর্তে কিছুক্ষণ সময় বাগানে থাকে সামিয়া। প্রাণভরে নিশ্বাস নেয়। এখন বসন্ত, নানা রকম ফুলের সমাহার। সময়টা উপভোগ করা যেত এক কাপ চায়ের সঙ্গে। কিন্তু অনেক দিন হয় চা খেতে পারছে না। সব রকম নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছে। ক্যাফিন ইনটেক-এর নির্দিষ্ট পরিমাণ থাকলেও সে পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। এই তো আর মাত্র কয়টা মাস অপেক্ষা তারপর যদি সব ঠিক থাকে!

সামিয়া নিজের মনেই ভাবে, মা হওয়ার জন্য মেয়েদের কত রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই না যেতে হয়! বয়স ৩৭ চলছে। থার্ড প্রেগনেন্সির প্রায় ২৮ সপ্তাহ পার হয়েছে। তিন বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছি কিন্তু দুবছরের মধ্যে দুবার মিসক্যারজ আমাকে রীতিমতো ভাবাচ্ছে। তবুও ডাক্তার ভরসা রাখতে বলেছেন, কারণ মিসক্যারজ প্রেগনেন্সির একটি নরমাল পরিণতি। সাধারণত ১২ সপ্তাহের মধ্যে ১০-১৫ শতাংশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে। এর জন্য আশঙ্কা করার তেমন কোনো কারণ নেই।

ডাক্তার আরও বলেছেন, থার্ড টাইম মিসক্যারজ হলে তখন এর কারণ খুঁজে দেখার চেষ্টা করবে। যেহেতু আমার আর আরমানের কোনো প্রবলেম নেই, তাই আমাদের সব সময় সাহস দিয়ে যাচ্ছে। নিরাশ হওয়ার কথা কখনো বলে না। যদিও একটু বেশি বয়সে প্রেগনেন্সির চেষ্টা চলছে, তবে এমন নয়তো যে এই বয়সে কারও বাচ্চা হয় না!

বয়স যে প্রধান সমস্যার কারণ তা ঠিক করে বলা যায় না। পরপর দুবার গর্ভপাত বা মিসক্যারজ যেকোনো বয়সের প্রেগনেন্সির ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে এটা ঠিক যে বেশি বয়সের প্রেগনেন্সির সঙ্গে অনেক রকম রিস্ক ফ্যাক্টর জড়িত শুধু যে মার জন্য তা নয়, বাচ্চারও অনেক সমস্যা হতে পারে। তার মধ্যে গোলমাল অ্যাবনরমালিটি বা আনুপ্লয়ডি (Aneuploidy) অন্যতম। তবে তারা কিছুটা আশঙ্কামুক্ত কারণ ভ্রূণের সব রকম জেনেটিক স্ক্রিনিং করেছে যার প্রতিটির রেজাল্টই ভালো। তবুও সার্বক্ষণিক চিন্তা!
লেখাপড়ায় বরাবর ভালো থাকায় সামিয়া আন্ডারগ্র্যাজুয়েট করার সময়ই আমেরিকাতে চলে আসে। কেমিস্ট্রি নিয়ে গ্র্যাজুয়েট স্টাডি শুরু হয়। সেই সময় পরিচয় আরমানের সঙ্গে। তারপর দুজনের প্রণয় আর পরিণয়।

বিজ্ঞাপন

পিএইচডি করার পরপরই তিন বছর পোস্ট ডক্টরাল পজিশনে কাজ করে সামিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারাবায় জয়েন করে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে। আর আরমান নিজেই একটি স্টার্টআপ কোম্পানি দিয়েছে। কাজের চাপ দুজনের নেহাত কম না। দুজনেরই ক্যারিয়ার গড়তে জীবনের অনেকটা সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখন সবকিছুতেই আশঙ্কা, তারা কি মা-বাবা হতে পারবে?

default-image

২.
খুবই ক্লান্ত আজ। ক্লাস শেষ করে বেলা শেষের সূর্যের সঙ্গে বাসায় ফিরছে সামিয়া। শরীর এলিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো লাগত। আরমান কাজ থেকে ফিরে এলে বলবে আজ রাতের খাবার ব্যবস্থাটা যেন ও করে। ডাক্তার এখনো কাজ বন্ধ করে পুরাপুরি রেস্ট নেওয়ার কথা বলেননি, তাই কাজ করে যেতে হচ্ছে।

ড্রাইভ করতে করতে প্রায় বাসার কাছে চলে এসেছে। গ্যারেজে গাড়ি ঢোকাতেই বসার ঘরের ল্যান্ড ফোনটটার শব্দ শুনল। বাসায় থাকা হয় না সারা দিন। ফোন বেজে যায় ধরার মানুষ নেই।

তাড়াতাড়ি ফোন ধরতেই শুনল, ‘আমি নয়ন। আমার খুব ব্যথা উঠেছে, আমি সহ্য করতে পারছি না। ফাহিম তো নেই, শহরের বাইরে...।’

নয়নের সম্পূর্ণ কথা শেষ করার সুযোগ দিল না, সামিয়া বলল, আমি এখনই আসছি। আরমানকে শুধু জানাল, নয়নের ‘ইমারজেন্সি’ এখনিই হসপিটালে যেতে হবে।
নয়ন সান্তা বারবারায় নতুন এসেছে। এখানকার এক গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট ফাহিম-এর স্ত্রী। কত আর বয়স হবে। বড়জোর উনিশ কিংবা বিশ। এইচএসসি শেষ করতেই বিয়ে আর স্বামীর সঙ্গে চলে আসা। এখন এই বয়সেই মা হতে চলছে।

কিছুদিন আগে সামিয়ার সঙ্গে নয়ন-এর দেখা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে। একা একা হাঁটছিল। প্রথম দেখায় মেয়েটি এত কথা বলল যেন সামিয়া তার কত দিনের চেনা! কথা প্রসঙ্গে জানায় ওর জেসটেশোনাল ডায়াবেটিস (gestational diabetes) ধরা পড়েছে। গর্ভকালে যা হয়ে থাকে। ব্লাড সুগার বেশি থাকাতে ডাক্তার তিন বেলাই তাকে ইনসুলিন নিতে বলেছেন। মেয়েটিকে দেখেই খুব মায়া হয় সামিয়ার। নিজেই তার সেল আর বাসার ফোন নাম্বার দিয়েছিল, যেকোনো প্রয়োজন যেন যোগাযোগ করে।

এখন নয়ন সামিয়ার গাড়িতে, ব্যথায় খুব কাতরাচ্ছে। সামিয়া গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বেশি স্পিডও দিতে পারছে না। নিজেও ক্লান্ত। এ ছাড়া কেমন যেন এক অনুভূতি তাকে নিবিষ্ট করে রেখেছে।

আমার যদি ১৮-১৯ বছর বয়সে বিয়ে হতো আর আমি যদি অল্প বয়সে মা হতাম, তাহলে নয়নের বয়সের কাছাকাছি আমারও হয়তো এ রকম একটা মেয়ে থাকত। আমি নয়নের মা, প্রসবের ব্যথায় কাতর মেয়েকে নিয়ে ছুটছি....নিজেই প্রেগন্যান্ট তবুও ছুটছি মেয়েকে নিয়ে…মেয়েও প্রেগন্যান্ট।

মা আর মেয়ের একই অবস্থায় কে আর দায়িত্ব নেবে মেয়ের? অবশ্যই মা!
আমার জন্মের সময় তো এমনটিই হয়েছে। ছোট খালা আর আমার বয়স প্রায় সমান। মার কাছে শুনেছি, আমি জন্ম হওয়ার আগেই মা নানার বাড়ি পাথরসি চলে যায়। নানি তখন নিজেই গর্ভবতী। ওই অবস্থায় একই সঙ্গে নিজের আর তার গর্ভবতী সন্তানের (যিনি আমার মা) দেখাশোনা করেন।

আমার জন্মের ২০ দিন পর ছোট খালার জন্ম। একই সঙ্গে দুটি শিশু। কী আনন্দ! মা আর নানি দুই শিশুই নিয়ে মহা ব্যস্ত!

default-image

আজ জীবনের নানা পরিক্রমায় মেয়েরা লেখাপড়া করে একটু গুছিয়ে তারপর মা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মা আর মেয়ে একই সময় মাতৃত্বের আনন্দ লাভ করবে—এটা ভাবাই যায় না! বিশ থেকে তিরিশ বয়সের মধ্যে সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য উপযুক্ত সময় হলেও নানা রকম কারণে অনেক মেয়েরই তা হয়ে ওঠে না। তবে জীবনের বাস্তবতার প্রয়োজনে যত কিছুই হোক মা হওয়ার আনন্দ থেকে কেউ কি বঞ্চিত হতে চায়? তাই সব রকম কষ্ট সহ্য করেও মা হতে পারে একটি মেয়ে।

৩.
গত দুই সপ্তাহ সামিয়া মহা ব্যস্ত ছিল। আরমান অনেক রাগ করেছে। অনেকবার বলেছে, ‘খুব বেশি বাড়াবাড়ি হচ্ছে। একটু বিশ্রাম নাও, তা না হলে আমাদের বেবির অসুবিধা হবে। অনেক হয়েছে, অনেক করেছ। যাদের বাচ্চা এখন তারা সব সামাল দিক।’

সামিয়া একটু অবাক হয়। একটি শিশুর মুখ কি আরমানকে বিগলিত করেনি? নাকি পিতা হওয়ার প্রতীক্ষা তাকে শুধু নিজের সন্তানের জন্যই স্বার্থপর করেছে?

সত্যিই সামিয়া নিজের কথা ভুলে গেছে। ফুটফুটে একটি শিশু নয়নের কোলজুড়ে। নয়নকে সে দেখাশোনা করেছে। এর মধ্যে ক্লাসসহ নিজের অন্যান্য কাজও করেছে। শুধু তা–ই না, নয়নকে বাচ্চাসহ হসপিটাল থেকে বাসায় আনতে অনেক রকম ঝামেলা হয়েছে। এফ-২ ভিসায় যে হেলথ ইনস্যুরেন্স ওর আছে, তা অনেক কিছু কভার করে না। আবার বাচ্চার ইনস্যুরেন্স করাতে হয়েছে ভিন্নভাবে। অনেক কিছু সামিয়াকে নিজে থেকেই ব্যবস্থা করতে হয়েছে, যা সে কাউকে জানায়নি।

কীভাবে ফাহিম এ সময়ে শহরের বাইরে থাকে? একটি বাচ্চা আসবে তার জন্য কত প্রস্তুতি আর দায়িত্ব নিতে হয়। এসব ব্যবস্থা সে কিছুই করেনি। আর তার ফিরে না আসা পর্যন্ত কীভাবে নয়নকে বাসায় রেখে আসবে? ছোট বাচ্চা নিয়ে একা বাসায় মেয়েটি কী করবে, যার এখানে পরিচিত কেউ নেই।

ফাহিম একটি ট্রেনিংয়ের কাজে শহরের বাইরে আছে, কত দিন লাগবে কিছুই জানায়নি। নয়ন তাকে যেতে না করেছিল। কিন্তু ফাহিম এখন বাচ্চা চায়নি, তাই নয়ন আর অনাগত সন্তানের ব্যাপারে সে উদাসীন।

সামিয়া অবাক! একটি বাচ্চার জন্য ওরা কত না প্রতীক্ষিত অথচ একটি শিশুর জন্ম কারও কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত! হয়তো এখন প্যারেনটিং করার মতো উপযুক্ত সময় তাদের হয়নি তাই বলে একটি শিশুর প্রতি এতটা অবজ্ঞা?

৪.
ভোরের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সকালটা যেন অন্য রকম। নয়ন আজ চলে যাবে। অবশেষে আরমান ফাহিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। আরমান বুদ্ধিমান সে যুক্তি ছাড়া কাজ করে না।

সামিয়া ভাবছে এই কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা তাকে অন্য এ ধরনের উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। যে শিশুর জন্য আমি অপেক্ষা করছি, যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলে আমি মায়ের স্বীকৃতি পাব তার আগেই আমি মাতৃত্বের সাধ উপলব্ধি করতে পেরেছি। মাতৃত্ব স্বরূপ নিয়েই হয়তো মেয়েদের জন্ম। তাই সময়, বয়স, অবস্থান, পরিস্থিতি ভেদে মাতৃত্বের কোনো পরিবর্তন নেই।

আজ থেকে ৩৭ বছর আগে আমি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলাম, আমার নানি নিজে গর্ভবতী হয়েও সম্পূর্ণ সেবা করেছিলেন আমার মা আর আমাকে। আজ ৩৭ বছর পর প্রকৃতি একই রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমাকে নয়নের পাশে রেখেছে। আমিই মাতৃরূপে আছি নয়ন আর তার বাচ্চার জন্য।

পৃথিবীর যেথায় হোক না কেন, মায়ের একই রূপের একই প্রকাশ। হোক সে আমেরিকার কোনো শহর সান্তা বারবারা অথবা ইসলামপুরের কোনো এক গ্রাম পাথরসি!

কিন্তু পুরুষভেদে পিতৃত্বের স্বরূপ হয়তো ভিন্ন রকম। কেউ আরমানের মতো খুবই প্র্যাকটিক্যাল, ইমোশনাল শুধু নিজের সন্তানের জন্যই। কেউবা বা ফাহিমের এর মতো উদাসীন, দায়িত্বকে এড়িয়ে চলে। আবার এমনও অনেক আছে যারা দায়িত্ব নেওয়ার জন্য পিতাই হতে চায় না!

মাতৃত্ব অর্জন করতে নারীকে মানসিকভাবে পরিবর্তিত হতে হয় না, সে স্বভাবতই তা অর্জন করে। তাই গর্ভকালীন শারীরিক সমস্যা বা যেকোনো পরিস্থিতিকে সে মানসিক শক্তি দিয়ে জয় করে নেয়।

কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে পিতৃত্ব অর্জন করা অনেক কঠিন। পুরুষকে মিসক্যারজ, জেসটেশোনাল ডায়াবেটিস বা কোনো রকম শারীরিক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না কিন্তু পিতা হতে হলে যে মানবিক বা মানসিক শক্তির প্রয়োজন, তা হয়তো সবাই ধারণ করতে পারে না। একজন নারী যত সহজে বলে ‘আমি মা’ তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন একজন পুরুষের ‘আমি পিতা’ বলার অধিকার রাখা।

সামিয়া যখন এসব ভাবছে তক্ষুনি পেটে একটা কিক খেল। কী এক অপূর্ব অনুভূতি! কষ্ট, গ্লানি, ক্লান্তি সবকিছু ছাড়িয়ে একটি শিশুর আগমনের প্রতীক্ষা! কী এক অসাধারণ আনন্দ!

ভোরের আলোর মতোই সর্বজনীন, নেই সমাপ্তি!

*লেখক: ফারহানা রুনা, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন
দূর পরবাস থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন